আমার অন্যতম প্রিয় গ্রন্থ মহাভারত। মহাভারতে পঞ্চপাণ্ডবের মা কুন্তির একটি উক্তি আজও প্রাসঙ্গিক। জ্যেষ্ঠ ছেলে যুধিষ্ঠিরের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, এটা মনে করো না যে, কাল প্রভাবেই রাজার দোষ-গুণ হয়। রাজার কর্ম অনুসারেই সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলিযুগ উৎপন্ন হয়। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শুরুর আগে-আগে পাণ্ডবদের হয়ে শ্রী কৃষ্ণ শেষবারের মতো কৌরবদের গৃহে দূতিয়ালি করেন। সেখানেই কৃষ্ণ ও কুন্তির সাক্ষাৎকালে কৃষ্ণ মারফত যুধিষ্ঠিরকে কথাগুলো বলেন পাণ্ডব-জননী। মহাভারতের গল্প মহাভারতেই তোলা থাক। আমরা বরং পাণ্ডব-মাতার উক্তিটির অন্তরে প্রবেশ করি। কুন্তির ভাষ্যানুযায়ী, চিরস্থায়ী ভালো ও মন্দ যুগ বলে কিছু নেই। যুগের বদল ঘটে। রাজার কর্মগুণেই রাজ্যে আসে সুদিন ও দুর্দিন।
সুশাসনের দেশ হিসেবে সাধারণত জার্মানি, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস বা ইংল্যান্ড, আমেরিকার উদাহরণ আসে। এমনকি বিত্ত-বিলাসহীন প্রতিবেশী দেশ ভুটানও শান্তির দেশ হিসেবে খ্যাত। ভুটানের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও রেমিট্যান্স বাংলাদেশের চেয়ে কম হলেও, দেশটির নাগরিকরা মনে করেন তারা শান্তিতে আছেন। তাহলে কুন্তির বক্তব্য মতে, শান্তি ও সুশাসনের এই কৃতিত্ব দেশটির নেতাদেরই প্রাপ্য। গত দেড়-দুই দশকে আমাদের দেশে অর্থনৈতিক উল্লম্ফন ঘটেছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে। প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। রেমিট্যান্স বেড়েছে। এসব অর্জনের সব প্রশংসা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্র-পরিচালকরাই পাবেন। কিন্তু এত উন্নতি, এত রেমিট্যান্স, এত বিরাট বাজেটের বিশাল কৃতিত্ব নিয়েও জনজীবনে কেন এত নাভিশ্বাস? সমাজের কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত কেন এত হা-হুতাশন?
কৃষকরা ভালো নেই। তারা ধানের দাম পান না। আলুর দাম পান না। সবজির দাম পান না। বিক্রি না হওয়া সবজি মহাসড়কে গাড়ির চাকার নিচে ফেলে দিয়ে শূন্য হাতে বাড়ি ফেরেন ক্লিষ্ট কৃষক। তত্ত্বাবধায়ক আমলে দেখেছি, কৃষকের ক্ষতি কমানোর পরিকল্পনা না করে রাষ্ট্র পরিচালনাকারীরা মানুষকে ভাতের বদলে আলু খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন; শিল্পীকে দিয়ে টেলিভিশনে আলুর গান শুনিয়ে করেছেন ব্ল্যাক কমেডি। গ্রামের বিপরীত চিত্র শহরে। বাজারে আগুন। লাফিয়ে-লাফিয়ে দাম বাড়ে ভোগ্যপণ্যের। বাচ্চার জন্য গুঁড়ো দুধ ও প্যাম্পার আর বয়স্কদের জন্য ওষুধ কিনতে গিয়ে মধ্যবিত্তের বাজারের ফর্দ থেকে মাছ-মাংস হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। গ্রামে কাজ নেই। কৃষিতে ভবিষ্যৎ নেই। আয়-রোজগারের উপায় কম। মানুষ শহরমুখী। নগরগুলো হয়ে উঠছে আলী বাবার গুপ্তধনের গুহা। ‘চিচিং ফাঁক’ বললেই সৌভাগ্যের চাকা খুলে যাবে ভেবে ছোট শহর, মফস্বল ও গ্রাম ছেড়ে মানুষ নগরমুখো। জীবনের সব ঐশ্বর্য নগরে নিহিত বলে ডাক্তাররা মফস্বলও যেতে রাজি নয়; গ্রাম তো কোনো দূরের কথা। উন্নয়ন নগরে পুঞ্জীভূত হয়েছে। উন্নয়নের সুতোয় গ্রাম ও শহর বাঁধা পড়েনি মালার মতো। উন্নয়ন সমতাকামী না হলেও সংকট-সাম্যে বিশ্বাসী। তাই, সংকটের বিনিসুতোর মালায় পুঁতির মতো পাশাপাশি গেঁথে যায় গ্রাম ও শহর। গ্রামে বন্যা হলে শহরে সবজির দাম বাড়ে। নগরে লুকানো গুপ্তধনের সন্ধানে ভিটা ছাড়ে গ্রামের মানুষ। পদভারে শহর ডুবতে থাকে। রক্তে ছড়ানো জীবাণুর মতো সমাজ-জীবন ও রাষ্ট্র-ব্যবস্থার রন্ধ্রে-রন্ধ্রে জেঁকে বসেছে দুর্নীতি। প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা উবে গেছে। মানুষ ভাবছে, ক্ষমতা-কাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেই জীবন হবে নিরুপদ্রব। হবে শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি। তাই, যে যেভাবে পারছে ক্ষমতার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিচ্ছে। কেউ চাইছে বাহুবল। কেউ চাইছে অর্থ-বল। মানুষ মনে করছে, বাহুবল থাকলে অর্থবল আর অর্থবল থাকলে বাহুবল কিনে নেওয়া যায়। এ যেন এক নৈরাজ্য।
মানুষ মানুষকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে মেরে ফেলছে, কুপিয়ে মেরে ফেলছে, পুড়িয়ে মেরে ফেলছে। দুর্বৃত্তদের আস্ফালন বাড়ছেই। সোনাগাজীর সিরাজের মতো চিহ্নিত অপরাধীও টাকা ও বাহুর জোর দেখায়। সিরাজ কি একজন? ৮০ লাখ টাকার বস্তাসমেত ধৃত হলেন যে ডিআইজি, তিনিও কি নন আরেক সিরাজ? ৪০ লাখ টাকা দুদকের কর্মকর্তাকে ঘুষ দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন যে সাবেক ডিআইজি তিনিই-বা আলাদা কীসে? না মরা পর্যন্ত একজন মানুষকে সোল্লাসে পেটানো হচ্ছে। সার্কাস দেখার মতো করে সেই দৃশ্য ভিডিও করছে সমবেত জনতা। অথচ প্রাণ-ওষ্ঠাগত মানুষটির আকুতিতে সারা দিয়ে তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসছে না কেউ। বচসা হওয়ার জেরে যাত্রীকে চাকার নিচে ফেলে পিষে মেরে ফেলছে বাসচালক। বাসের ভেতর গণধর্ষণ করে মেরে ফেলে দিচ্ছে লাশ। এ যদি না হয় ঘোর কলিকাল, তবে আর কলি কাকে বলে? রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশংসা যেহেতু নীতিনির্ধারকদের প্রাপ্য, কলির এই সর্বৈব বিস্তারের নিন্দাও তারাই পাবেন বটে। দেশটা এক দিনে এখানে আসেনি। সবার উদাসীনতা আর লোভের সমন্বয়ে উপস্থিত হয়েছে এই ঘোর সংকট। বিচারে মানুষের আস্থা উবে গেছে। আইনশৃঙ্খলার প্রতি আস্থা গায়েব। কাজীর ঘরে নালিশ করতে যাওয়ার বদলে যার যা বিচার নিজেরটা নিজেই নগদে সেরে নিতে চাইছে। মাৎস্যন্যায়ের মতো বড় মাছেরা ছোট মাছগুলোকে গিলে ফেলছে। দুর্নীতির মচ্ছবে পড়ে দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে ব্যাংক। করের জালের ফুটো এত ছোট করা হয়েছে, সামান্য চুনোপুঁটিও পাড় পাচ্ছে না। অথচ ধনীদের জন্য সুযোগ আকাশছোঁয়া। কেন অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর জনজীবনের স্বস্তি বিপরীতমুখে ছুটছে? স্বাধীনতার অর্ধশতক হয়ে এলো। রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করা জাতির মানবিক বিকাশের যে আকাক্সক্ষা ছিল, নৈতিক মান যা থাকার কথা ছিল, শ্রেণি নির্বিশেষে আর্থসামাজিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন ছিল সেগুলোর ছিটে-ফোঁটাও কেন অর্জিত হয়নি? এই প্রশ্নগুলো শুধু সরকারকে করলে হবে না। জনতারও আত্ম-জিজ্ঞাসা দরকার। সরকার বদল হয়। জনগণই বদলায়। যে জনগণ সরকার বদলায়, সেই জনগণ কেন মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষাকে বাস্তবায়ন করতে পারল না?
সংকট প্রকট হয়েছে। এখন মানবিক উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। প্রয়োজনে অবকাঠামোগত উন্নয়নের গতি কমিয়ে হলেও। মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতেই হবে। দুর্বলের মনেও এই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে, আমিরের হাত কিছুতেই আইনের হাতের চেয়ে লম্বা নয়। এ কাজগুলো করতে হলে উন্নয়ন-ভাবনায় বদল আনতে হবে। উন্নয়নের সংজ্ঞা কালে কালে ঢের পাল্টেছে। ভারী কলকারখানা আর ঝাঁ-চকচকে অবকাঠামোই এখন আর উন্নয়ন বলে বিবেচিত নয়। কেন্দ্রে পুঞ্জীভূত হবে উন্নয়ন, আর তার থেকে চুঁইয়ে পড়া মধুতে সুমিষ্ট হবে প্রান্তের জীবন উন্নয়নের এই নকশাও বহু আগেই বাতিল হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, উন্নয়ন মানে সুশাসন। উন্নয়ন মানে ন্যায্যতা বিধান। উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনে আস্থা ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনা। স্বস্তি ও শান্তিই কাল নির্ণায়ক, অর্থ নয়। মহাভারত থেকে আমি অন্তত তাই বুঝেছি। কুরুক্ষেত্রকে সাক্ষী রেখে বলছি, কলিকালে অর্থের অভাব নেই, ন্যায়-বিচার আর শান্তিরই অভাব।
লেখক : কবি ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক