নিজ জাতির জন্য অসামান্য ত্যাগ স্বীকারের পরও আধুনিক পৃথিবীতে নৃশংস হত্যাকান্ডের শিকার হতে হয়েছে অনেক রাষ্ট্রনায়ককে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও সপরিবারে নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। কয়েকজন বিখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক ও রাজনীতিবিদের হত্যাকান্ড নিয়ে লিখেছেন আন্দালিব আয়ান
আব্রাহাম লিংকন, ১৪ এপ্রিল ১৮৬৫
১৮৬১ ও ১৮৬৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে যে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল সেটা থামাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন দেশটির ১৬তম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন। তার সময়েই যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথার অবসান হয়। তিনিই রিপাবলিকান পার্টির প্রথম প্রেসিডেন্ট। দাস প্রথাকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের সময় তিনি উত্তরাঞ্চলীয় ইউনিয়ন বাহিনীর নেতৃত্ব দেন এবং দক্ষিণের কনফেডারেট জোটকে পরাজিত করেন। দাস প্রথার অবলুপ্তি ও গৃহযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্টদের একজন মনে করা হয় তাকে।
১৮৬৫ সালের ১৪ এপ্রিল রাজধানী ওয়াশিংটনের ফোর্ড থিয়েটারে নাটক দেখার সময় জন উইলকস বুথ নামের আততায়ীর হাতে নিহত হন তিনি। লিংকনের মাথার পেছনে গুলি করে পালিয়ে যায় উইলকস। এর ১২ দিন পর ভার্জিনিয়ার উত্তরাঞ্চলের একটি খামারের গোলাঘরে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিয়ন সেনাদের হাতে নিহত হন তিনি।
তবে, ১৯০৭ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ে দাবি করা হয়, আসলে গোলাঘরে যিনি নিহত হয়েছেন তিনি উইলকস নন। এরপরও উইলকস ছদ্মনাম নিয়ে বেঁচে ছিলেন প্রায় চার দশক।
মহাত্মা গান্ধী, ৩০ জানুয়ারি ১৯৪৮
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রগামী ব্যক্তি এবং অহিংস আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। ব্রিটিশ শাসনামলে তিনি ছিলেন সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। ভারতে তাকে জাতির জনকের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ভারত এবং বহির্বিশ্বে তিনি মহাত্মা নামে পরিচিত। ভারতীয়রা তাকে ‘বাপু’ বলে ডাকে।
মহাত্মা গান্ধী সাধারণ জীবনযাপন করতেন এবং একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেটি ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। তার নিজের পরিধেয় কাপড় ছিল ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় ধুতি এবং শাল যা তিনি নিজেই চরকায় বুনতেন। তিনি সাধারণ নিরামিষাশী ছিলেন এবং শেষ জীবনে ফলমূলই বেশি খেতেন।
১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি গান্ধীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সে সময় তিনি নতুন দিল্লিতে রাত্রিকালীন পথসভা করছিলেন। তার হত্যাকারী নথুরাম গডসে ছিলেন হিন্দু মৌলবাদী চরমপন্থি সংগঠন হিন্দু মহাসভার আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত। ১৯৪৯ সালের ১৫ নভেম্বর পাঞ্জাবের আম্বালা জেলে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
জন এফ কেনেডি, ২২ নভেম্বর ১৯৬৩
জন এফ কেনেডি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫তম প্রেসিডেন্ট । সংক্ষেপে তিনি জেএফকে নামে পরিচিত। ১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর নিহত হওয়ার আগে তিনি ১৯৬১ সালের ২০ ডিসেম্বর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এর আগে ১৯৫৩ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তিনি ম্যাসাচুসেটস থেকে নির্বাচিত সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি মার্কিন সামরিক বাহিনীতে কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধ শেষে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যোগ দিয়ে রাজনীতিতে জড়ান। তিনি ছিলেন একজন ভালো বক্তা। রাতারাতি তিনি অনেক জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। কূটনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ছিলেন সমান পারদর্শী।
২২ নভেম্বর ১৯৬৩ সালে ছাদখোলা গাড়িতে করে স্ত্রী জ্যাকুলিনকে নিয়ে টেক্সাসের ডালাস অঙ্গরাজ্য ভ্রমণের সময় দুপুর সাড়ে ১২টায় টেক্সাস স্কুল বিল্ডিংয়ের সামনে তার হাজার হাজার অনুগামীর উপস্থিতিতেই জন এফ কেনেডিকে তিনবার গুলি করা হয়। এর আধা ঘণ্টা পরই ডালাস পার্কল্যান্ড হসপিটালে কেনেডিকে মৃত ঘোষণা করা হয়। মাত্র তিন বছর প্রেসিডেন্ট
থাকলেও তিনি হাজার হাজার মার্কিনের চোখের জলে চিরবিদায় নেন। কেনেডি হত্যার এক ঘণ্টার মাথায় হত্যাকারী লি হার্ভে অসওয়াল্ডকে একটি সিনেমা হল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। অসওয়াল্ড একজন সাবেক মেরিন সদস্য। কেনেডি হত্যার এক দিন পরই অসওয়াল্ডকে আদালতে নেওয়ার সময় নাইটক্লাব মালিক জ্যাক রুবে তাকে আচমকা গুলে করে হত্যা করে। কেনেডি হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত রহস্যগুলোর মধ্যে একটি।
সৌদি বাদশাহ ফয়সাল, ২৫ মার্চ ১৯৭৫
ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ, যিনি বাদশাহ ফয়সাল নামেই অধিক পরিচিত। ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবের বাদশাহ ছিলেন। দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আধুনিক নীতি প্রণয়নসহ বিভিন্ন সংস্কারের কারণে তিনি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তার পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ছিল ইসলাম ঘেঁষা, সমাজতন্ত্রবিরোধী এবং ফিলিস্তিনের প্রতি সহানুভূতিশীল।
সেই দিনটি ছিল ১৯৭৫ সালের ২৫ মার্চ। বাদশাহ ফয়সাল রাজপ্রাসাদে এক কুয়েতি প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। প্রতিনিধিদলের সঙ্গে প্রাসাদে ঢোকে তার নিজের এক ভাইপো। এই যুবরাজের নামও ফয়সাল। বাদশাহ ফয়সাল যখন তার ভাতিজাকে ঝুঁকে পড়ে চুমু খেয়ে অভ্যর্থনা জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই পকেট থেকে রিভলবার বের করে ফয়সাল বিন মুসাইদ তাকে হত্যা করে। সেখানে অপেক্ষমাণ কুয়েতি প্রতিনিধিদলের সামনেই ঘটে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড। প্রথমদিকে মুসাইদকে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত ঘোষণা করা হলেও চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেন বাদশাহ ফয়সালকে হত্যা করার সময় মুসাইদ সুস্থ ছিল। শেষ পর্যন্ত বাদশাহ ফয়সালকে হত্যার দায়ে জনসমক্ষে শিরোচ্ছেদে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
আনোয়ার সাদাত, ৬ অক্টোবর ১৯৮১
১৯৫২ সালের মিসরীয় বিপ্লবে রাজা ফারুককে উৎখাতকারী ফ্রি অফিসারদের সিনিয়র সদস্য ছিলেন তিনি। প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসেরের ঘনিষ্ঠদের অন্যতম ছিলেন। তার আমলে দুবার ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ সালে মিসরের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসেন।
১১ বছরের শাসনামলে পুরনো রাজনীতি ও অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন আনেন। পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন বহুদলীয় ব্যবস্থা। সিনাই উপদ্বীপ দখলের জন্য ১৯৭৩ সালে ইয়ম কিপুর যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন, যা ১৯৬৭ সালে ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল দখল করে নিয়েছিল। তার আমলে মিসর-ইসরায়েল শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যার কারণে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী মেনাখেম বেগিমের সঙ্গে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। চুক্তির ফলে মিসর সিনাই উপদ্বীপ ফিরে পায়।
মিসরীয়দের কাছে জনপ্রিয় হলেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ব্যাপারে উদ্যোগী না হওয়ায় মুসলিম ব্রাদারহুড ও বামপন্থিরা তাকে প্রত্যাখ্যান করে। এছাড়া আলোচনা না করে শান্তিচুক্তি করায় আরব দেশগুলো ও প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন প্রতিবাদ করে। এই শান্তিচুক্তিকে তার হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ ধরা হয়। কায়রোতে সামরিক কুচকাওয়াজ চলাকালে কয়েক সেনাসদস্য তাকে গুলি করে হত্যা করে।
বেনিনো অ্যাকুইনো, ২৩ আগস্ট ১৯৮৩
সর্বকনিষ্ঠ যুদ্ধ সংবাদদাতা হিসেবে ১৭ বছর বয়সে দ্য ম্যানিলা টাইমসের জন্য কোরীয় যুদ্ধে যান ফিলিপাইনের এই রাজনীতিক। এ কারণে পরের বছর ফিলিপাইন লিজিওন অব অনার পুরস্কার পান। পরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রামোন ম্যাগসেসের ঘনিষ্ঠ পরামর্শক হন। সিনেটর (১৯৬৭-৭২) ও টারলাক প্রদেশের গভর্নর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন অ্যাকুইনো।
প্রেসিডেন্ট ফার্ডিনান্ড মার্কোসের বিরুদ্ধে বিরোধী জোট করেন তিনি। ফিলিপাইনে মার্শাল ল জারির অল্প দিনের মধ্যে কমিউনিস্ট সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সঙ্গে ১৯৭২ সালে গ্রেপ্তার হন। সাত বছরের সাজা হয়। সামরিক কমিশন তাকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিলেও প্রেসিডেন্ট এই সাজা লঘু করেন।
অ্যাকুইনো গঠিত দল ১৯৭৮ সালের নির্বাচন অংশ নেয়। কিন্তু একটিও আসন পায়নি। হাজতে থাকাকালে ১৯৮০ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। পরে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা নিতে গিয়ে স্বৈরাচারবিরোধী অনেক অনুষ্ঠানে অংশ নেন। প্রাণহানি কিংবা গ্রেপ্তারের আশঙ্কা নিয়েই ১৯৮৩ সালে ১৩ আগস্ট দেশের উদ্দেশে যাত্রা করেন। ম্যানিলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। পরে তার স্ত্রী ও ছেলে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
ইন্দিরা গান্ধী, ৩১ অক্টোবর ১৯৮৪
ইন্ধিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী ছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কন্যা। ভারতের তৃতীয় এবং প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইন্দিরা। তার নেতৃত্বে ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত টানা তিন মেয়াদে ভারত শাসন করে কংগ্রেস। এরপর ১৯৮৪ সালেও আবার প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেন ইন্দিরা।
১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর সকালে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের ভেতরে একটি উদ্যানের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎই পাশে দাঁড়ানো নিরাপত্তাকর্মী বিয়ন্ত সিং রিভলবার বের করে ইন্দিরা গান্ধীর দিকে গুলি চালায়। প্রথম গুলিটা পেটে লেগেছিল। ইন্দিরা ডান হাতটা ওপরে তুলেছিলেন গুলি থেকে বাঁচতে। তখন খুব কাছ থেকেই বিয়ন্ত সিং আরও দুবার গুলি চালায়। সে-দুটো গুলি ইন্দিরার বুকে আর কোমরে লাগে। এরপরই তার কাছ থেকে পাঁচ ফুট দূরে থাকা আরেক নিরাপত্তারক্ষী সতবন্ত সিং নিজের টমসন অটোমেটিক কার্বাইন থেকে ২৫টি গুলি ছুড়ে ইন্দিরা গান্ধীর শরীর ঝাঁঝরা করে দেয়। পরে তাকে চার কিলোমিটার দূরে অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট ফর মেডিকেল সায়েন্স হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষরক্ষা হয়নি। তার যকৃতের ডানদিকের অংশটা গুলিতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। বৃহদান্ত্রের বাইরের অংশটা ফুটো হয়ে যায় এবং ক্ষতি হয় ক্ষুদ্রান্ত্রেরও। ফুসফুসের একদিকে গুলি লেগেছিল আর পাঁজরের হাড় ভেঙে গিয়েছিল গুলির আঘাতে। তবে হৃৎপিণ্ডতে কোনো ক্ষতি হয়নি। ঘটনার প্রায় চার ঘণ্টা পর, দুপুর ২টা ২৩ মিনিটে ইন্দিরা গান্ধীকে মৃত ঘোষণা করেন ডাক্তাররা।
১৯৮৪ সালেই শিখদের পবিত্র তীর্থস্থান স্বর্ণমন্দিরে সেনা অভিযান চালায় ইন্দিরা সরকার। এতে অসংখ্য শিখের মৃত্যুর পাশাপাশি নিখোঁজও হন অনেকে। এ ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই বিয়ন্ত সিং ও সৎবন্ত সিং নামের ওই দুই শিখ দেহরক্ষী ইন্দিরাকে হত্যা করে। বিয়ন্ত সিংহ ঘটনাস্থলেই অন্য দেহরক্ষীদের গুলিতে নিহত হন। সৎবন্ত সিং এবং হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী কেহার সিংকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
রাজীব গান্ধী, ২১ মে ১৯৯১
রাজীব গান্ধী ছিলেন ভারতের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী। তিনি ইন্দিরা গান্ধী ও ফিরোজ গান্ধী দম্পতির জ্যেষ্ঠ পুত্র। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর মায়ের মৃত্যুর পর চল্লিশ বছর বয়সে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। ১৯৮৯ সালের ২ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে পরাজয়ের আগ পর্যন্ত তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনীতিতে আসার আগে তিনি ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের পেশাদার বিমানচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন ইতালীয় বংশোদ্ভূত সোনিয়া মাইনোর সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। পরে সোনিয়াকে বিয়েও করেন তিনি।
১৯৯১ সালের ২১ মে চেন্নাই শহর থেকে ৩০ মাইল দূরে শ্রীপেরামবুদুর শহরে রাজীব গান্ধীর শেষ জনসভাটির আয়োজন করা হয়েছিল। এই জনসভায় তিনি তামিলনাড়–র শ্রীপেরামবুদুর লোকসভা কেন্দ্রের কংগ্রেস প্রার্থী শ্রীমতী মারাগতাম চন্দ্রশেখরের সমর্থনে নির্বাচনী প্রচারে উপস্থিত হয়েছিলেন। এখানেই এলটিটিই জঙ্গি তেনমোজি রাজারতœমের আত্মঘাতী বোমার হামলায় নিহত হন রাজীব। তেনমোজি রাজারতœমের অপর নাম ছিল ধানু। পরবর্তী সময়ে আত্মঘাতী বোমারুর প্রকৃত নাম জানা যায় গায়ত্রী।
হত্যার দুই ঘণ্টা পূর্বে রাজীব চেন্নাই শহরে উপস্থিত হন। একটি সাদা অ্যাম্বাসাডরের কনভয়ে তিনি যাত্রা করেন শ্রীপেরামবুদুরের উদ্দেশে। শ্রীপেরামবুদুরে তিনি গাড়ি থেকে নেমে সভামঞ্চের উদ্দেশে হাঁটতে শুরু করেন। সেখানে তার বক্তৃতাদানের কথা ছিল। এই সময় অনেক শুভাকাক্সক্ষী, কংগ্রেস দলীয় সমর্থক ও স্কুল ছাত্রছাত্রী তাকে মালা পরিয়ে স্বাগত জানাচ্ছিলেন। রাত ১০টা ১০ মিনিটে হত্যাকারী ধানু এগিয়ে গিয়ে রাজীবকে অভিবাদন জানায়। এরপরই রাজীবের পদস্পর্শ করার ভঙ্গিতে পোশাকের নিচে বাঁধা আরডিএক্স ভর্তি বেল্টটি ফাটিয়ে দেন। পরমুহূর্তেই বিস্ফোরণে প্রাণ হারান রাজীবসহ বেশ কয়েকজন।
১৯৮৭ সালে শ্রীলঙ্কায় ভারতীয় শান্তিরক্ষী পাঠানোর ঘটনায় রাজীবের ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে তামিল বিদ্রোহীরা ওই হামলা চালায়।
আইজ্যাক রবিন, ৪ নভেম্বর ১৯৯৫
আইজ্যাক রবিনকে বলা হয়, ইসরায়েলের সবচেয়ে ভদ্র আর নম্র নেতা। ইসরায়েলের এই একমাত্র নেতাই ফিলিস্তিনের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেন। রবিন দু মেয়াদে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। প্রথমবার ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৭ এবং দ্বিতীয়বার ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল। এর আগে ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে তিনি ইসরায়েলি বাহিনীর নেতৃত্ব দেন।
দ্বিতীয় মেয়াদের প্রধানমন্ত্রিত্বকালে ১৯৯৩ সালে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) সঙ্গে অসলো চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির মাধ্যমে মূলত ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। এই চুক্তির কারণে ১৯৯৪ সালে ইয়াসির আরাফাতসহ স্বদেশি সিমন পেরেজের সঙ্গে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান রবিন। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইসরায়েলের রক্ষণশীলরা রবিনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু করে। শেষ পর্যন্ত এই চুক্তি স্বাক্ষরের কারণেই ১৯৯৫ সালের ৪ নভেম্বর ইগল আমির নামে এক উগ্রপন্থি ইহুদি তাকে হত্যা করে। দেশটির এক আদালত ইগল আমিরকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেয়।
রফিক হারিরি, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৫
রফিক হারিরি দুই মেয়াদে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। প্রথম মেয়াদে ১৯৯২ থেকে ৯৮ এবং দ্বিতীয় মেয়াদে ২০০০ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত লেবাননের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। গৃহযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে লেবাননের বাণিজ্য ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নিজের শক্তিশালী প্রভাব বজায় রাখেন হারিরি। এ সময়ে দেশটির উন্নতির রূপকার হিসেবে মনে করা হয় তাকে। ২০০৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারিতে গাড়ি বিস্ফোরণে মৃত্যু হয় তার। এ দুর্ঘটনার জন্য শুরু থেকেই সিরিয়ার শিয়া সরকার ও লেবাননের শিয়া বিদ্রোহী সংগঠন হিজবুল্লাহকে দায়ী করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়নি।
বেনজির ভুট্টো, ২৭ ডিসেম্বর ২০০৭
পাকিস্তানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীই শুধু নন, তিনি মুসলিম বিশ্বে প্রথম নারী হিসেবে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। বহির্বিশ্বে তিনি ‘ডটার অব দ্য ইস্ট’ নামে খ্যাত। ১৯৮৮-৯০ এবং ১৯৯৩-৯৬ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর বড় মেয়ে বেনজির ভুট্টো সামরিক শাসনকবলিত পাকিস্তানে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে নিজের রাজনৈতিক দলের একটি নির্বাচনী র্যালিতে অংশ নিয়েছিলেন ভুট্টো। এক পর্যায়ে বুলেট প্রুফ গাড়ি থেকে সমর্থকদের উদ্দেশে হাত নাড়ার জন্য মাথা বের করেন তিনি। ঠিক সেই সময়ই তাকে উদ্দেশ করে কেউ একজন গুলি ছুড়লে গুরুতর আহত হন ভুট্টো। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে রাওয়াপিন্ডি জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সেখানেই সন্ধ্যা ৬টা ১৬ মিনিটে তার মৃত্যু হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৫ আগস্ট ১৯৭৫
স্বাধীন বাংলাদেশের জনক শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু বলে অভিহিত হন।
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে রাজনীতির সূচনালগ্নে মুজিব ছিলেন ছাত্রনেতা। ক্রমে তিনি আওয়ামী লীগের জাতীয় নেতৃত্বের উচ্চপদে আসীন হন। জনগণের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৬৬ সালে তিনি ‘ছয় দফা’ প্রস্তাব করেন, যাকে পশ্চিম পাকিস্তানে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী পরিকল্পনা হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।
১৯৬৮ সালে তার বিরুদ্ধে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ মামলার বিচার শুরু হলে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ বিপুল বিজয় অর্জন করে। যদিও তাকে সরকার গঠনের সুযোগ দেয়নি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক শ্রেণি।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকা শহরে গণহত্যা শুরু করে এবং বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ তিনি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। পরে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একদল সামরিক কর্মকর্তার হাতে তিনি সপরিবারে নিহত হন। ঘটনার দিন সকালে একদল সেনা কর্মকর্তা ট্যাঙ্ক দিয়ে তার ধানমণ্ডির বাসভবন ঘিরে ফেলে। বঙ্গবন্ধু, তার পরিবার এবং তার ব্যক্তিগত কর্মচারীদের হত্যা করা হয়। কেবল তার দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করায় রক্ষা পান। তাদের বাংলাদেশে ফিরে আসার ব্যাপারেও জারি করা হয় নিষেধাজ্ঞা।
হত্যাকাণ্ডের ৩৫ বছর পর বঙ্গবন্ধুর পাঁচ খুনির ফাঁসি কার্যকর হয়। বিভিন্ন দেশে থাকা বাকি খুনিদের আইনি জটিলতার অবসান ঘটিয়ে এবং কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।