ঝলমলে সাদা বুলেট ট্রেন যায় চীনের গ্রামাঞ্চলে। পথে ফেলে যায় অসংখ্য নির্মাণক্ষেত্র ও নতুন শহরকে। এমন দৃশ্য শিনচিয়াংয়ের, যেখানে হাজার হাজার কিলোমিটার রেলপথ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোর একটিকে সংযুক্ত করেছে প্রাচুর্যের কেন্দ্র ও পূর্ব উপকূলগুলোর সঙ্গে। চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটিতে এখন কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ ও লাখ লাখ পর্যটকের আনাগোনা। যোগাযোগ উন্নত হওয়ায় শিনচিয়াংয়ের দূরত্ব অনেক কমে গেছে, যাতে করে অঞ্চলটির ওপর বেড়েছে সরকারি নিয়ন্ত্রণ। ফলে স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসনের ইতিহাস থাকা অঞ্চলটির চীন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার সম্ভাবনাও কমে যাচ্ছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, শিনচিয়াংয়ে দুটি ব্যবস্থা নিয়েছে চীন। বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি হান জনগোষ্ঠীর লোকজনকে বড় পরিসরে সেখানে নিয়েছে দেশটি। বর্তমানে শিনচিয়াংয়ের কিছু অঞ্চল, বিশেষত নগরকেন্দ্রগুলোতে হানরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। হিমালয়ঘেঁষা ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বাসিন্দারাও শিনচিয়াংয়ের বাস্তবতার দিকে নজর দিতে পারেন। শিনচিয়াং ও তিব্বতে চীন যে নীতিতে এগিয়েছে, বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর কাশ্মীরেও একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলটিতে ব্যাপক হারে হিন্দু জনগোষ্ঠীর বসবাস শুরু হতে পারে। কাশ্মীর ও শিনচিয়াংয়ের মধ্যে অনেক মিল আছে। দুটি অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব নিয়েই বিতর্ক রয়েছে। দুটি অঞ্চলের বাসিন্দারাই অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে লড়ছে। দুটি অঞ্চলের বাসিন্দাদের ওপরই চাপ বাড়ছে। শিনচিয়াংয়ে উইঘুর মুসলমানরা অনেক শহরেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছেন। চাকরির জন্য হান অভিবাসীদের সঙ্গে পাল্লা দিতে হচ্ছে তাদের। একই সঙ্গে তাদের নজরদারি ও গ্রেপ্তারের মধ্যে রাখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, শিনচিয়াংয়ে ২০ লাখের মতো মানুষকে বন্দি করে রাখা হয়েছে, যেগুলোকে সমালোচকরা ‘পুনঃশিক্ষা ক্যাম্প’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। উইঘুর অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, পেইচিং বিভিন্ন নীতির মাধ্যমে ‘সাংস্কৃতিক গণহত্যা’ চালাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুশাসন পালনে বাধা, উইঘুর ভাষা ব্যবহারে বাধার মতো বিষয়গুলো।
হিন্দুদের সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে ভারতের একমাত্র মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য জম্মু-কাশ্মীরে বসতি গড়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিলের পর কাশ্মীরে অন্য রাজ্যের লোকজনের জমি কেনা ও বসবাসে বাধার বিষয়টি কেটে যাওয়ায় এ সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা আনন্দিত হবেন। বিশেষত অনেক হিন্দুই চায়, ১৯৯০-এর দশকে ইসলামপন্থিদের সহিংসতার মুখে পালিয়ে যাওয়া উপত্যকার হিন্দু বাসিন্দা কাশ্মীরি পণ্ডিতরা আবার সেখানে ফিরুক। বর্তমানে লাখো পণ্ডিত বাস্তুচ্যুত। তাদের এই পরিণতি কাশ্মীরের সংরক্ষিত অবস্থা বদলানোর অন্যতম নিয়ামক।
অতীতে মুসলমানবিরোধী সহিংসতার বিষয়টি উপেক্ষার অভিযোগ থাকা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য চীনা মডেল আকর্ষণীয় বিষয় হবে। চীন তার পশ্চিমাঞ্চলীয় অশান্ত অঞ্চলগুলোতে শুধু নিয়ন্ত্রণই বাড়ায়নি, অর্থনৈতিকভাবেও এগিয়েছে। তিব্বত ও শিনচিয়াংয়ের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ার পাশাপাশি এসব অঞ্চলে পর্যটকও বেড়েছে। ভারতের অন্যতম দরিদ্র রাজ্যগুলোর একটি কাশ্মীরে এমন পরিস্থিতিকে স্বাগত জানাতে পারে কেউ কেউ। কাশ্মীরে অস্থিতিশীল অবস্থা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। উপত্যকায় হিন্দু জনগোষ্ঠীর বসবাসের জন্য কঠোর নিরাপত্তা আয়োজনের দরকার হবে।