‘বন্যায় তিন দিন ভাত খেতে পারিনি’

“বন্যায় তিন দিন ভাত খেতে পারিনি। আশপাশের মানুষ চিড়া-মুড়ি-কাঁঠাল দিয়েছিল, তা দুই মেয়েসহ খেয়েছি। সরকারি ত্রাণের ১০ কেজি চাল বা কোন টাকা পাইনি।”- কান্নাজড়িতকণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন সদর উপজেলার মোল্লারচর ইউনিয়নের চিথুলিয়া দিগর মৌলভীর চর গ্রামের ৫৫ বছর বয়সী হাজেরা বেগম।

গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই চিথুলিয়া দিগর মৌলভীর চরে সদরের খোলাহাটী ইউনিয়নের নতুন ব্রিজ থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় যেতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা।

সম্প্রতি ওই গ্রামে গিয়ে বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলাঘেঁষা মূল-ভূখণ্ডে ওই গ্রামে বসবাস করে ৩৭৫ পরিবারের দেড় হাজারের বেশি বাসিন্দা। গ্রামটি জেলার শেষ সীমানায় হওয়ায় সরকারি-বেসরকারি অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।

হাজেরা বেগম আরও বলেন, “২৫ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে অন্যের বাড়িতে কাজ করে ও মানুষের কাছে চেয়ে নিয়ে খেয়ে দিন পার করছি। প্রায় এক মাস হলো শেষ আশ্রয়টুকুও নদীভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র নদে। বন্যার শুরু থেকে নিয়ে ভাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি আমরা। তারা আর কয়দিন দেখবে। কোথায় যাবো, কী করবো ভেবে পাচ্ছি না।”

ঘরের আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন উপকরণ বন্যার পানির স্রোতে ভেসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও পর্যাপ্ত ত্রাণ সহযোগিতা পায়নি নদীপাড়ের এই মানুষগুলো। সরকারি ত্রাণের কোন টাকাও পাননি বলে অভিযোগ করেছেন তারা।

মৌলভীর চরের আরেক বাসিন্দা শেফালী বেগম (৪৫) বলেন, “১৩ বছর আগে পেটের সমস্যায় ভুগে স্বামী মারা গেছে। এবার বন্যায় ঘরে এক গলা পর্যন্ত পানি ছিল। সারাটা দিন না খেয়ে পানিতেই দাঁড়িয়েই ছিলাম। পরে রাতে পানি আরও বেড়ে যাওয়ায় চিৎকার করে আশপাশের লোকদের ডেকে নৌকায় করে পার হয়ে রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছি।”

তিনি বলেন, “ঘরের অনেক জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গেলেও সরকারি ত্রাণের কোন চাল বা একটি টাকাও পাইনি। দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে খুবই সমস্যার মধ্য দিয়ে দিন পার করছি। এদিকে ১০ হাজার টাকা সুদের ওপর ঋণ করতে হয়েছে। এই টাকাও কীভাবে দেব জানি না।”

ক্ষতিগ্রস্তদের কাছ থেকে জানা যায়, খাদ্য-পানি-বাসস্থানের সংকটের পাশাপাশি ঋণের জালে আটকে গেছেন তারা। কেউ নতুন ঋণ নিয়েছেন, আবার কেউ বন্যার কারণে পুরোনো দেনা শোধ করতে পারবেন কি-না সন্দিহান।

একই গ্রামেরই মনোয়ারা বেগম (৪০) বলেন, “নদীভাঙনের শিকার হয়েছি পাঁচবার। এখন অন্যের জমিতে কোনোমতে ঠাঁই নিয়ে আছি। সেই ঘরেরও বেড়া নষ্ট হয়ে গেছে বন্যায়। সরকারি ত্রাণের ১০ কেজি চালও পাইনি। তিন হাজার টাকা সুদের ওপর ঋণ করেছি, এই টাকা কীভাবে শোধ দেব জানি না। অসুস্থ স্বামী ও চার ছেলে-মেয়েকে নিয়ে বিপদে পড়েছি।”

ইউসুফ আলী (৪৫) জানান, বন্যা আট থেকে নয় দিন ছিল। ঘরের অনেক জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। বর্তমানে চারদিকে পানি। তার হাতে কোন কাজ নেই। ২০ হাজার টাকা ঋণ করতে হয়েছে। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে সাতজনের সংসারে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে তার।

আরেক ভুক্তভোগী ছকিনা বেগম (২৫) বলেন, “বন্যায় ঘর ভেঙে পড়েছে। রাস্তায় গিয়ে বসবাস করছি। শুধু সরকারি ত্রাণের ১০ কেজি চাল দিয়েছিলেন ইউপি সদস্য। সেটা শেষ হয়ে গেছে কয়েক দিন আগেই। কিন্তু কোন টাকা দেননি। এরপর সংসার চালানোর জন্য পাঁচ হাজার টাকা ঋণ করতে হয়েছে।”

ছকিনা বেগমের মতো এই গ্রামের কেউ টাকা পাননি। ৩৭৫টি পরিবারের বসবাস হলেও সরকারি ত্রাণের চাল দেওয়া হয়েছে মাত্র ৬০ জনকে।

এ বিষয়ে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য বাহার উদ্দিন বলেন, “এবার বন্যায় বিতরণের জন্য সরকারিভাবে শুধু দেড় টন চাল ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট পেয়েছি ২০টি। সেসব ১২১টি পরিবারের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু কোন টাকা পাইনি। এই গ্রামের মানুষেরা সবদিক থেকে বঞ্চিত। দূর বলে কেউ আসতে চায় না। এবার বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। টাকা বরাদ্দ এবং আরও ত্রাণের চাল দরকার আমার গ্রামে।”