পবিত্র হজ পালিত

আরাফাত ময়দান বৃষ্টিসিক্ত

পাপমুক্তি ও আত্মশুদ্ধির আকুল বাসনা নিয়ে গতকাল শনিবার পবিত্র হজ পালন করেছেন লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ২০ লাখেরও বেশি ধর্মপ্রাণ মুসলমান শনিবার সকাল থেকেই সমবেত হতে থাকেন সৌদি আরবের মক্কা শহরের আরাফাতের ময়দানে। সূর্যোদয়ের পর হাজিরা মিনা থেকে ট্রেনে, বাসে ও হেঁটে রওনা হন আরাফাতের ময়দানের দিকে। এ সময় লাখো কণ্ঠে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হাম্দা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারিকা লাক’ (আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, সব প্রশংসা ও নিয়ামত শুধু তোমারই, সব সাম্রাজ্যও তোমার) ধ্বনিতে মুখরিত হয় পুরো আরাফাতের ময়দান।

এদিকে গতকাল আরাফাতের ময়দানে বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হয়েছে। হঠাৎ করে বৃষ্টিপাত শুরু হলে অনেক হাজি বৃষ্টি থেকে বাঁচতে ছোটাছুটি শুরু করেন। অনেকে আবার প্রবল ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেই অবিচল থেকে পথ চলেছেন।

আরব নিউজের খবরে জানানো হয়েছে, বৃষ্টি শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই সড়কে পানি জমতে শুরু করে। পানি নেমে       যাওয়ার পর সড়কে পড়ে থাকে থিকথিকে কাদা। এতে হাজিদের চলাচলে বিঘœ ঘটে। তবে এই বৃষ্টিকে তারা সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ হিসেবেই উল্লেখ করেছেন।

এদিকে এই বজ্রবৃষ্টিতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া না গেলেও আকস্মিক বন্যার কবল থেকে বাঁচতে মক্কা শহর কর্র্তৃপক্ষ হাজিদের নিচু এলাকায় অবস্থান না করার আহ্বান জানিয়েছে।

ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি পবিত্র হজ। মূলত ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করাই হজ। আর্থিকভাবে সমর্থ ও শারীরিকভাবে সক্ষম পুরুষ ও নারীর জন্য হজ ফরজ। ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত না হলে হজ হবে না। তাই পাপমুক্তির আকুল বাসনায় লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান (হাজি) মিনা থেকে গতকাল শনিবার আরাফাতের ময়দানে সমবেত হন। গত শুক্রবার হজযাত্রীরা মিনায় অবস্থান করেন। শনিবার ফজরের নামাজ আদায় করে হজযাত্রীরা সেখান থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে আরাফাতের ময়দানে যান এবং সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করেন। এরপর সেখান থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে মুজদালিফায় গিয়ে রাতযাপন ও পাথর সংগ্রহ করেন। কেউ পাহাড়ের কাছে, কেউ সুবিধাজনক জায়গায় বসে ইবাদত করেন। কেউ কেউ যান জাবালে রহমতের কাছে। আবার কেউ কেউ যান মসজিদে নামিরায় হজের খুতবা শুনতে।

সৌদি স্থানীয় সময় দুপুর সোয়া ১২টায় আরাফাতের মসজিদ নামিরায় হাজিদের উদ্দেশে পবিত্র হজের খুতবা পাঠ করেন নতুন খতিব ড. মুহাম্মাদ বিন হাসান আল-শাইখ। এই খুতবায় মুসলিম উম্মাহর জন্য থাকে নানা দিকনির্দেশনা। ৩০ মিনিটব্যাপী প্রদত্ত খুতবার পরপরই স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে জোহরের সময় একই সঙ্গে জোহর ও আসরের কসর সালাতে ইমামতি করেন তিনি।

দুই মাইল দৈর্ঘ্য ও দুই মাইল প্রস্থের বিরাট সমতল ময়দানের নাম আরাফাত। ময়দানের তিন দিক পাহাড়বেষ্টিত। জাবালে রহমত হলো রহমতের পাহাড়। বলা হয়ে থাকে, এই পাহাড়ে হজরত আদম (আ.) ও হজরত হাওয়া (আ.)-এর দেখা হয়েছিল। হজরত মুহাম্মদ (সা.) জাবালে রহমত পাহাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন। এই পাহাড়ে একটি উঁচু পিলার আছে। একে কেউ কেউ দোয়ার পাহাড়ও বলেন।

আজ রবিবার ভোরে ফজরের নামাজ আদায় করে মুজদালিফা থেকে মিনায় ফিরবেন। হাজিরা বড় শয়তানকে পাথর মারবেন, কোরবানি দেবেন, মাথার চুল ছেঁটে মক্কায় গিয়ে কাবা শরিফ তাওয়াফ করবেন। তাওয়াফ, সাঈ শেষে আবার মিনায় ফিরে ১১ ও ১২ জিলহজ (সৌদি আরবের তারিখ অনুযায়ী) পর্যন্ত অবস্থান করবেন। সেখানে প্রতিদিন তিনটি শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করবেন তারা। প্রত্যেক শয়তানকে সাতটি করে পাথর মারতে হয়। প্রথমে জামারায় সগির বা ছোট শয়তান, তারপর জামারায় ওস্তা বা মেজো শয়তান, এরপর জামারায় আকাবা বা বড় শয়তান।

১০ থেকে ১২ জিলহজ তাওয়াফে জিয়ারত করা হজের অন্যতম ফরজ কাজ। কাবা শরিফের তাওয়াফ শুরু করতে হয় হাজরে আসওয়াদ থেকে। ভিড়ের কারণে হাজরে আসওয়াদে স্পর্শ বা চুমু দেওয়া সম্ভব না হলে ইশারায় চুমু দিতে হয়।

এদিকে প্রতি বছর হজের সময় মুসল্লিদের অস্থায়ী আবাস হিসেবে মিনায় বসানো হয় হাজার হাজার তাঁবু। মিনায় ২৪/৬২ নম্বর তাঁবু বাংলাদেশ হজ কার্যালয়। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ১ লাখ ২৭ হাজারের বেশি হাজি সব রকমের সেবা পাবেন সেখান থেকে।

পবিত্র হজ উপলক্ষে মক্কা, মদিনা, মিনা, আরাফাত ময়দান, মুজদালিফা এবং এর আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন আছে। সঙ্গে কাজ করছে ১৬ হাজার গাইড।