কিশোরগঞ্জে চলন্ত বাসে নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলার তদন্ত শেষে আদালতে র্চাজশিট দাখিল করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা বাজিতপুর থানার ওসি তদন্ত মো. সারোয়ার জাহান।
চার্জশিটে স্বর্ণলতা পরিবহনের মালিক আল মামুন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক পারভেজ সরকারসহ নয়জনকে আসামি করা হয়েছে। এদের মধ্যে ছয়জন পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে। ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত বোরহানসহ তিনজন এখনো পলাতক।
এ ব্যাপারে মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ও কিশোরগঞ্জের জেলা পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ বৃহস্পতিবার দুপুরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বলেন, তানিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার তদন্ত শেষে মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক আল-মামুনের কাছে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।
তিনি জানান, হত্যা মামলার চার্জশিটের অন্যান্য আসামির মধ্যে রয়েছে, স্বর্ণলতা পরিবহনের চালক নুরুজ্জামান নুরু, হেলপার লালন মিয়া, চালকের আত্মীয় বোরহান, কাউন্টারের ম্যানেজার আল-আমিন, রফিকুল ইসলাম, খোকন মিয়া ও বকুল মিয়া ওরফে ল্যাংড়া বকুল। আসামিদের মধ্যে নুরুজ্জামান, লালন ও রফিকুল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
৬ মে রাতে ঢাকা থেকে স্বর্ণলতা পরিবহনের একটি বাসে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিলেন কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুড়ি ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের মেয়ে ও ঢাকার কল্যাণপুর এলাকার ইবনে সিনা হাসপাতালের সিনিয়র নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়া। কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি আসার পর বাসের অন্য যাত্রীরা নেমে যান। সেখান থেকে বাজিতপুর উপজেলার পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার পথে চলন্তবাসে গজারিয়া বিলপাড় নামক এলাকায় তানিয়াকে একা পেয়ে বাসের চালক ও সহকারীরা মিলে চলন্ত বাসেই ধর্ষণের পর হত্যা করে। পরে তানিয়ার মরদেহ কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রেখে পালিয়ে যায় তারা।
এ ঘটনায় নিহতের বাবা বাদী হয়ে চারজনের বিরুদ্ধে বাজিতপুর থানায় মামলা করেন।
আসামিদের জবানবন্দী ও তদন্তে জানা গেছে, স্বর্ণলতা পরিবহনের চালক নুরুজ্জামান, হেলপার লালন মিয়া ও চালকের খালাত ভাই বোরহান ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় সরাসরি জড়িত। ঘটনার দিন ৩২ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকা থেকে স্বর্ণলতা পরিবহনের বাসটি পিরিজপুর যাচ্ছিল। নার্স তানিয়া বিমানবন্দর থেকে বাসে ওঠেন। বাসটির সর্বশেষ পুরুষ যাত্রী বাজিতপুরের উজানপুরে নেমে যান। এরপর বাজিতপুরের গজারিয়া এলাকায় ফরিদ মিয়ার কলাবাগানের পাশে বাসটি থামিয়ে তানিয়াকে ধর্ষণ করা হয়। তার চিৎকারের আওয়াজ যাতে বাইরে না পৌঁছায়, সেজন্য ধর্ষণকারীরা বাসের সব দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখে। এরপর আবার ধীরে ধীরে চলতে থাকে স্বর্ণলতা। এভাবে ২০ মিনিট তানিয়ার ওপর নির্যাতন চালায় তারা।
ধর্ষণের পর তানিয়াকে হত্যা করা হবে নাকি বাঁচিয়ে রাখা হবে, তা নিয়ে তিনজনের মধ্যে তর্কাতর্কিও হয়। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, তাকে বাস থেকে ফেলে হত্যার পর দুর্ঘটনার নাটক সাজানো হবে।
মামলার তদন্ত-সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তানিয়াকে প্রথম ধর্ষণ করে চালক নুরুজ্জামানের আত্মীয় বোরহান। এরপর ধর্ষণ করে নুরুজ্জামান। এরপর ধর্ষণ করে হেলপার লালন। এক পর্যায়ে তানিয়া লালনকে লাথি মেরে সরিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। এ সময় নুরুজ্জামান বাসটিকে হার্ডব্রেক কষলে তানিয়া গাড়ির বোনাটের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে বাইরে ছিটকে পড়েন। লালন তখন তানিয়াকে রাস্তাতেই ফেলে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। এতে ধরা খাওয়ার ভয়ে নুরুজ্জামান আপত্তি জানায়। এক পর্যায়ে সেখানে দুটি মোটরসাইকেল ও একটি অটোরিকশা এলে তাদের বলা হয়, বাসযাত্রী তরুণীটি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। তারা সবাই ধরাধরি করে তানিয়াকে আবার বাসে তোলে এবং পিরিজপুরে সততা ফার্মেসিতে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা করায়। তানিয়ার অবস্থা অবনতি দেখে সেখান থেকে লালন মিয়া পালিয়ে যায়। পরে কাউন্টারের কর্মরত আল-আমিন ও রফিকুলের কাছে তানিয়াকে তুলে দিয়ে বাস নিয়ে এলাকা থেকে পালিয়ে যায় নুরুজ্জামান নুরু।
তদন্তে জানা যায়, নার্স তানিয়ার শরীরের ১০ স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তার মধ্যে ধর্ষণের পর মাথার আঘাতে রক্তক্ষরণে তানিয়ার মৃত্যু হয়।