দেশির সঙ্গে মিলছে মিয়ানমারের ইলিশ

আসন্ন পূর্ণিমার ‘জো’তে (ইলিশ ধরার প্রাকৃতিক মৌসুম) সাগরে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ার আশায় আছেন জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীরা। এতে করে কোরবানির ঈদে সুলভ মূল্যে বড় ইলিশ মধ্যবিত্তের পাতে পড়তে পারে। তারা জানান, সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া শত শত নৌযান আগামী সপ্তাহের মধ্যেই তীরে ভিড়বে। এখন কর্ণফুলী নদীর ছোট ইলিশের পাশাপাশি মিয়ানমারের ইলিশও ধরা পড়ছে। কিন্তু দাম এখনো চড়া।

চট্টগ্রামের দক্ষিণ কাট্টলীর রাসমণি ঘাটে দেখা মিলছে ইলিশের। ২০০ থেকে ৬০০ গ্রামের ইলিশ পাওয়া গেলেও দাম বাড়তি। আবার এসব মাছের স্বাদে রয়েছে ভিন্নতা। গত কয়েক বছর ইলিশের দাম ও প্রাচুর্য সাধারণের নাগালে থাকলেও চলতি বছর এখন পর্যন্ত ইলিশ খরা। এই সুযোগে মিয়ানমারের ইলিশকে দেশীয় বলে চালিয়ে নিচ্ছে আড়তদাররা। এই ইলিশ ৮০০ গ্রাম থেকে এক কেজি বা দুই কেজির ওপরে বাজারে মিলছে।

টাটকা ইলিশের জন্য অস্থায়ী মোকাম রাসমণির ঘাট। কাট্টলীর স্থানীয় জেলেদের জালে ধরা পড়া ইলিশ সেখানকার ভাসমান বাজারেই বিক্রি হয়। পদ্মা কিংবা চাঁদপুরের ইলিশের মতো কাট্টলীতে বিক্রি হওয়া এসব মাছ সাগরের হওয়ায় সুস্বাদু হয় না বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারাই।

গত মঙ্গলবার বিকেলে দক্ষিণ কাট্টলির রাসমণি ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, জোয়ারের সময় না হতেই জেলেরা জাল নিয়ে চলে যাচ্ছেন সাগরে। প্রথমে তাদের নিয়ে যাওয়া জাল ফেলছে। তারপর তুলে আনছে আগের ফেলে যাওয়া জাল, যে জালে এরই মধ্যে ইলিশ আটকে আছে। ইলিশসহ জাল ছোট নৌকায় তুলে ফিরে আসছে ঘাটে। ঘাটে জমে আছে মানুষের ভিড়। কেউ এসেছে ইলিশ দেখতে, কেউ এসেছে ইলিশ কিনতে, আবার কেউ এসেছে নগরীর বাজারে নিয়ে বিক্রির জন্য কিনতে।

সাগর থেকে আনা ২০০ থেকে ৬০০ গ্রামের এসব ইলিশ বিক্রি হচ্ছে টুকরিতে। ভাসমান এই বাজারে টুকরি ভর্তি করেই ইলিশ পাইকারি দরে বিক্রি হয়। একেকটি টুকরিতে চার থেকে ১০টি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে মাছের সংখ্যার ওপর।

বক্সিরহাটের খুচরা মাছ বিক্রেতা মো. রিয়াদুল দামাদামি করে ১০টি ইলিশ কিনেছেন দুই হাজার টাকায়। প্রতিটির ওজন ৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম। তিনি জানান, এসব ইলিশ বাজারে ৬০০ টাকা কেজিতে বিক্রি করা হবে। এই ঘাটে ওজনে ইলিশ কিনতে হয় না। তাই বেশি লাভের আশায় এখানে আসা।

অস্থায়ী এই ইলিশের বাজারে দেখা মিলেছে ২ কেজি ৭০০ গ্রামের মাছেরও। প্রতি কেজি ৩ হাজার ২০০ টাকা। আর এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৯০০ টাকায়। মাঝারি, বড় এসব মাছ ডিমওয়ালা। তবে বড় ইলিশের কদরটা যেন এই বাজারে নেই বললেই চলে।

মাছের পাইকারি বিক্রেতা সাধন জলদাস জানান, দাম বেশি আর মাছ তেমন আসছে না। জেলেরা যা ধরছে, তাই বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় আহরিত ইলিশ রেখে দিলে ক্ষতি। আর বিক্রি হচ্ছে যেসব ইলিশগুলো, সেগুলো এখানকার নয়। বিশেষ করে বড় মাছগুলো আমদানি করা।

দীর্ঘ ১৮ বছর কাট্টলীর উপকূলে সাগরে মাছ ধরেন খেলারাম জলদাস। সাগর পাড়ে ছোট নৌকা থেকে মাছ নামাচ্ছিলেন তিনি। ৩০০ গ্রামের ১৫টি ইলিশ মিলেছে সকালে রেখে আসা জালে। এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, পূর্ণিমার জোর (ইলিশ ধরার প্রাকৃতিক মৌসুম) দিকে সব জেলে তাকিয়ে আছে। যদিও এখন ইলিশ ধরা পড়ছে, কিন্তু তা অন্যবারের চেয়ে তুলনামূলক কম। নৌকার তেল খরচও উঠছে না। এসব মাছ বিক্রি করেও তেমন আয় হবে না।

সাগরের ইলিশে লবণের পরিমাণ বেশি থাকায় নদীর ইলিশের মতো সুস্বাদু হয় না। স্বাদের দিক থেকে সেরা চাঁদপুর ও নোয়াখালী অঞ্চলের ইলিশ। খোঁজ জানা যায়, কক্সবাজারের টেকনাফ দিয়ে ইলিশ আসছে মিয়ানমার থেকে। এসব মাছেই নগরীর বাজার ভরা। সাগর থেকে নৌযান ফিরলেই তবেই ইলিশে মাতম করবে বাজার।

স্থানীয় বাসিন্দা সুধীর জলদাসের সঙ্গে কথা হয় রাসমণির ঘাট বাজারে। তিনি বলেন, মিয়ানমারের ইলিশের পেট ভারী। আবার স্বাদও অনেক কম। দেশি ইলিশের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে এখানে।

উত্তর চট্টলা উপকূলীয় মৎস্যজীবী জলদাস সমবায় কল্যাণ ফেডারেশনের অধীনে উত্তর পতেঙ্গা থেকে সীতাকুণ্ডের উপকূল পর্যন্ত প্রায় ৫২ হাজার পরিবার মাছ ধরা, বেচাকেনার সঙ্গে যুক্ত। তারা প্রতিদিন ছোট ছোট নৌকাযোগে সমুদ্র, নদী উপকূলে মাছ ধরতে যায়। বিকেল নাগাদ মাছ নিয়ে উপকূলে ফিরে আসে। সেখানে আড়তদারদের কাছে এসব মাছ জমা দেয়। ক্ষুদ্র জেলেদের মাছ আড়তদারদের পাশাপাশি খুচরা ব্যবসায়ীরাও কিনে নেয়। আবার জেলেরা নিজেরাও আড়তদারের পাশাপাশি নিজেরাও টুকরিতে নিয়ে বিক্রি করে।

উত্তর চট্টলা উপকূলীয় মৎস্যজীবী জলদাস সমবায় কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি লিটন জলদাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী পূর্ণিমার সময় ইলিশের ঝাঁক ধরা পড়বে। তখন বাজারে মধ্যবিত্তের নাগালে থাকবে ইলিশ। সাগর থেকে বোট ফিরলে আশা করি, কোরবানি ঈদেও ইলিশের অভাব হবে না।’