জনতুষ্টিবাদকে পরাজিত করতে পারবে কারা

সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত হওয়া ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট নির্বাচনের ফলে কি সামগ্রিক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে নাকি কোনো কিছুরই পরিবর্তন হয়নি? এই নির্বাচনে প্রধান দলগুলোর পরাজয় ঘটেছে। যাই হোক, এই ফলাফল কোনো কিছুরই ব্যাপক এবং বিস্ময়কর পরিবর্তন আনতে পারেনি, সে মৌলিক সত্য সম্পর্কে আমরা যেন অন্ধ না থাকি। এটা সত্য যে জনতুষ্টিবাদী নতুন ধাঁচের ডানপন্থিরা প্রভূত উন্নতি করেছে, কিন্তু নিয়ন্ত্রক তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকা নেওয়া থেকে অনেক দূরে রয়েছে। আমরা এই আওয়াজ সব সময়ই শুনে থাকি, যা অনেকটা মন্ত্রে পরিণত হয়েছে, তা হলো জনগণ পরিবর্তন চায়। কিন্তু তা খুবই বিভ্রান্তিকর, কেননা পরিবর্তনের ধরনকে নির্দিষ্ট করা হয়নি। আসলে, এটা ছিল সেই পুরনো নীতিবাক্যেরই আরেক ধরন, যাতে বলা হয়েছে, ‘কিছু পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু সবকিছুই একই রকম থাকে।’ ইউরোপীয়দের একধরনের নিজস্ব ধারণা গড়ে উঠেছে যে বিপ্লবের ঝুঁকির জন্য অনেক ক্ষয়ের সম্ভাবনা রয়েছে (একটি রাডিক্যাল অভ্যুত্থান) এবং সেজন্য তারা এমন দলগুলোকেই ভোট দেয় যারা তাদেরকে শান্ত এবং নিরাপদ জীবনের প্রতিশ্রুতি দেয় (আর্থিক অভিজাতদের বিরুদ্ধে, ‘অভিবাসন হুমকি’র বিরুদ্ধে)।

২০১৯ সালের ইউরোপীয় নির্বাচনে জনতুষ্টিমূলক বামদের পরাজয় ঘটেছে, বিশেষ করে ফ্রান্স ও জার্মানিতে। কেননা অধিকাংশেই রাজনৈতিক সমাবেশ চায় না। ডানপন্থি জনতুষ্টিবাদের ধারকরা এই বার্তা ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে। তাই তারা সক্রিয় গণতন্ত্রের প্রস্তাব না দিয়ে এমন এক কর্তৃত্ববাদী শক্তিতে পরিণত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যাতে তারা জনগণের স্বার্থে কাজ করবে।

এতে কিছুই প্রতীয়মান হয় না

এ ধরনের মারাত্মক সীমাবদ্ধতা আমরা ইয়ানিস ভারোউফকির গ্রিক রাজনৈতিক দল ডেমোক্র্যাসি ইন ইউরোপ মুভমেন্টের ২০২৫-এর ক্ষেত্রে দেখতে পাই। দলটির মতাদর্শ ছিল বিপুলসংখ্যক সাধারণ জনগণের সমাবেশ ঘটানো। যাতে ব্যাপক জনসমাগাম সৃষ্টি হয়, তাদেরকে অভিজাত শ্রেণির হেজিমনি ভাঙার জন্য যা মদদ জোগাবে। এমনকি ২০১৯ সালের ইউরোপীয় নির্বাচনে গ্রিন পার্টিগুলোর সাফল্যের জন্য এ ধরনের সূত্রই কাজ করেছে : এটা কোনো বাস্তুসংস্থানসংক্রান্ত জাগরণের ইঙ্গিত বহন করে না; বরং তাদেরকে সেই সব জনগণ ভোট দিয়েছেন যারা ইউরোপীয় প্রাতিষ্ঠানিকতার আধিপত্যমূলক রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতাকে বোঝা হিসেবে মনে করছেন এবং এর জাতীয়তাবাদী-জনতুষ্টিমূলক প্রতিক্রিয়াকে প্রত্যাখ্যান করছেন, কিন্তু আরও রাডিক্যালদের ভোট দিতে প্রস্তুত নন। 

এগুলো সেই জনগণের ভোট যারা তাদের বিবেককে কোনো ভণিতা ছাড়া পরিষ্কার রাখতে চায়। তাদের ভোট গ্রিন পার্টিগুলোকে দেওয়ার মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে, ইউরোপে এই দলগুলো মধ্যপন্থার উদীয়মান কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। তারা সচরাচর প্রবণতার রাজনীতিতে অভ্যস্ত এবং তাদের লক্ষ্য সবুজ অভিমুখী পুঁজিবাদ। আমাদের সেই ধরনের সত্যিকার রাডিক্যালতন্ত্র দরকার যা কেবলমাত্র গ্রিন এবং রাডিক্যাল বামপন্থিদের জোট গঠনের মাধ্যমে সম্ভব।

এগুলো থেকে বামপন্থিরা যেসব শিক্ষা নিতে পারে : বড় ধরনের জনপ্রিয় সমাবেশের আকাক্সক্ষাকে বাদ দিতে হবে এবং প্রাত্যহিক জীবনের পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য নিবদ্ধ করতে হবে। একটি বিপ্লবের প্রকৃত সাফল্য তখনই বিবেচনা করা হবে, যখন সাধারণ জনগণের প্রাত্যহিক জীবনে পরিবর্তন আনতে পারা যাবে।

সতর্কতামূলক উপাখ্যান

সিরজার দুঃখজনক পরিণতি ইউরোপীয় বামপন্থিদের নতুন পরিস্থিতির প্রতীক। গ্রিসের সাম্প্রতিক নির্বাচনে তারা ক্ষমতা হারিয়েছে এবং ডানপন্থি স্বৈরতন্ত্রের পথকে প্রশস্ত করতে ভূমিকা রেখেছে। তারা যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল তখন অর্থনৈতিক সংকটের ফলে অভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল।  কিন্তু পরে তারা কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি গ্রহণ করে তাদের তৃণমূল স্তরের জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলেছিল (তাদের ক্ষমতা লাভের প্রকৃত ভিত্তি)। তারা এখন ক্ষমতা হারিয়েছে এবং রক্ষণশীল দল (নিউ ডেমোক্রেসি) তা গ্রহণ করেছে। এটা আমাদের বর্তমান বিশ্বের সাধারণ চিত্র হয়ে উঠেছে, যে বিশ্বে ডানপন্থি জনতুষ্টিবাদের ধারক দলগুলো কল্যাণকামী রাষ্ট্রের কর্মসূচি গ্রহণ করার ভান করে এবং রাডিক্যাল বামপন্থিরা কৃচ্ছ্রসাধন আরোপ করে কর্র্তৃত্ববাদী চরিত্র ধারণ করে।

যুক্তরাজ্যের দিকে তাকাই, এখানকার ব্রেক্সিট নিয়ে যে জগাখিচুড়ি অবস্থা তা ইউরোপজুড়ে উত্তেজনার পারদ বাড়িয়ে দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের যে পরিস্থিতি, তাতে মাও সে তুং-এর অপ্রধান দ্বন্দ্বের তত্ত্বকে এক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায়। করবিনের ব্রেক্সিট প্রশ্নে দোদুল্যমান অবস্থান প্রকৃত অর্থে সুবিধাবাদী রূপে দুই পক্ষেই অবস্থান করার শামিল। তিনি চেষ্টা করছেন অন্যপক্ষের ভোট যেন না হারান। এর ফলস্বরূপ তিনি উভয় পক্ষ থেকেই পরাজিত হবেন। এখানে কিন্তু অপ্রধান দ্বন্দ্ব ক্রিয়াশীল : স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এভাবেই করবিনের মতো ইউরোপীয় বামপন্থিরা সচেতনভাবে কঠিন প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাচ্ছে। তারা জাতীয়তাবাদী-জনতুষ্টিমূলক প্রলোভনের বদলে ইউরোপে নতুন বামপন্থি সংস্করণ প্রচলন করতে পারছে না।

প্রকৃত হুমকি জনতুষ্টিবাদ থেকে উদ্ভূত হচ্ছে না : ইউরোপের মুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর প্রতি সেখানকার উদারনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে না পারার প্রতিক্রিয়া হিসেবে জনতুষ্টি প্রাধান্য পাচ্ছে। এ ব্যবস্থা সাধারণ জনগণের সমস্যার ভুল পথকে নির্দেশ করছে। সুতরাং জনতুষ্টিকে পরাজিত করার একমাত্র পথ হচ্ছে প্রকৃত রাজনীতি সহকারে নির্মম সমালোচনার মাধ্যমে উদারতাবাদী প্রাতিষ্ঠানিকীকরণকে প্রতিষ্ঠা করা। এভাবে রাডিক্যাল বামপন্থিরা ইউরোপকে রক্ষার জন্য নতুনভাবে শুরু করতে পারে। কিন্তু কোন বামপন্থি? শক্তিশালী জাতিরাষ্ট্রগুলোর উদীয়মান জনতুষ্টিবাদী বামপন্থিরা এই কাজ সম্পন্ন করতে পারবে না, এক্ষেত্রে সত্যিকারের প্যান-ইউরোপীয় বামপন্থিদের প্রয়োজন।

লেখক :  স্লোভেনীয় দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী, ল্যুবলিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর সোসিওলজি অ্যান্ড ফিলসফির অধ্যাপক

আর টি ডটকম থেকে ভাষান্তর : অনিন্দ্য আরিফ