‘বিশেষ মর্যাদা বাতিল করায় দখলদার বাহিনীতে পরিণত হবে ভারত’

অধিকৃত কাশ্মীরে জঙ্গি হামলার গুজব ছড়িয়ে নতুন করে ৩৫ হাজার ভারতীয় সেনা মোতায়েন করা হয়। গৃহবন্দি করা হয় দুই সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি এবং ওমর আবদুল্লাহ সহ সেখানকার শীর্ষ নেতাদের। জারি করা হয় কারফিউ। বন্ধ করে দেওয়া হয় ইন্টারনেট পরিষেবা।

নরেন্দ্র মোদি সরকারের এই গুজব আর দমনমূলক ব্যবস্থার নেপথ্যে ছিল জম্মু-কাশ্মীরের সাংবিধানিক সুরক্ষা ‘বিশেষ মর্যাদা’ তুলে নেওয়া যাতে সেখানে হিন্দুবসতি স্থাপনের পথ পরিষ্কার হয়।

শেষপর্যন্ত সেই আশঙ্কাকে সত্যি করে অধিকৃত জম্মু-কাশ্মীরে ‘বিশেষ মর্যাদা’ বাতিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে মোদির বিজেপি সরকার। সোমবার রাজ্যসভায় এই সংক্রান্ত নতুন বিল প্রস্তাব করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। কাশ্মীর পুনর্গঠন নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে একটি বিজ্ঞপ্তিও জারি করা হয়েছে, যাতে রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোভিন্দ স্বাক্ষর করেছেন।

এনডিটিভি জানায়, পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা মেহবুবা মুফতি টুইটার বার্তায় বলেন, “আজকের দিনে ভারতীয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে কালো অধ্যায় রচিত হলো। অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিলের এই সিদ্ধান্ত একতরফা, অবৈধ ও অসাংবিধানিক। এর মধ্য দিয়ে জম্মু-কাশ্মীরে ভারত দখলদার শক্তি হিসেবে পরিণত হবে।”

তিনি আরও বলেন, “ভারত সরকারের উদ্দেশ্য স্পষ্ট। জম্মু-কাশ্মীরের মানুষকে সহিংস করে তুলে এই অঞ্চলের পূর্ণ অধিকার চায় তারা। কাশ্মীরকে দেওয়া ভারতের প্রতিশ্রুতি ব্যর্থ হয়েছে।”

ন্যাশনাল কনফারেন্সের নেতা ওমর আবদুল্লাহ তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “১৯৪৭ সালে কাশ্মীরের জনগণ ভারতের ওপরে যে আস্থা রেখেছিল, তার সঙ্গে পুরোপুরি বিশ্বঘাতকতা করা হয়েছে ভারত সরকারের আজকের এই একতরফা এবং মর্মান্তিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে। এমন সিদ্ধান্ত কাশ্মীরের জনগণের বিরুদ্ধে আগ্রাসন, গতকালকে সর্বদলীয় বৈঠকের মাধ্যমে এমনটাই সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল।”

বেলা ১১টার কিছু পরে রাজ্যসভা অধিবেশনে অমিত শাহ কাশ্মীর নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত জানান। জম্মু ও কাশ্মীরকে ‘বিশেষ মর্যাদা’ দেওয়া সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫-এ ধারা বাতিলের প্রস্তাব করেন তিনি। এর মধ্যদিয়ে অঞ্চলটির কথিত পুনর্গঠন বিল উত্থাপন করেন বিজেপি সভাপতি।

বিরোধী দলসমূহের প্রতিনিধিদের তীব্র আপত্তির মুখে এ প্রস্তাব রাখেন অমিত শাহ। তিনি দাবি করেন, কাশ্মীরের উন্নয়নের জন্যই নতুন এ সংরক্ষণ বিল আনা হয়েছে।

সংসদীয় বিষয় মন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশী বিরোধীদের তিরস্কার করে বলেন, “অমিত শাহ জওহরলাল নেহরুর ঐতিহাসিক ভুলকে সংশোধন করছেন।”

বিবিসি জানায়, কাশ্মীর পুনর্গঠন নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে একটি বিজ্ঞপ্তিও জারি করা হয়েছে, যাতে রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোভিন্দ স্বাক্ষর করেছেন।

এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে সকালে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার এক বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়। মন্ত্রীসভার ঐ বৈঠক শুরু হওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে একান্ত বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।

৩৭০ অনুচ্ছেদের কারণে জম্মু ও কাশ্মীর অন্য যেকোন ভারতীয় রাজ্যের চেয়ে বেশি স্বায়ত্বশাসন ভোগ করতো। এই ধারাটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এর ভিত্তিতেই কাশ্মীর রাজ্য ভারতের অন্তর্ভূক্ত হয়েছে।

অনুচ্ছেদ ৩৭০ ভারতীয় রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীরকে নিজেদের সংবিধান ও একটি আলাদা পতাকার স্বাধীনতা দেয়। এছাড়া পররাষ্ট্র সম্পর্কিত বিষয়াদি, প্রতিরক্ষা এবং যোগাযোগ বাদে অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে স্বাধীনতার নিশ্চয়তাও দেয়।

মূলত সেখানকার জনসংখ্যার আনুপাতিক স্থিতি বজায় রাখতে বহিরাগত বসতিস্থাপন বন্ধে এসব সুরক্ষা দেওয়া হয়।

কেবল স্থায়ী বাসিন্দারাই ওই রাজ্যে সম্পত্তির মালিকানা, সরকারি চাকরি বা স্থানীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার পান।

রাজ্যের বাসিন্দা কোনো নারী রাজ্যের বাইরের কাউকে বিয়ে করলে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। তার উত্তরাধিকারীদেরও সম্পত্তির ওপরে অধিকার থাকে না।

বিজেপি সরকারের এই সিদ্ধান্তের পর এই অধিকার হারাবে কাশ্মীরের জনগণ। মূলত হিন্দু জনগণকে অঞ্চলটিতে বসবাসের সুযোগ করে দিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে কাশ্মীর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষকদের অভিমত।