ডেঙ্গু আতঙ্কে হল ছাড়তে শুরু করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থীরা। বঙ্গবন্ধু হলের ছাত্র ফিরোজ কবীর স্বাধীনের মৃত্যুর পর ক্যাম্পাসে এ নিয়ে আতঙ্ক বেড়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন হলে অনেক শিক্ষার্থী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন; বিশেষ করে গণরুমগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। এ অবস্থায় অনেকেই হল
ছাড়ার কথা জানিয়েছেন। গতকাল রবিবার বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে রক্তের প্লাটিলেট গণনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে আসেন ৩ শতাধিক শিক্ষার্থী। চাপ সামলাতে না পারায় প্রথম দিনেই বারবার বিকল হয়ে যায় প্লাটিলেট গণনা মেশিন। ঢাবির কত শিক্ষার্থী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন, তার সঠিক হিসাব নেই কর্র্তৃপক্ষের কাছে। এ সংখ্যা অন্তত দেড় শ বলে বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। এ ব্যাপারে করণীয় ঠিক করতে গতকাল প্রভোস্টদের নিয়ে সভা করেছে প্রশাসন। একই ব্যাচের ৬ জন আক্রান্ত হওয়ায় স্থগিত করা হয়েছে আইন বিভাগের প্রথম টার্ম পরীক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয়ে অব্যবস্থাপনা ও মশা নিধনে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
বঙ্গবন্ধু হলের ছাত্র আবুল হাসনাত বাবু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ হাজার কোটি খরচ টাকা করে। অথচ সামান্য মশা মারে না। তাদের ব্যর্থতার কারণেই হলের বড় ভাই ফিরোজ কবীর স্বাধীন মারা গেছেন।’ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত রাখার দাবি জানান তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জিয়াউর রহমান হলের গণরুমের এক শিক্ষার্থী জানান, তাদের হলে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ২০ জন। তারা ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আক্রান্তদের মধ্যে গণরুমের ছাত্রই বেশি। প্রতিটি হলের একই অবস্থা। তিনি জানান, একটি গণরুমে ৭ জন থাকা যায়। অথচ সেখানে ২০ জনেরও বেশি থাকছেন। তাই মশারি টাঙানো সম্ভব হয় না। এ অবস্থায় তিনি বাড়িতে চলে যাওয়ার চিন্তা করছেন। এ বিষয়ে কথা বলতে হল প্রাধ্যক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মিটিংয়ে আছেন বলে জানান।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি ক্রিমিনোলজি বিভাগের ছাত্র ও জিয়া হলের গণরুমের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন জানান, তারা ২৬ জন এক কক্ষে থাকতেন। মঙ্গলবার রাতে অসুস্থ হয়ে মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি হয়েছেন। তার কক্ষে আরও একজন ও পাশের কক্ষে দুজন আক্রান্ত হয়েছে বলে জানান তিনি। একই হলের পালি অ্যান্ড বুড্ডিস্ট স্টাডিজ বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফারুক জানান, মশা নিধনে কর্র্তৃপক্ষের তেমন কোনো পদক্ষেপ ছিল না। মাসে একবার করে মশার ওষুধ ছিটায়। ফলে গণরুমে থাকা বেশির ভাগ ছাত্র বাড়ি চলে গেছেন বা যাবেন বলে ভাবছেন। তাদের হলে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২৫ জন বলে জানান তিনি।
গতকাল বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে সরেজমিনে দেখা যায়, ডেঙ্গু শনাক্তে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ লাইন। এত শিক্ষার্থীর রক্তের নমুনা সংগ্রহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্তব্যরতরা। বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জ্বর বা শরীর ও মাথাব্যথার কারণে ডেঙ্গু হয়েছে ভেবে পরীক্ষা করাতে এসেছেন। তাদের বেশির ভাগই গ্রামে চলে যাওয়ার চিন্তা করছেন। রিপোর্ট পাওয়ার পরেই সিদ্ধান্ত নেবেন হলে থাকবেন কি না। মেডিকেল সেন্টারের অ্যাম্বুলেন্স চালক সোলেমান জানান, শনিবার সারা রাত তিনি শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে এনেছেন। অবস্থা এমন ছিল যে একসঙ্গে চার-পাঁচজন ফোন করেছেন। সকালেও তাদের এনেছেন। একই অবস্থা ছিল অন্য দুই অ্যাম্বুলেন্সেও।
জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শক্ত অবস্থান নিয়েছে। তার হলে একজন ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হওয়ার খবর জানেন। বাকিদের বিষয়ে তিনি অবগত নন। ফিরোজের মৃত্যুর পর তার হলে আতঙ্ক কিছুটা বেশি বলে স্বীকার করেন। এ প্রাধ্যক্ষ বলেন, তিনি প্রতিদিন হলের ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। গণরুমের ছাত্রদের পরামর্শ দিয়েছেন দুই-তিনজন একসঙ্গে এক মশারির নিচে থাকতে। এ ছাড়া নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান।
বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের প্রধান ডা. সারওয়ার জাহান মুক্তাফী বলেন, ফিরোজের মৃত্যুর পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি নয়জনের মধ্যে চারজন সুস্থ হলেও ভয়ে হাসপাতাল ছাড়তে চাচ্ছেন না। তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমরা প্লাটিলেট কাউন্ট করার মেশিন স্থাপন করেছি। বৃহস্পতিবারের মধ্যে শনাক্তের মেশিনও স্থাপিত হবে।’
ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় ঠিক করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রভোস্ট কমিটি গতকাল এক সভা করে। সেখানে মশা নিধনে হলগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানোর সিদ্ধান্ত হলেও তাতে আশ্বস্ত নন শিক্ষার্থীরা। জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যারয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘ডেঙ্গুর বিষয়টি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ডাকসু এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, হল সংসদ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলছে। তবে যেহেতু এটা দেশব্যাপী সমস্যা তাই আমরা ক্লাস বন্ধের বিপক্ষে। তবে পরীক্ষা বন্ধের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করব।’
ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যর্থতা ও উদ্ভট কথাবার্তা বলার অভিযোগ তুলে ঢাবি ক্যাম্পাসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ও ঢাকার দুই মেয়রের কুশপুত্তলিকা দাহ করেছেন শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে ব্যর্থতার দায় নিয়ে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাদের পদত্যাগের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। গতকাল দুপুরে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ’ নামে একটি সংগঠন মানববন্ধন শেষে এই কর্মসূচি পালন করে।