এক.
কয়েক বছর আগের এক সন্ধ্যায় নড়াইলে হাজির হয়েছিলাম দুই বন্ধু। রাতে থাকার ঠাঁই খুঁজতে প্রাণ জেরবার অবস্থা। অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশ্য বেশ সস্তায় হোটেল মিলল। হোটেল মালিকের ভাবভঙ্গি বেশ অদ্ভুত। সব মিলিয়ে ভৌতিক অভিজ্ঞতা। সকালে বের হতেই আগের দিনের মতো সদর দরজায় বসা তিনি। কোথায় যাচ্ছি জিজ্ঞাসা করায় বললাম, এস এম সুলতানের বাড়ি। মুহূর্তে তার চেহারা পাল্টে গেল। কোমল স্বরে জানালেন, সুলতান একজন কামেল আদমি। তার কাছে যেন আমরা কিছু চাই। তিনি ফেরাবেন না! আমরা কিছু চাইনি কিন্তু সুলতান প্রসঙ্গ আসায় বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারি না। কেন তিনি এমন করে বললেন? আগের পড়াশোনায় সুলতানের অদ্ভুত জীবনযাপনের কথা শুনেছিলাম। ছবিতে দেখেছি বিচিত্র ধরনের পোশাক পরতেন তিনি। কিন্তু ভাবিনি- সুলতানের কাছে কিছু চাওয়া যেতে পারে। এমন একটা ইমেজ তার আছে। সেটা গড়লেন কীভাবে?
এইসব গল্প শোনাচ্ছি ‘শিল্পি সুলতানের আত্মকথা : জীবনের জলরঙ’ বইটি প্রসঙ্গে। সুলতানের জীবদ্দশার শেষদিকে বইয়ের কথাগুলো লিপিবদ্ধ করেছিলেন সাংবাদিক মহসিন হোসাইন। যা প্রকাশ হতে হতে কয়েক দশক লেগেছে।
ভূমিকায় সুলতানের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাজ ও সম্পর্কের অভিজ্ঞতা শোনাতে গিয়ে মহসিন লেখেন, ‘জীবনের এক বেলায় প্রায় এক দশক ধরে আমি কবিয়াল বিজয় সরকারের দলে বাঁধনদারের (গান রচনার) কাজ করেছি। সুলতান ভাই ঐ কবির দলের বাঁশিওয়ালা ছিলেন। এই কাজের জন্য আমরা দুজনই অর্থ পেতাম।’ বোঝা যায়, তাদের অন্তরঙ্গতা কতটুকু। কয়েক বছর আগে বিজয় সরকারকে নিয়ে কিছু গল্প শুনেছিলাম তারই বাড়িতে বসে। তিনিও তেমন মানুষ- যার কাছে কিছু চাওয়া যায়। যদিও বিজয় সরকার ও সুলতানের সখ্য নিয়ে কোনো গল্প এই বইয়ে নেই। ঘটনা তো স্রেফ বংশীবাদন নয়- বরং বাংলার নিজস্ব ভাব, দর্শন কীভাবে প্রান্তিক মানুষের মাঝে বেঁচে আছে, আর তা সুলতানের আত্মায় মিশেছে- তার খণ্ড খণ্ড চিত্র মূলত এই বই। যেখানে চর্চা, চিন্তা ও যাপনের সম্পর্ক স্পষ্ট।
দুই.
সুলতানের আঁকাআঁকি নিয়ে বোদ্ধাদের মত ইতিমধ্যে নানাভাবে জেনেছি। সুলতানও কিছু সাক্ষাৎকারে তা খোলাসা করেছেন। এই বইয়ে তার অল্পবিস্তর আছে। এই বইয়ে পাঠকরা বুঝতে পারবেন জীবন কীভাবে সুলতানকে ‘আদম সুরত’-এর শিল্পী বানিয়েছে।
এর প্রারম্ভিক সূত্র মেলে বইটির ‘প্রকৃতির মায়া’ শীর্ষক অংশে। যেখানে সুলতান বলছেন, ‘নানার বাড়ির কাছের সেই বিল, শাপলা, ধান, পাটবন, পাট বাছা, পাট শুকানো, পাট নিড়ানো, শুকনার সময়ের কৃষকের চাষাবাদ- জমি নিড়ানো, ধান রোয়া, ধানকাটা, ধান মাড়াই, ধানভানা আমি কোনোভাবেই ভুলতে পারিনি। সুদূর সিমলা, কাশ্মীর, লাহোর, শিয়ালকোট, করাচি, লন্ডন, আমেরিকায় গিয়ে চাঁচুড়ি-পুরুলিয়ার মাঠ-বিলের সৌন্দর্যের রেণু ছড়িয়ে এলাম। এটা চাঁচুড়ি-পুরুলিয়া বিলেরই দৃশ্য নয়, সারা বাংলাদেশ ঘুরলে এমন দেখতে পাবেন। বাংলার প্রকৃতির মধ্যে কোনো উদাসীনতা নেই- যা আছে তাহলো মায়াবী আকর্ষণ। এই প্রকৃতির মায়া যার মনে রয়েছে তার তো কৃত্রিম কোনো কিছুর কাছে যাওয়ার দরকার নেই।’ (পৃ: ২২)
পড়তে পড়তে মনে হয় সুলতান নিজেই নিজেকে নির্মাণ করেছেন। ‘নির্মাণ’ এই অর্থে যে সেই কৈশোরেই তিনি বুঝতে পারেন জীবনের অভিমুখ। সে পথে হেঁটে গেছেন বরাবর। আর্ট কলেজে বরাবরই প্রথম হওয়া ছেলেটি- যে কিনা সবার চোখে বিস্ময়। হুট করে সব বাদ দিয়ে বের হলেন দেশ দেখতে। কোনো মায়া তখন তাকে বেঁধে রাখতে পারেনি। বইটি পড়তে পড়তে অদ্ভুত মনে হতে পারে! কোথাও থামছেন না সুলতান। মায়া জাগছে মনে। এমন সময় সুলতান একের পর এক ডেরা পরিবর্তন করছেন। একেক জন মানুষের সঙ্গে থাকছেন আবার তাকে ছেড়ে যাচ্ছেন। বেশভূষাও পাল্টে যাচ্ছে। কিন্তু কখনো ভোলেননি বাবা, সৎভাই বা নিজ অঞ্চলের মানুষদের।
“আমার বোধের ভিন্নতা কোথায়? আপনি বললেন, আমার ‘স্কুল অব থট’। আমার স্কুল তো খোলা প্রান্তর, কৃষকের ছোনা ঘরের বারান্দায় লুক্কোটানা চাষী, পাশে ঘুমন্ত বিড়াল, উঠানে অবসন্ন ক্লান্ত কুকুর। লাউ গাছের ঝুলন্ত লাউ, কৃষক বধূর নিকানো চুলোর পাশে রান্নার আয়োজন, বিলের থেকে ধরে আনা মাছ বঁটি দিয়ে কাটা, বিকেলে গ্রাম্য বধূদের চুলবিলি দেওয়া আর সেই সাথে আয়েশ করে কিছুটা গল্পবলা। প্রকৃতি, মানুষ, মানুষ-প্রকৃতির গভীরে যা কিছু আছে সবি আমার ভূমিতে এসেছে। আমার ব্রাশ কোনোভাবেই ব্রিটিশের কৃত্রিম বোহেমিয়ার প্রশ্রয় নেই।” (পৃ: ১৪৫)
তিন.
সুলতান কাঠমিস্ত্রির ছেলে। শৈশবে হারানো মায়ের নাম জানা হয়নি কখনো। নড়াইলের জমিদারবাড়ির সুবাদে আর্ট কলেজে পড়ার জন্য কলকাতায় পাড়ি জমান। এর আগে মাদ্রাসায়ও পড়েন কিছুদিন। কলকাতায় যাওয়ার পর আনুকূল্য পান আর্ট ক্রিটিক শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর। যিনি রাজনীতিবিদ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাই। এই পরিবারের সঙ্গে সুলতানের সম্পর্ক খুবই অন্তরঙ্গ। নড়াইলের জমিদার ও সোহরাওয়ার্দী পরিবার সম্পর্কিত বয়ানগুলো উল্লেখযোগ্য। কারণ, তার বয়ানে সে সময়ের সামাজিক, অর্থনৈতিক বৃত্ত ও সম্পর্কের ঠাসবুনটের একটা প্রাঞ্জল চিত্র ধরা পড়ে। নড়াইলের জমিদার পরিবার সম্পর্কে জানাতে গিয়ে সুলতান যেমন তাদের শিল্প অনুরাগের পরিচয় তুলে ধরছেন, প্রজা বাৎসল্যের কথা বলছেন। একইসঙ্গে বলছেন, তাদের জীবিকা মূলত ‘প্রজা শোষণ’। একইভাবে স্বাধীন পাকিস্তানের শিল্প-সংস্কৃতি যাদের হাতে গড়ে ওঠা তাদের একটা বর্ণনাও পাওয়া যাবে তার কথকতায়।
সুলতান এই স্মৃতিকথায় শুধু চিত্রশিল্পী হয়ে হাজির হননি; ব্রিটিশ ভারতের নানান অঞ্চলের মানুষ, তাদের জীবনবোধ, দর্শন, রাজনীতির- সর্বোপরি তার সময়ের একটি দলিল তুলে ধরেছেন তিনি। এমনকি সুলতানের দিকে চোখ ফেরালেও তার স্বাতন্ত্র্যের বিষয়গুলো ধরা দেয় এতে। তা যেমন চিত্রশিল্পী হিসেবে তার আবির্ভাবের বিষয়ে বা রাজনৈতিক শুদ্ধাচারে, তেমনি সর্বেশ্বরবাদী ধারার মধ্যে সুলতানের নিজেকে বিলোপ ও অনুসন্ধানে; যা কখনোই ফুরোয়নি।
চার.
প্রকাশনার দিক থেকে ‘শিল্পি সুলতানের আত্মকথা : জীবনের জলরঙ’ আরও উৎকর্ষতর হতে পারত। এর প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে বাঁধাই-সাজসজ্জা কোনোটিই মানসম্পন্ন মনে হবে না। কিন্তু পড়তে পড়তে মনে হবে অনাদরে পড়ে থাকা রত্মভাণ্ডার উন্মোচিত হচ্ছে। মলাটের অবহেলা বা মলিনতা বইটির পরতে পরতে থাকা আলোকরশ্মি ঢেকে দিতে পারে না। হ্যাঁ, আরও অনেক কথা হয়তো জানা বাকি। উত্তরকালে হয়তো অনেকটা জানা যাবে। তবে ‘শিল্পি সুলতানের আত্মকথা : জীবনের জলরঙ’... এ যে সুলতানের নিজের কথা! তার হয়ে ওঠার বয়ান।
বই : শিল্পি সুলতানের আত্মকথা : জীবনের জলরঙ
প্রকাশক : মনন প্রকাশ, দাম : ৩২৫ টাকা
লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক