স্বশাসন হারিয়ে দুই ভাগ রাজ্যজুড়ে ১৪৪ ধারা শীর্ষ রাজনীতিকরা গৃহবন্দি ভূমির মালিক হতে পারবে বহিরাগতরাও ভারতের ভাঙনের শুরু : চিদাম্বরম
রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের আদেশ জারির মধ্য দিয়ে মোদি সরকার বাতিল করল ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা। এই ধারা বাতিল করতে গতকাল সোমবার সংসদে প্রথমে প্রস্তাব পেশ করেন ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সংসদের অনুমোদনের পরই রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ এই প্রস্তাবে সই করেছেন। রাষ্ট্রপতির সইয়ের সঙ্গে সঙ্গেই কাশ্মীরকে বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া ৩৭০ ধারা বাতিল হয়।
বাতিলকৃত ধারায় জম্মু-কাশ্মীরকে বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা দিয়েছিল। এই ধারা বাতিলের ফলে জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যকে দুই টুকরো করে দেওয়া হয়। গতকাল সন্ধ্যায় অমিত শাহ ‘জম্মু ও কাশ্মীর সংরক্ষণ বিল’ নামে আরও একটি প্রস্তাব তিনি পার্লামেন্টে তোলেন। রাজ্যসভায় রাজ্য ভাগের পক্ষে ১২৫ ও বিপক্ষে পড়েছে ৬১ ভোট। এই ভোটের ফলে রাজ্য থেকে লাদাখকে বের করে তৈরি করা হলো নতুন এক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, যার কোনো বিধানসভা থাকবে না। জম্মু-কাশ্মীর এখন থেকে পরিচিত হবে কেন্দ্রশাসিত
অঞ্চল হিসেবে। তবে তার বিধানসভা থাকবে। দুই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পরিচালিত করবেন দুই লেফটেন্যান্ট গভর্নর।
অমিত শাহের ঘোষণার পরেই সংসদে তীব্র প্রতিবাদ করে বিরোধী দলগুলো। বিরোধিতার মুখে অমিত শাহ আবারও বলেন, রাষ্ট্রপতির আদেশ পালিত হবে তাৎক্ষণিকভাবে। জম্মু-কাশ্মীরের ন্যাশনাল কনফারেন্স, পিডিপি ছাড়াও কংগ্রেস, আরজেডি, টিএমসি, ডিএমকে, সিপিএম সাংসদরা তীব্র প্রতিবাদ করেন। সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ওয়াকআউট করে বিজেপির শরিক দল জেডিইউ। অন্যদিকে সিদ্ধান্তের পক্ষে ছিল বিজেডি, ওয়াইএসআরসিপি, শিবসেনা, টিআরএস, টিডিপির মতো দল। তার সঙ্গে বিরোধী শিবিরের মায়াবতীর বিএসপি এবং অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টির সাংসদরাও এই সিদ্ধান্ত সমর্থন করেন।
গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরেই ৩৭০ ধারা বাতিলের পটভূমি তৈরি করা হচ্ছিল। অমরনাথ মন্দিরে তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের কাশ্মীর ছাড়ার নির্দেশ, জম্মু-কাশ্মীরে দফায় দফায় অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের জেরে চাপা গুঞ্জন চলছিল কয়েক দিন ধরেই। গত শনিবার রাতে উত্তেজনা বাড়ে মেহবুবা মুফতির বাড়িতে সর্বদলীয় বৈঠকের পর। ওই বৈঠকের পরই কাশ্মীরের কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গৃহবন্দি করা হয় রাজ্যের দুই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা, মেহবুবা মুফতিসহ অনেক নেতাকে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছিল ১৪৪ ধারা জারি এবং ইন্টারনেট বন্ধের ঘোষণা।
১৯৫০ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় ৩৭০ ধারায় জম্মু-কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হলেও সেই মর্যাদা স্থায়ী ছিল না, তা ছিল অস্থায়ী সংস্থান (টেম্পোরারি প্রভিশন)। কিন্তু এ ধারারই ৩ নম্বর উপধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি ইচ্ছে করলে এই ‘বিশেষ মর্যাদা’ তুলে নিতে পারেন। রাষ্ট্রপতির ওই ক্ষমতাকে ব্যবহার করে মোদি সরকার। এই ধারার অধীনেই ৩৫এ ধারায় ভারতীয় ভূখণ্ডে থেকেও কাশ্মীরের বাসিন্দারা যে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতেন, তা বাতিল হয়ে যায়।
কাশ্মীরের রাষ্ট্রনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের প্রতীক ভারতীয় সংবিধানের দুটি অনুচ্ছেদ। ‘অনুচ্ছেদ ৩৭০’ এবং ‘অনুচ্ছেদ ৩৫-ক’। ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ ও পররাষ্ট্রনীতি ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনার বাকি বিষয়গুলোতে জম্মু ও কাশ্মীরে কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হলে ভারত সরকারকে স্থানীয় আইনসভার সঙ্গে আলাপ করে করতে হয়। প্রথমে এই অনুচ্ছেদ ছিল ৩০৬-এ আকারে। ১৯৫২-এর ১৭ নভেম্বর থেকে তা বর্তমানের ‘অনুচ্ছেদ ৩৭০’ পরিচয় পায়। আইন বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই অনুচ্ছেদ জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতীয় সংবিধান মেনে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দেয়, এই অঞ্চলের ওপর ভারত সরকারের কর্র্তৃত্ব সীমিত করে এবং জম্মু ও কাশ্মীরের নিজস্ব আইনসভার শক্তিমত্তারও স্বীকৃতি দেয়।
ভারতীয় সংবিধানের আলোচ্য দুটি অনুচ্ছেদ প্রত্যাহারের তাৎপর্য রয়েছে। সাধারণভাবে এটা কাশ্মীরকে সাধারণ একটা ভারতীয় অঙ্গরাজ্যে পরিণত করবে। অর্থাৎ কাশ্মীরের স্বাধীনতার বিষয়টি বহুদূর পিছিয়ে যাবে এর মাধ্যমে। তবে বিশেষভাবে ৩৫-ক অনুচ্ছেদ বাতিলের তাৎপর্য হবে সুদূরপ্রসারী। কাশ্মীর আর আগের মতো মুসলমানপ্রধান থাকবে না। জম্মুতেও অমুসলমানদের অংশীদারিত্ব বাড়ানো হবে। আরএসএসের অনেকেই মনে করেন, হিন্দুপ্রধান জম্মু এবং বৌদ্ধপ্রধান লাদাখকে পাশে রেখে কাশ্মীরকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, যদি কাশ্মীরে অমুসলমানদের অংশীদারিত্ব বাড়ানো যায়। কাশ্মীরি অমুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধির আইনগত প্রতিবন্ধকতা অপসারিত হলে ধীরলয়ে এটা একসময় পূর্ণ ভারতীয় রূপ নিয়ে নেবে। এছাড়া ৩৫-ক-এর অনুপস্থিতিতে কাশ্মীরের ভারতীয় করপোরেটদের সম্পদ ক্রয় ও বিনিয়োগেও বিশেষ সুবিধা হবে।
ভারতে এ মুহূর্তে যে আটটি প্রদেশে হিন্দুরা সংখ্যালঘু, তার একটি জম্মু ও কাশ্মীর। প্রদেশের জম্মুতে হিন্দু রয়েছে ৬৩ শতাংশ, লাদাখে ১২ এবং কাশ্মীরে ২ শতাংশ। গড়ে পুরো রাজ্যে ৩৬ শতাংশ। বিজেপি এই অবস্থারই পরিবর্তন ঘটাতে চায় ৩৫-ক পাল্টে।
সাবেক অর্থমন্ত্রী অরুন জেটলি টুইট করেন, ‘একটা ঐতিহাসিক ভুল সংশোধন হলো।’ উল্টো দিকে বিরোধী শিবিরের মেহবুবা মুফতি থেকে গুলাম নবি আজাদ কিংবা পি চিদম্বরম থেকে ডেরেক ওব্রায়েনের মতে, গণতন্ত্রকে হত্যা করল সরকার। এই সিদ্ধান্ত অসাংবিধানিক। জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ এই পদক্ষেপকে কাশ্মীরের জনগণের সঙ্গে ভারতের চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি করে বলেছেন, এর ফল হবে বিপজ্জনক।