মুরাকামির তুলিতে বর্ণহীন সুকুরু তাজাকির জীবনছবি

ছত্রিশ বছর বয়সের এক সন্ধ্যায় সুকুরু তাজাকির চোয়াল ঝুলে পরে তার চেয়ে বয়সে দু’বছরের বড় বান্ধবী সারার কথা শুনে। দেখতে মামুলি সারার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল এক পার্টিতে! কিন্তু অদ্ভুত ঘটনাটি সুকুরুর শরীরে ঘটেছিল তখনই। তার পিঠের নিচের দিকে একটি ছোট্ট অংশ আছে, যেখানে সুকুরু নিজে স্পর্শ করতে পারে না কিন্তু অন্য কেউ স্পর্শ করামাত্র সমস্ত শরীর ঝনঝন করে বেজে ওঠে! সেই পার্টিতে যতবারই সারার দিকে তাকিয়েছে, ততবারই সুকুরুর শরীর বেজে উঠছিল! যদিও বাঘা বাঘা সুন্দরীরাও ছিল সে পার্টিতে! কারও সঙ্গে শারীরিকভাবে মিলনের সময় ছাড়া, শুধু চোখের দেখায় এ জিনিস কখনো ঘটেনি এর আগে! তার পর থেকেই সারার সঙ্গে সম্পর্কটা তৈরি করেছিল সে। কিন্তু মাত্র একবার ডিনার ও রাত কাটানোর পরে সারাকে নিয়ে খানিকটা উদ্বিগ্নই ছিল সুকুরু। সে যাই হোক, সেই দিন ডিনার খেতে খেতে সারা সন্দিগ্ধ হয়ে সরু চোখ আরও সরু করে জানতে চায় সুকুরুর কৈশোর-যৌবনের কথা। কিন্তু কেন? আপাত সুঠাম রেলস্টেশন ইঞ্জিনিয়ার সুকুরু প্রথমে ভেবে পায় না তার একাকী জীবনের গভীর বিষাদময় অধ্যায়টুকু সারাকে বলা ঠিক হবে কি না! তার অন্ধকার-অমীমাংসিত মানসিক দ্বন্দ্বের খবর তো সারার টের পাওয়ার কথা নয়! কিন্তু জেরার মুখে সারা জানায় প্রথম ডেটিংয়ের রাতে, একটি চমৎকার ও পারফেক্ট যৌনসঙ্গমের পরেও, সে সেন্স করতে পেরেছিল সুকুরু কোথাও আটকে আছে! সম্পূর্ণ মুক্ত নয় সে! সুকুরুর শরীর এবং আত্মার কোনো একটা অংশ অসম্পূর্ণ, বিকলাঙ্গ ও অস্বাভাবিক! এর আগেও তো গোটাকয় মেয়ের সঙ্গে শুয়েছে! কই, কোথাও তো কোনো সমস্যা হয়নি! না, হয়েছে হয়তো কিন্তু কেউ কিছু বলেনি। শুধু নানা কারণেই সুকুরুকে ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে সবাইকে, কেউ তো অতৃপ্তও ছিল না সুকুরুর জানামতে। এই ছেড়ে যাওয়া বিষয়ক সবকিছুর ব্যাখ্যা সুকুরু জানে না, খুঁজে পায় না। সুকুরু কোথায় অস্বাভাবিক! কিংবা তারা হয়তো টের পেয়েছে, আইডেন্টিফাই করতে পারেনি অথচ সুকুরুর খুব কাছে এলে সেই অস্বস্তিটুকু অসহ্য বোধ করেছে এবং একসময় ত্যাগ করেছে সুকুরুকে! সবচেয়ে বড় কথা সুকুরু নিজেই কি জানে কোথায় আটকে আছে সে!

‘কালারলেস সুকুরু তাজাকি অ্যান্ড হিজ ইয়ারস অব পিলগ্রিমেজ’ উপন্যাসের অনেক অংশেই দুইয়ে দুইয়ে চার মেলানোর উপায় রাখেননি লেখক হারুকি মুরাকামি। কৈশোর থেকে যৌবনে উত্তীর্ণ হওয়া পাঁচ-পাঁচটি জীবনের বেড়ে ওঠা ও জটপাকানো এক সম্পর্কের পরিণতি খুঁড়ে বের করার ভ্রমণকাহিনী। কৈশোরের স্বপ্ন ও বন্ধন ছিন্ন করে জীবনের ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতায় প্রত্যেকে হেঁটে গেছে, টিকে গেছে; শুধুমাত্র একজন ছাড়া।  সে হচ্ছে শিরো, দলের সবচেয়ে সুন্দর নারীবন্ধুটি! বছর ছয়েক আগে মানসিকভাবে অসুস্থ শিরোর লাশ পাওয়া গেছে তার রান্নাঘরে। কোনো এক বৃষ্টির রাতে কেউ একজন এসে গলায় ফাঁস দিয়েছিল তার! সে রহস্যের কোনো কূলকিনারা হয়নি আজ অবধি। এসবের কিছুই সুকুরুর জানার উপায় ছিল না, কারণ বন্ধুরা তাকে ত্যাগ করেছিল ১৬ বছর আগে সুকুরুর ২০ বছর বয়সে। সিনিয়র বান্ধবী সারার তাগাদায় ৩৬ বছরের পরিণত সুকুরু আরেকবার পথে নামে কেন তাকে ত্যাগ করা হয়েছিল সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে।  জীবনের ওপর দিয়ে, সম্পর্কের ভেতর দিয়ে আরেক ভ্রমণ যেন-বা! কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসতে থাকে সুকুরুর জীবনে! অভিমানের খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসার পর এই প্রথম সে জানতে পারে, ধর্ষণের শিকার হয়ে শিরো গর্ভবতী হয়ে পড়েছিল ১৬ বছর আগে, আর শিরো তার জন্য সুকুরুকেই দায়ী করেছিল সে সময় অন্য বন্ধুদের কাছে। বন্ধুরা তখন কোনো কৈফিয়তের সুযোগ না-দিয়ে কোনোরকম কারণ দর্শানো ছাড়াই সুকুরুর সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল বিনা বিচারে ফাঁসি দেওয়ার মতো করে। বন্ধুদের এই প্রত্যাখান সুইসাইড-সারভাইভর সুকুরের মনোজগতে গভীর প্রভাব ফেলে এক নতুন সুকুরুর জন্ম দেয়, যাকে অসম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে শনাক্ত করে সারা! বাস্তব-আধাবাস্তব, স্বপ্ন-অবচেতন কামনা-প্যারাসাইকোলজি মিলেমিশে আছে এবং তাতে অব্যাখ্যেয় অংশটুকু পাঠককে খটকায় রাখলেও মূল গল্পের প্রবাহ তাতে বাধাগ্রস্ত হয় না। বরং ওই পাজল-না-মেলানো অংশটুকু গোপন অঙ্কের মতো ক্রমাগত মাথায় কাটাকুটি খেলতে থাকে। যেমন বলা চলে, বাস্তব জীবনে শিরোর সঙ্গে সুকুরুর বিছানা তো দূরের কথা, কফিশপেও কখনো একাকী দেখা হয়নি। অথচ স্বপ্নে সুকুরু বারবারই শিরোর সঙ্গে মিলিত হয়েছে এবং দিনের বেলায় অপরাধবোধে ভুগেছে। লেখক কখনোই এই গিঁট খুলে দেন না যে, পরবর্তী সময়ে শিরোর গর্ভবতী হওয়ার পেছনে কার অবদান ছিল; অথবা শিরোও মনে মনে সুকুরুকে কামনা করে স্বপ্নেই মিলিত হতো কি না! সুকুরু বরং ভাবে, কোনো এক মহাজাগতিক উপায়ে সুকুরু-শিরোর স্বপ্নের মিলন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই হয়তো শিরো গর্ভবতী হয়ে পড়েছিল।

উপন্যাসটির নামকরণের বেলায় দেখা যায়, ৫ বন্ধুর টিমের প্রত্যেকের নামের একটি অংশে একটি করে রঙের নাম বর্তমান- লাল, সাদা, নীল ও কালো। শুধুমাত্র সুকুরুর নামে তা নেই, এই রঙের নাম না-থাকার ব্যাপারটি সুকুরুকে ‘দলছুট’ বিবেচনা করতে গভীর ভূমিকা পালন করে। সুকুরু নিজেকে রংবিহীন অতি সাধারণ, অন্য সবার চাইতে কম গ্ল্যামারাস ভাবতে শুরু করে। এই ঊন-ভাবনা সারাক্ষণ আত্মবিশ্বাসহীন করে রাখে সুকুরুকে। গল্পের শেষে না-আসা অবধি সুকুরু জানতে পারে না যে, সে মোটেই বর্ণহীন ছিল না, কুরু নামের বান্ধবীটি তার প্রেমে পড়েছিল, বন্ধুরাও তাকে কিছু কম ভালোবাসত না! মুরাকামি এ উপন্যাসে কৈশোরের বন্ধুত্বকে ঘিরে তৈরি হওয়া জটিলতা কীভাবে পাঁচটি তরুণকে প্রভাবিত করেছে তারই ছবি এঁকেছেন। সম্পর্কের দ্বন্দ্ব, যৌনতা, অবদমন, পরস্পরকে আঁকড়ে ধরার প্রবণতার ছবিগুলো, বিশেষ করে প্রধান চরিত্র সুকুরু কীভাবে মানসিক বিকলাঙ্গতায় ভুগত, অথচ বাইরে তার ছাপ পাওয়া যেত না, তার একটি শ্বাসরুদ্ধকর চিত্র এঁকেছেন ঔপন্যাসিক।

মুরাকামির মুন্সিয়ানার আরেক ব্যাপার হলো, কিছুতেই গল্প কোন দিকে বাঁক নিচ্ছে তা ঠাহর না-করতে পারা! সুকুরুকে আঁকতে গিয়ে মুরাকামি দেখিয়েছেন যে জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকই যৌনতার ওপর প্রভাব ফেলে! যৌনতা জীবনের সবগুলো অধ্যায়ের ওপর প্রভাব ফেলে! শুধু প্রভাবই ফেলে না, যৌনতার নিজস্ব গতির ওপর সচেতন মনের কোনো জোর-জবরদস্তিও চলে না। মুরাকামি যৌনতাকে দেখেছেন মানুষের জীবনে সামাজিক বিন্যাসের ড্রাইভিং ফোর্স হিসেবে। এ উপন্যাসে সুকুরুর জীবনের অমীমাংসিত অংশগুলো লেখক শেষ পর্যন্ত অমীমাংসিতই রাখেন, কিন্তু অন্য অংশটুকুর মীমাংসা করার জন্য সুকুরুকে নিয়ে আসেন সুদূর ফিনল্যান্ডে, কুরোর সংসারে। কুরোর সঙ্গে এক বিকেলের দীর্ঘ আলাপে সুকুরু জানতে পারে, কুরো তার প্রেমে পড়েছিল, সুকুরুর মনে হতে থাকে, ততটা বর্ণহীন সে তো নয় তবে!

বিদায় নেওয়ার আগে সুকুরু কুরোকে আলিঙ্গন করে, অনেকক্ষণ চেপে ধরে রাখে বুকে, দুটি শরীর নিজেদের ভাষায় পরস্পরকে বহুদিনের জমিয়া রাখা তথ্যও শেয়ার করে হয়তো। যেন-বা দুই বন্ধু শুষে নিচ্ছে পরস্পরের যাতনা, হতাশা আর বহুদিনের অপেক্ষমাণ প্রেম! কুরো তার সংসারের গল্প করে, দুই কন্যা ও স্বামীর গল্প করে। সুকুরু তার একাকিত্ব ও বান্ধবী সারার গল্প করে। ফিনল্যান্ডের গ্রীষ্মকালীন লেকের বাতাস দুজনের গভীর নিঃশ্বাসের সাক্ষী হয়ে থাকে! দুজনে একমত হয়, এরপর থেকে জীবনকে সামনে চালিয়ে নিয়ে যাওয়াই হতে পারে তাদের পরস্বপরের প্রতি গভীর বন্ধুত্ব আর ভালোবাসার প্রকাশ।  বলাবাহুল্য, তারুণ্য-বন্ধুত্ব-সেক্স-ভালোবাসা-হতাশা আর অবচেতন মনের স্বপ্ন-বাস্তবতার এ উপন্যাসটি জাপানে প্রকাশিত হওয়ার এক সপ্তাহের ভেতরে বিক্রি হয়েছিল মিলিয়নের ওপরে। মুরাকামির জনপ্রিয়তা ও পাঠককে ছুঁতে পারার সার্মথ্য জানার এও এক মাপকাঠি বটে!

বই : কালারলেস সুকুরু তাজাকি অ্যান্ড হিজ ইয়ারস অব পিলগ্রিমেজ
লেখক : হারুকি মুরাকামি

লেখক
কানাডা প্রবাসী সাংবাদিক