উপকরণ সংকটে নৈরাজ্য

দেশে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট ও রি-এজেন্ট নিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। ডেঙ্গু রোগী বেড়ে যাওয়ায় সারা দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন অসংখ্য মানুষ। ডেঙ্গু আছে কি না তা পরীক্ষা করতে হাসপাতালগুলোতে প্রত্যেক রোগীর জন্য আলাদা আলাদা এসব কিট ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে। রোগীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কিট ও রি-এজেন্ট ব্যবহারের সংখ্যা। সে অনুপাতে কিট ও রি-এজেন্ট সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না সরকার। এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে কিট ও রি-এজেন্ট আমদানিকারক ও বিক্রেতারা এসব পণ্যের দাম ইচ্ছেমতো বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে বাজার থেকে এগুলো কিনতে হচ্ছে হাসপাতাল ও ক্লিনিক মালিকদের। রোগীদেরও গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ। এমনকি কিটের অভাবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল-ক্লিনিকে সময়মতো ডেঙ্গু শনাক্তকরণ পরীক্ষা হচ্ছে না।

চিকিৎসকরা বলছেন, সময়মতো ডেঙ্গু শনাক্ত করা না গেলে সাধারণ ডেঙ্গু পরবর্তী সময়ে জটিল ডেঙ্গুতে রূপ নিচ্ছে। এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের সাবেক ডিন ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেকোনো উপায়ে রোগীর ডেঙ্গু শনাক্ত করতে হবে। তা না হলে সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া যাবে না। সরকারকে এ ব্যাপারে অবশ্যই উদ্যোগ নিতে হবে। কিটের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

বর্তমানে দেশে প্রতিদিন ঠিক কী পরিমাণ কিট দরকার, এর কোনো সঠিক তথ্য নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঠিক কী পরিমাণ কিট প্রতিদিন লাগছে, সে হিসাব আমাদের কাছে নেই। সবাইকে স্থানীয়ভাবে করতে বলেছি। তবে এটা দেখার দায়িত্ব ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের। এমনিতেই আমাদের সরকারি হাসপাতালগুলো ব্যস্ত রোগীর চিকিৎসায়। সেখানে তাদের এ দায়িত্ব দিলে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হবে। চাহিদার সঠিক পরিসংখ্যান দিতে পারেনি ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরও। এ ব্যাপারে অধিদপ্তরের ড্রাগ সুপার মাহবুব হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই হিসাব করা খুব কঠিন। কারণ শুধু তো রোগী নয়, যারা আতঙ্ক নিয়ে আসছে তাদেরও ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হচ্ছে।

মেডিকেল অ্যান্ড সার্জিক্যাল ইকুইপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অবশ্য একটি পরিসংখ্যান দিয়েছে। তাদের তথ্যমতে, দেশে বছরে ২০-৩০ হাজার পিস কিট ও রি-এজেন্টের চাহিদা রয়েছে। আর গত ১০ দিনে এই চাহিদা ২-৩ লাখে এসে ঠেকেছে।

এমনকি কিটের বাজার নিয়ন্ত্রণে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর এখনো মাঠে নামেনি বলে জানালেন এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, এমনিতেই দেশে কিটের সংকট ছিল। সরকার আমদানিকারকদের ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ (এনওসি) দিয়ে আমদানির অনুমতি দিয়েছি। তাদের রেজিস্ট্রেশনও করা হয়নি। এই মুহূর্তে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে সংকট বাড়তে পারে। আমরা চাইছি স্থানীয়ভাবে কিটের উৎপাদন শুরু হলে বাজার মনিটরিং করতে নামব।

এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিট ও রি-এজেন্টের বাজারে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। রাজধানীর শাহবাগ ও তোপখানা রোডের বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জামাদি বিক্রির দোকান ঘুরে দেখা গেছে, এনএস১, আইজিএম ও আইজিজি পরীক্ষার মাধ্যমে ডেঙ্গু শনাক্তকরণে ব্যবহৃত একটি কিটের দাম নেওয়া হচ্ছে ৪৫০-৫০০ টাকা। আগে এটির মূল্য ছিল ১৫০-১৮০ টাকা। বিএমএ ভবনের রি-এজেন্ট বিক্রেতা ও সোনিয়া স্টোরের মালিক লুৎফুল হোসাইন বলেন, বর্তমানে চাহিদা বেশি কিন্তু সরবরাহ কম। এ কারণে দাম একটু বেশি। সবার কাছে কিট নেই। যাদের কাছে এটি আছে, তারা একটু বাড়তি দামে বিক্রি করছে। কিটের বিভিন্ন প্রকারভেদ আছে। চীন ও ভারত থেকে আমদানি করা কিটের দাম কম। কিন্তু ইউএসএ, ইউকে, কোরিয়া ও ইউরোপের কোনো দেশ থেকে আমদানি করা কিটের দাম বেশি।

কিটের বাজারের বিশৃঙ্খলা দূর করার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কিছু করার নেই বলে জানান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালে যেন দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার হয়, সেজন্য আমরা বলেছি। আমরা হাসপাতালগুলোতে নিজেদের ব্যবস্থাপনায় কিনতে বলেছি। পরে সে অর্থ সমন্বয় করে দেওয়া হবে। আমাদের কাছে যে ৪০ হাজার কিট ছিল, তা জেলা-উপজেলা হাসপাতালগুলোকে দিয়েছি। এক সপ্তাহের মতো চলবে। এর মধ্যে স্থানীয়ভাবে দেশেই উৎপাদন শুরু হবে। তখন সমস্যা হবে না। আমরা কিটসহ ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার জন্য আজ (গতকাল রবিবার) জেলা হাসপাতালকে ১০ লাখ টাকা ও উপজেলা হাসপাতালকে ২ লাখ টাকা করে দিয়েছি।

কিটের ব্যবহার ও বিপণনে শৃঙ্খলা আনতে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানান অধিদপ্তরের ড্রাগ সুপার মাহবুব হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, গতকাল পর্যন্ত দেশে ৩ লাখ ৬৮ হাজার ২২০টি কিট ও রি-এজেন্ট এসেছে। ৬ আগস্ট থেকে স্থানীয়ভাবে দেশে ‘ওএমজি হেলথ কেয়ার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান কিট উৎপাদন শুরু করবে। তাদের কাঁচামাল চলে এসেছে। এদের উৎপাদিত ‘এনএস১’ পরীক্ষার জন্য কিট ৩০০ টাকা এবং আইজিজি ও আইজিএম রক্তের দুটি পরীক্ষার জন্য পৃথকভাবে ১৭৫ টাকা করে এবং একসঙ্গে নিলে ৪৫০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছি। সেগুলো বাজারে এলে আমদানি করা কিটের মূল্য নির্ধারিত হবে। তখন নির্ধারিত মূল্যেই বিক্রি করতে হবে।

ডেঙ্গু রোগী শনাক্তকরণের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তিনটি পরীক্ষা নির্ধারণ করেছে। এর একটি এনএস১ (নন স্ট্রাকচারাল প্রোটিন-১)। অন্য দুটি হলো আইজিএম (ইমিউনোগ্লোবিউলিন্স এম) এবং আইজিজি (ইমিউনোগ্লোবিউলিন্স জি)। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার (ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া) ডা. আক্তারুজ্জামান জানান, জ¦র হওয়ার তিন দিনের মধ্যে এনএস১ পরীক্ষা করানো হলে কেউ ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে তা পজিটিভ আসবে। তবে তিন দিনের বেশি হলে তখন এনএস১ পরীক্ষায় কোনো লাভ হবে না। তখন আইজিএম পরীক্ষা করাতে হবে। সেটিও জ¦র হওয়ার ছয় থেকে সাত দিনের মধ্যে করাতে হবে। এরপর পরীক্ষা করালে পজিটিভ আসবে না। আর আইজিজি পরীক্ষার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি অনেক বছর আগেও ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে তা জানা যাবে। এই পরীক্ষাগুলোর জন্যই মূলত আরডিটি কিট ব্যবহার করা হয়। রক্ত সংগ্রহ করে এই মেডিকেল ডিভাইসটিতে দিলে সঙ্গে সঙ্গে ফলাফল নিশ্চিত করা যায়।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার নির্ধারিত মূল্যের বেশি টাকায় কিট বিক্রি করায় একটি প্রতিষ্ঠানকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এ ব্যাপারে অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, বাজারে কিট ও রি-এজেন্টের সংকট দেখা দিয়েছে। এ সুযোগে একশ্রেণির অসাধু বিক্রেতা স্টক করে কিট বেশি দামে বিক্রি করছে। আমাদের কাছে অভিযোগ ছিল ২৫০-৩০০ টাকায় কিট বিক্রি হচ্ছে। ভোক্তার স্বার্থে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

মেডিকেল অ্যান্ড সার্জিক্যাল ইকুইপমেন্ট মার্কেট ঘুরে ও বিক্রিতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মার্কেটে কিট ও রি-এজেন্ট যা ছিল, তা গত সাত দিনে বিক্রি হয়ে গেছে। দুয়েকটি দোকানে লুকিয়ে চড়া মূল্যে কিট বিক্রি করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। তোপখানা রোডের এ মার্কেটে সার্জিক্যাল স্টোরের মালিক আবদুল্লাহ বলেন, কিছুদিন আগেও কিট ঠিক দামেই বিক্রি হয়েছে। এখন সংকট চলছে। এ কারণে একশ্রেণির ব্যবসায়ীরা বাড়তি দামে বিক্রি করতে পারে।

বাজারের বিশৃঙ্খলার কথা স্বীকার করলেন মেডিকেল অ্যান্ড সার্জিক্যাল ইকুইপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হাবিব জাহিদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, চাহিদা অনুযায়ী বাজারে কিট ও রি-এজেন্ট নেই। যেটুকু আছে তা দুয়েক দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। নতুন করে আমদানি করা হচ্ছে। বাজারে ছাড়াও হচ্ছে। কিন্তু সেটাও চাহিদার তুলনায় খুবই কম। ফলে বিক্রেতারা বাড়তি দাম নিতে পারে। বাজারে অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে মনিটরিং করা হচ্ছে। মাইক দিয়ে বারবার বলা হচ্ছে, যাতে কেউ বেশি দাম না রাখে। আমাদের কাছে প্রমাণসহ এলে আমরা ব্যবস্থা নেব।

রাজধানীর একাধিক বেসরকারি হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেও অনেক বেশি দামে কিট ও রি-এজেন্ট কিনতে হচ্ছে। মগবাজারের একটি হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলেন, বাজারে কিট ও রি-এজেন্ট নেই। যে সংখ্যক কিট ও রি-এজেন্ট কিনে রাখা হয়েছিল, সেগুলো দিয়ে টেস্ট করানো হচ্ছে। ৮০-১২০ টাকার কিট ৩০০-৩৫০ টাকা দিয়েও কিনতে হচ্ছে। ল্যাবএইড হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলেন, হাসপাতালের ৩০টি শাখায় প্রতিদিন গড়ে ৩০-৩৫ হাজার কিটের প্রয়োজন। ১৫০ টাকার কিট এখন ৪০০-৪৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এতে করে তাদের পরীক্ষা ব্যয় অনেক বেড়েছে। লোকসান হলেও তারা সরকার নির্ধারিত মূল্যে ডেঙ্গুর পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন।

দেশের সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালেই এ কিটের সংকট দেখা দিয়েছে। রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলো কোনোভাবে চালিয়ে গেলেও বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে কিটের মারাত্মক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। কিট সংকটের কারণে আক্রান্ত রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করা সম্ভব হচ্ছে না বলে আমাদের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।

বাড়তি দামে কিট বিক্রির কথা স্বীকার করেছেন ডিভাইস উৎপাদন ও আমদানির সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো। এ ব্যাপারে দেশের কিট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ওএমজি হেলথ কেয়ার প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী মেসবাউল কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবার কিটের চাহিদা এত বেড়ে যাবে বুঝতে পারিনি। এ কারণে আমরাও বাড়তি কিট রাখিনি। কারণ প্রতি বছর যে পরিমাণ কিট উৎপাদন করা হয়, সেগুলোর প্রায় অর্ধেক থেকে যায়। মেয়াদ শেষে সেগুলো ধ্বংস করে ফেলতে হয়। এতে আমাদের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়তে হয়। কিন্তু এবার চাহিদা এত বেশি যে, উৎপাদন করা সব কিট শেষ হয়ে গেছে। আপাতত উৎপাদন বন্ধ আছে। অতিরিক্ত মূল্যে কিট বিক্রির সত্যতা স্বীকার করে তিনি আরও বলেন, আমার কোম্পানিতে উৎপাদিত কিটের বাজারমূল্য সরকার নির্ধারণ করে দিয়েছে। তবে বাজারে সেটা কত দামে বিক্রি হচ্ছে, তা জানা কঠিন।