জাতিসংঘের সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছেÑ বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার্ত ও অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়ছে। গত জুলাই মাসে জাতিসংঘের নিউ ইয়র্ক সদর দপ্তর থেকে ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড- ২০১৯’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই মন্তব্য করা হয়। এই প্রতিবেদন তৈরিতে বৈশ্বিক জরিপে মোট পাঁচটি প্রতিষ্ঠান কাজ করেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি), আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (আইএফএডি) ও জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক দশক ধরে বিশ্বে ক্ষুধা ও অপুষ্টির সমস্যা ধারাবাহিকভাবে কমলেও ২০১৫ সাল থেকে আবার এই সমস্যা নতুন করে দেখা দিয়েছে। তথ্যানুসারে, ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ৭৮ কোটি ৫৪ লাখ। ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ৭৯ কোটি ৬৫ লাখে পৌঁছে; ২০১৭ সালে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৮১ কোটি ১৭ লাখে পৌঁছে এবং সবশেষ ২০১৮ সালে এসে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৮২ কোটি ১৬ লাখে।
জরিপে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান এফওএ’র মহাপরিচালক হোসে গ্রাজিয়ানো ডি সিলভা জানিয়েছেন, এ বছর প্রতিবেদন তৈরিতে নতুন একটি সূচক ব্যবহার করা হয়েছে খাদ্য অনিরাপত্তা অভিজ্ঞতা স্কেল (এফআইইএস); এটা দিয়ে মাঝারি বা গুরুতর খাদ্য অনিরাপত্তার পরিমাপ কেমন তা নির্ধারণ করা হয়। এফআইইএস’র তথ্যানুসারে, বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মানুষ মাঝারি ও গুরুতর খাদ্য অনিরাপত্তার মধ্য রয়েছে। যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ। এই সংখ্যা আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলের দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। এই অঞ্চলে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ২২ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে মোট ২৬ কোটি মানুষ। আর এই অঞ্চলের ২০ শতাংশ মানুষ অপুষ্টির শিকারÑ ২৫ কোটি ৬১ লাখ মানুষ। অন্যদিকে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। যা ওই অঞ্চলে মোট জনসংখ্যার ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ।
ক্ষুধার্ত মানুষের শতকরা হার আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলে বেশি হলেও বিশ্বের মোট ক্ষুধার্ত মানুষের অর্ধেকের বেশি বাস করে এশিয়া মহাদেশে। জনসংখ্যার হিসেবে এই অঞ্চলে ৫১ কোটি ৩৯ লাখ মানুষ ক্ষুধার্ত অবস্থায় জীবন-যাপন করছে। জরিপের তথ্যমতে গত এক দশক আগের এই অঞ্চলের ক্ষুধা ও অপুষ্টির সমস্যা নিম্নমুখী ছিল। কিন্তু ২০১২ সালের পর থেকে পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে। বর্তমানে এই অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত মানুষ বাস করে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়াতেÑ ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। আর পশ্চিম এশিয়াতে ১২ দশমিক ৪ শতাংশ ক্ষুধার্ত মানুষের বাস। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায় ১৫ শতাংশ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে মোট ২৭ কোটি ১৭ লাখ মানুষ। অন্যদিকে সবচেয়ে কম ক্ষুধার্ত মানুষের বাস ইউরোপ ও আমেরিকায় ৮ শতাংশ। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত বছর বিশ্বের ৩৩টি দেশের মোট ৯ কোটি ৬০ লাখ মানুষ খাদ্য অনিরাপত্তায় ভুগেছে। প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী ২ কোটি ৫ লাখ শিশু স্বাভাবিকের চেয়ে কম ওজন নিয়ে জন্ম নিচ্ছে। তবে আশার দিক হচ্ছে, ৫ বছরের নিচে শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়া শিশুর সংখ্যা গত ৬ বছরে ১০ শতাংশ কমেছে। তারপরও বিশ্বব্যাপী এখনো ১৪ কোটি ৯০ লাখ শিশু এ সমস্যায় ভুগছে। আর এই সমস্যা থেকে স্থূলতার শিকার হয়ে সারা বিশ্বে প্রতি বছর ৪০ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে বিশ্বব্যাপী এই ক্ষুধা ও অপুষ্টির প্রকোপ বৃদ্ধির কারণ কী? প্রতিবেদনে ক্ষুধা ও অপুষ্টি সমস্যা বৃদ্ধির জন্য প্রধানত দুটি বিষয়কে দায়ী করা হয়েছে এক. বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ জলবায়ু পরিবর্তন এবং দুই. যুদ্ধবিগ্রহ। এছাড়াও আরও বেশ কিছু কারণ উল্লেখ করা হয়েছে নিম্নমুখী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব, বেকার সমস্যা ও আয়বৈষম্য। ক্ষুধা ও অপুষ্টি বৃদ্ধির কারণ হিসেবে যে সব বিষয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে অঞ্চল ভেদে এসবের বাস্তবচিত্র আমরা দেখতে পাই। এফএও’র তথ্যানুযায়ী, ভয়াবহ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এশিয়াতে ২০০৫-২০১৫ সালের মধ্যে ৪ হাজার ৮শ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতিসাধন হয়েছে। আর এ ক্ষতি মূলত হয়েছে এ অঞ্চলের প্রধান অর্থনৈতিক হাতিয়ার কৃষির ওপর। অন্যদিকে এই অঞ্চলে রয়েছে চরম আয়বৈষম্য। এই অঞ্চলে সমস্যার আরও একটি কারণ হচ্ছে যুদ্ধ ও জাতিগত সংঘাত আফগানিস্তানে দীর্ঘ মেয়াদে যুদ্ধের ফলে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে এবং মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সে দেশের সেনাবাহিনী কর্তৃক গণহত্যার পর তারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়া ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ-মালদ্বীপ-ইন্দোনেশিয়াসহ আরও কিছু দেশে যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবল রয়েছে অন্যদিকে রয়েছে ব্যাপক আয়বৈষম্য।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ক্ষুধা ও অপুষ্টির সমস্যা বৃদ্ধির কারণ হচ্ছে যুদ্ধ। ইয়েমেন, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, লিবিয়ার মতো দেশগুলো পূর্বে অর্থনৈতিকভাবে বেশ সমৃদ্ধ থাকলেও এখন এসব দেশে ক্ষুধা ও অপুষ্টির সমস্যা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ২০১৫ সালে ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের দমনের জন্য সৌদি আরব হামলা শুরু করলে দেশটির খাদ্য সরবরাহকারী প্রধান সমুদ্রবন্দর হুদাদিয়াহতে বোমাবর্ষণের ফলে বন্দরটি বন্ধ হয়ে যায়। আর এই বন্দর দিয়ে দেশটিতে ৯৫ শতাংশ খাদ্য সরবরাহ করা হতো। এখন সেটা বন্ধ; যার ফলে দেশটি এখন দুর্ভিক্ষের কবলে। একদিকে সেখানে না খেয়ে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষ মারা যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, অন্যদিকে সেখানে ১০ লাখ মানুষ অপুষ্টির শিকার। এই অবস্থা সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও লিবিয়ায় বিরাজ করছে। যুদ্ধের ফলে এসব দেশের খাদ্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে আফ্রিকার এবং সাব-সাহারা অঞ্চলের দেশগুলো অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস, শাসকশ্রেণির দুর্নীতি ও আয়বৈষম্য এবং গৃহযুদ্ধের শিকার। যার ফলে এসব অঞ্চলের অর্থনৈতিক গতি মন্থর। ফলত বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্ষধার্ত ও অপুষ্টির শিকার মানুষ। লাতিন আমেরিকায় বিশেষ করে গুয়েতেমালা, নিকারাগুয়া ও ভেনিজুয়েলার মতো দেশগুলোতে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যার জন্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নাজুক। বেকার সমস্যা, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়াসহ নানা কারণে জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। যার ফলে এই অঞ্চলে ক্ষুধার্ত ও অপুষ্টির শিকার মানুষ বাড়ছে। আর ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের মূল সমস্যা হচ্ছে জলবায়ু পরিস্থিতি। আর ইউরোপ-আমেরিকার সমস্যা হচ্ছে, আয়বৈষম্য ও কর্মসংস্থানের অভাব তথা বেকারত্ব।
বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা ও অপুষ্টির সমস্যা বৃদ্ধির ফলে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা বা ‘এসডিজি’ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান অক্সফামের খাদ্য ও জলবায়ু নীতির প্রধান রবিন উইলাহবি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন, আয়বৈষম্য ও যুদ্ধের ফলে টেকসই উন্নয়নের চেষ্টায় অগ্রগতি বিঘ্নিত হচ্ছে।’ অনুরূপ ভাষ্য দিচ্ছেন জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রধান ডেভিড বিসলি। তিনি বলেন, ‘আমরা ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব অর্জনে সফল হতে পারছি না। কারণ খাদ্য নিরাপত্তা ছাড়া আমরা কখনোই বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা পাব না।’ এমতাবস্থায় দেখার বিষয় টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক থাকে নাকি ভুখা মিছিল আরও লম্বা হয়।
লেখক : সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া