লর্ডসে ২০১০ সালে টেস্ট অভিষেক স্টিভেন স্মিথের। তখন ২১ বছরের তরুণ অস্ট্রেলিয়া দলে এসেছিলেন লেগ স্পিনার হিসেবে। ব্যাট করতেন আট নম্বরে। ‘এমসিসি স্পিরিট অব ক্রিকেট’ টেস্ট সিরিজের আওতায় লর্ডসে খেলা টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ১ রান করেছিলেন স্মিথ। দ্বিতীয় ইনিংসেও কিছু করতে পারেননি। ১২ রানে আউট হন। কিন্তু বল হাতে একেবারে ব্যর্থ হননি। প্রথম ইনিংসে বল হাতে না নিলেও দ্বিতীয় ইনিংসে ২১ ওভারে ৫১ রানের বিনিময়ে ৩ উইকেট নিয়েছিলেন।
স্মিথ অ্যাশেজ খেলেন ২০১০-১১-তে। অভিষেকের মতোই দাগ কাটতে পারেননি। ইংল্যান্ড ৩-১-এ অস্ট্রেলিয়া থেকে অ্যাশেজ জিতে ফিরেছিল। প্রথম দুই টেস্টের একাদশে ছিলেন না স্মিথ। পরের তিন টেস্ট খেললেও একটা অপরাজিত হাফসেঞ্চুরি ছাড়া বলার মতো ইনিংস ছিল না।
চার বছর পর সাদামাটা এক ক্রিকেটার রূপান্তরিত হয়েছিলেন বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যানে। ২০১৫ সালের অ্যাশেজের পর উইজডেন ক্রিকেটার অব দ্য ইয়ার, আইসিসি প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার স্বীকৃতি পেয়েছিলেন স্মিথ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই অ্যাশেজ সিরিজে ৫০৮ রান করেছিলেন। লর্ডসে একটা ডাবল সেঞ্চুরি ছিল। ওভালে খেলেছিলেন ম্যাচ জেতানো ১৪৩ রানের ইনিংস। এবার এজবাস্টন টেস্টে দুই ইনিংসে সেঞ্চুরি করে আবার অ্যাশেজ শুরু করেছেন। ২০১৫ সালের সাফল্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত কিন্তু স্পষ্ট।
স্মিথের উঠে আসার গল্পটাও সাধারণ। ১৯৮৯ সালের ২ জুন সিডনিতে জন্ম। মা-বাবা কিন্তু নামটা অনেক বড়ই রেখেছিলেন- স্টিভেন পিটার ডেভেরিক্স স্মিথ। খেলা শুরু করেছিলেন মাত্র পাঁচ বছর বয়সে। স্মিথের ছেলেবেলার হিরো মার্ক ওয়াহ ও মাইকেল স্লাটার। কিন্তু নিজের খেলায় সেই চোখ জুড়ানো সৌন্দর্য নেই। কার্যকারিতায় অবশ্য ছেলেবেলার হিরোদের চেয়ে এগিয়ে গেছেন স্মিথ। একজন মিডিওকার লেগি কীভাবে সেরা ব্যাটসম্যান হয়ে উঠলেন তা জানতে হলে স্টিভ ওয়াহর মন্তব্যটা শুনতে হবে।
এজবাস্টন টেস্টে জোড়া সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়ার পর সাবেক অজি অধিনায়ক বলেছেন, ‘আমি ওর (স্মিথ) মতো কাউকে দেখিনি। সে যেভাবে প্রস্তুতি নেয়, তা অসাধারণ। সে আগে থেকেই সব ভেবে রাখে। অনুশীলনে যে কারও চেয়ে বেশিবার বলে ব্যাট চালায়। সে যখন ব্যাট করতে নামে তখন অনেকটা ঘোরের মধ্যে থাকে।’
কেপটাউন টেস্টের কলঙ্ক পেছনে ফেলে আবার মর্যাদার আসন ফিরে পেয়েছেন স্মিথ। এজবাস্টনের ১৪৪ আর ১৪২ রানের ইনিংসই তাকে আবার টেস্ট সেরার আসনে বসিয়েছে। স্টিভ ওয়াহ তাই প্রশংসা করে বলেছেন, ‘সে জানে কী করবে। সে এটাও জানে প্রতিপক্ষ কী করবে, কীভাবে তাকে আউট করার চেষ্টা করবে। ওকে দেখে মনে হয়, সব উত্তর ওর জানা। সে অসাধারণ একজন খেলোয়াড়। আমার মনে হয় না এমন কাউকে আমি দেখেছি এবং রানের জন্য ওর যে ক্ষুধা এটা আর কারও নেই। ওর টেকনিক দুর্দান্ত। এক কথায় অনন্য। সে জানে কী করছে এবং কীভাবে রান করতে হয়। সে প্রতিটি বল বিশ্লেষণ করে। অনেকটা কম্পিউটারের মতো, প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তর দেয়।’
কেবল স্টিভ ওয়াহ নন, এজবাস্টনের জোড়া সেঞ্চুরি দেখার পর অনেকেই সেরা মানছেন স্মিথকে। সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক মাইকেল ভন টুইটারে লিখেছেন, ‘আমি যত দিন ধরে খেলেছি এবং খেলা দেখেছি, তাতে আমার দেখা সেরা টেস্ট ব্যাটসম্যান হলো স্টিভ স্মিথ। এই লোক একটা জিনিয়াস।’
সবাই যখন তাকে নিয়ে এত কিছু ভাবছে তিনি নিজে কিন্তু ভরপুর ক্রিকেটে ডুবে আছেন। এজবাস্টন টেস্টে খেলার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে স্মিথ বলেছেন, ‘প্রতিটি সকালই (এজবাস্টন টেস্টের প্রথম চার দিন) ছিল বড়দিনের সকালের মতো।’ জোড়া সেঞ্চুরি সম্পর্কে স্মিথ বলেন, ‘এটা সত্যিকার অর্থেই বিশেষ কিছু। আমার জীবনের কোনো পর্যায়ে কোনো ধরনের ক্রিকেটেই আমি দুই ইনিংসে সেঞ্চুরি করতে পারিনি। অ্যাশেজ টেস্টে ফিরেই এটা করেছি। সেটা আবার খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়ে, তাই আমি কৃতজ্ঞ।’
তিনি হয়তো ভাগ্যের কাছে কৃতজ্ঞ থাকতে পারেন, তবে পুরো অস্ট্রেলিয়া তার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে এজবাস্টন টেস্টে দলকে লড়াইয়ে ফেরানোর জন্য।
বল ট্যাম্পারিং-কাণ্ডে অস্ট্রেলিয়ার নেতৃত্ব হারিয়েছিলেন স্টিভ স্মিথ। আবার কি সুযোগ এলে সেই দায়িত্ব নেবেন তিনি? রবিবার দিনশেষের সংবাদ সম্মেলনে এই প্রশ্ন এসেছিল। ‘এটা আমার মাথায় নেই এই মুহূর্তে’- বলে দিয়েছেন স্মিথ।
এজবাস্টনে টিম পেইনের সঙ্গে মিলে দলের নেতৃত্বে সহযোগিতা করা সাবেক এ অধিনায়ক বলেন, ‘আমি মাঠে নামতে চাই, ব্যাটসম্যান হিসেবে রান করতে চাই।’ বলেন, ‘দলে আমি এখন অভিজ্ঞ একজন। টিমকে যেকোনোভাবে সহযোগিতা করতে পারি। ও জানে আমি আছি, যেকোনো পরামর্শের জন্য। যদি দেখি ওকে কিছু বলা দরকার আমি যাব ওর কাছে, দলের ভালোর জন্য কাজ করব।’
একই সঙ্গে ২০১০-এ লর্ডসে টিম পেইনেরও অভিষেক হয়েছিল। তবে বল ট্যাম্পারিং-কাণ্ড না হলে অস্ট্রেলিয়ার নেতৃত্ব পেতেন কি না সন্দেহ আছে। বলা যায় অস্ট্রেলিয়ার আপদকালীন টেস্ট অধিনায়ক। কে জানে হয়তো স্টিভ স্মিথের হাতেই আবার উঠবে নেতৃত্বভার।