সর্বোত্তম ফরম্যাট টেস্টকে বিদায় বললেন স্টেইন

থেমে গেল স্টেইন গান। টেস্ট ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়ালেন ডেল স্টেইন। ১০০ হতে আর মাত্র ৭ টেস্ট বাকি ছিল। শততম টেস্ট খেলার যে গৌরব তা না পাওয়ার আক্ষেপ কি আজীবন বয়ে বেড়াবেন ডেল স্টেইন! ৯৩ টেস্ট খেলে সাদা পোশাকের ক্রিকেটকে যে বিদায় বলে দিলেন। অবশ্য এছাড়া আর কি-ই বা করার ছিল ৩৬ বছর বয়সী এ পেসারের। ইনজুরির ধাক্কায় বারবার যেভাবে খেলা থেকে পিছলে পড়ছিলেন তাতে বড় দৈর্ঘ্যকে বিদায় বলে দেওয়াই শ্রেয়। একই কারণে গত মাসে শেষ হাওয়া বিশ্বকাপেও খেলতে পারেননি। অবসরের ঘোষণার সময় এই আক্ষেপটা ঝরল স্টেইনের মুখেই। উপায়ন্তর না দেখে প্রিয় ফরম্যাট টেস্ট ছেড়ে মনোযোগী হতে চান ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে।

যথার্থই বলেছেন স্টেইন। টেস্ট যে তার খুব প্রিয় ছিল তা পরিসংখ্যানই বলে দেয়। টেস্টে পেসারদের মধ্যে অন্যতম সেরা ক্যারিয়ার তার। টেস্টেই তিনি দেশসেরা উইকেটশিকারি। ৯৩ টেস্টে নিয়েছেন ৪৩৯ উইকেট। বছরের শুরুতে এই ফরম্যাটে দক্ষিণ আফ্রিকার সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি শন পোলককে টপকেছিলেন। ১০৮ টেস্টে ৪২১ উইকেট নিয়ে শীর্ষে ছিলেন পোলক। ১০ বছর অক্ষত ছিল রেকর্ডটি। অবশেষে ২০১৮-১৯ বক্সিং ডে টেস্টে স্টেইন তা ভেঙে নিজের করে নেন। স্টেইন ৪৩৯ উইকেট নিয়েছেন ১৭১ ইনিংসে আর পোলকের ৪২১ উইকেট নিতে লেগেছে ২০২ ইনিংস। আরও একটি দিকে শীর্ষে স্টেইন। তার চেয়ে বেশি এক ম্যাচে ১০ উইকেট নিতে পারেননি কোনো প্রোটিয়া বোলার। চারবার করে আছে মাখায়া এনটিনি ও কাগিসো রাবাদার। স্টেইনের সর্বোচ্চ পাঁচবার। এছাড়া টেস্টে ৩০০ বা তার বেশি উইকেট নেওয়া বোলারদের মধ্যে সেরা স্ট্রাইকরেটও তার।

এমন এক পরিসংখ্যান থেকেও ফরম্যাটটিকে বিদায় বলে দেওয়া সত্যিই কষ্টের। অবসর ঘোষণায় এটাই জানালেন এই প্রোটিয়া পেসার, ‘আজ ক্রিকেটে আমার সবচেয়ে ভালোবাসার ফরম্যাটকে আমি বিদায় বলছি। আমার মতে এই খেলার সবচেয়ে সেরা ফরম্যাট হলো টেস্ট ক্রিকেট। এটা মানসিক, শারীরিক ও আবেগ সবদিক থেকে আপনার পরীক্ষা নেয়। ক্যারিয়ারে আর একটি টেস্টও খেলব না এটা ভাবা আমার জন্য ভয়ানক। কিন্তু একদম যদি সরে যেতে হয়, তবে এর চেয়ে ভয়ানক আর কিছু হতে পারে না। নিকটঅতীতে আমি বেশ কয়েকবার ইনজুরিতে পড়েছি। যে কারণে বিশ্বকাপেও খেলতে পারিনি, যা নিয়ে গত চার বছর স্বপ্ন দেখছিলাম। এসব আমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। তাই আরও বেশিদিন ক্রিকেটের সঙ্গে থাকার চেষ্টায় ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতেই খেলব। প্রোটিয়া জার্সি গায়ে ছোট ফরম্যাটে আশা করি আরও কিছুদিন খেলব। আমার ক্যারিয়ারের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে ধন্যবাদ দিতে চাই, আলাদা করে কারও নাম বলার নেই কারণ সবাই আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’

স্টেইনের সাফল্য ছড়ানো টেস্ট ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় প্রমাণ রেকর্ডসংখ্যক সময় র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষে থাকা। ২০০৮ থেকে ২০১৪Ñ ছয় বছরে মোট ২৬৩ সপ্তাহ টেস্টের এক নম্বর বোলার ছিলেন স্টেইন। তার পুরস্কার হিসেবে ২০০৮-এ আইসিসির বর্ষসেরা টেস্ট ক্রিকেটারের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। পরে ২০১৩ সালে উইজডেনের বর্ষসেরা ক্রিকেটারও হয়েছেন। পরের বছর ম্যাগাজিনটির জরিপে বিশ্বের শীর্ষ ক্রিকেটারও হয়েছেন। এছাড়া ক্যারিয়ারজুড়ে ইএসপিএন-ক্রিকইনফোর বর্ষসেরা একাদশে বেশ কয়েকবার জায়গা পেয়েছিলেন।

এত সাফল্য আরও টানতে ব্যর্থ হন ইনজুরির কারণে। ২০১৬ সালের শেষদিকে অস্ট্রেলিয়া সফরে ডান কাঁধের হাড় ভেঙে যায় তার। তাতে ক্যারিয়ারটাই শেষ হতে বসেছিল। ওই ইনজুরির সঙ্গে ১৪ মাসের লড়াই জিতে ২০১৮-এর শুরুতে ভারতের বিপক্ষে ফিরেছিলেন। এত ধকলের পরও প্রথম উইকেটটি নিতে নিয়েছিলেন মাত্র ১৪ বল। কাঁধের ইনজুরি থেকে পুরোপুরি সেরে উঠেছিলেন। ক্যারিয়ারটাকে আবারও ট্র্যাকে তুলেছিলেন প্রায়। তখনই আবার ইনজুরি, এবার গোড়ালি। এরসঙ্গে কয়েক মাস লড়ে আবার মাঠে ফিলেন ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে। এই সিরিজের বক্সিং ডে টেস্টেই ৪২২তম উইকেট নিয়ে পোলকের রেকর্ড ভাঙেন স্টেইন। ৪০০ থেকে ৪২২-এ আসতে বিশ্বের সেরা স্ট্রাইক রেটধারী বোলারের লেগে যায় ৪১ মাস। ইনজুরির সঙ্গে স্টেইনের লড়াইটা এখানেই স্পষ্ট।

এ বছর সেই ইনজুরির জন্যই খেলতে পারেননি বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপের আগে আইপিএলে খেলতে এসেছিলেন ফিটনেস ফিরে পাওয়ার আশায়। কিন্তু এখানেই পুরনো কাঁধের ইনজুরি আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আইপিএল ছেড়ে ফিরে যান দক্ষিণ আফ্রিকায়। টেস্টে বোর্ডের সঙ্গে নতুন চুক্তির আগে তাই নিজেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হলেন স্টেইন। তবে ২০১৯-২০ মৌসুমের জন্য ছোট ফরম্যাটের চুক্তিতে আছেন।

তবে টেস্ট ক্যারিয়ারকে বিদায় বলে দেওয়ার দিনে দুঃখ ভুলতে পারেন অনেকের ভালোবাসায়। শচিন টেন্ডুলকার থেকে শুরু করে সতীর্থ-বিপক্ষ-সাবেক সতীর্থ অনেকেই তাকে টুইটার বার্তায় ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন। বর্তমান প্রোটিয়া অধিনায়ক ফাফ ডু প্লেসি লেখেন, ‘তার প্রজন্মের সেরা। পরিসংখ্যান কখনই মিথ্যে বলে না আর স্টেইনের পরিসংখ্যান সেরা। আমি জানি টেস্ট তোমাকে কতটা আকর্ষণ করে। এখানে খেলতে না পেরে তুমি কতটাই ব্যথিত। আশা করি এখনো দক্ষিণ আফ্রিকার জার্সিতে তোমাকে দেখব।’ এবি ডি ভিলিয়ার্স স্টেইনের গালে নিজের চুমু খাওয়ার ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, ‘তোমার সঙ্গে বলার মতো অনেক স্মৃতি। আমরা একসঙ্গে শুরু করেছিলাম এবং তোমার সেরা সময় সামনের সিটে বসে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।’ স্টেইনের বল মোকাবিলা করা শচিন জানাচ্ছেন, ‘ভবিষ্যতের জন্য তোমাকে অনেক শুভকামনা। ব্যাটসম্যানদের সেরা চ্যালেঞ্জ তুমি দিয়েছ। তোমাকে বল করতে দেখা ও তোমার বিপক্ষে খেলা দুটোই আমার জন্য অনেক পাওয়া।’

ক্রিকেট সাউথ আফ্রিকার চিফ এক্সিকিউটিভ থাবাং মোরে দেশের সর্বকালের সেরা উইকেটশিকারিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছেন, ‘ডেল স্টেইন ক্রিকেটের সর্বকালের সেরাদের একজন। টেস্ট অভিষেকেই ২০০৪ সালে প্রতিপক্ষ অধিনায়ক মাইকেল ভনকে দুর্ধর্ষ বোলিংয়ে আউট করেছিল। সেই সময় থেকেই বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ফাস্ট বোলার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।’

সেই স্টেইন আর টেস্ট খেলবেন না, ক্রিকেটের জন্য যা বড্ড হতাশার বিষয়।