বিদীর্ণ গোপালগঞ্জের আর্তনাদ

ওরহান পামুক ‘হুজুন’ শব্দটা ব্যবহার করেছেন ইস্তাম্বুল শহরকে গ্রাস করে থাকা গাঢ় বিষণ্ণতা বোঝাতে। এ শুধু কোনো ব্যক্তির নিজস্ব দুঃখবোধ নয়, এটা একটা গোটা জাতির সামষ্টিক হতাশা। কোনো এক নিদারুণ ক্ষতি যার উৎস। এই বিষণ্ণতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে- হারানো ঐতিহ্যের জন্য, স্বর্ণালি কোনো অতীতের জন্য স্মৃতিকাতরতা, বর্তমানের কোনো ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে সৃষ্টি হওয়া গভীর হতাশা। একই সঙ্গে এক তীব্র যন্ত্রণার অনুভূতির মাধ্যমে নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণাও। সুফি মতাদর্শে হুজুনকে বর্ণনা করা হয়েছে ঈশ্বরের নৈকট্য লাভে ব্যর্থতার তীব্র যন্ত্রণা হিসেবে। যে যন্ত্রণায় তাড়িত হয়ে মানুষ আরও বেশি ঈশ্বরের নিকটবর্তী হওয়ার চেষ্টা করে। 

এটা আসলে কোনো একক অনুভূতি না, এটা একটা জীবনবোধ। যা বিপর্যস্ত জীবনের বাস্তবতাকে মেনে নিয়েও শেষ পর্যন্ত আশার পথই দেখায়। শাব্দিক অর্থ বিষণ্ণতা হলেও এটা আরও গভীর কোনো আত্মিক বিপর্যয়ের জন্য দীর্ঘস্থায়ী এক শোকগ্রস্ততাকে বোঝায়।

২.

পামুকের লেখায় এই ‘হুজুন’ এর সঙ্গে যখন পরিচয় হলো, পড়তে পড়তেই মনে হলো যে, আমি এই অনুভূতি চিনি। আমি এর দেখা পেয়েছি ১৫ই আগস্ট। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, গোপালগঞ্জে। দিবসটি ঘনিয়ে এলে সবকিছু ঠিকঠাক চলতে থাকলেও, এক অব্যক্ত চাপ যেন চেপে বসত গোটা শহরের ওপরে। ওই নির্দিষ্ট দিনটিতে ঘড়ি-সভ্যতার নিয়মে অফিস-আদালত-স্কুল-কলেজ-বাজার-ব্যবসা-মুদি থেকে টং দোকান এমনকি পথচারীদের দৈনন্দিন জীবনেও এক চলমান স্থবিরতা দেখা যেত। শহরজুড়ে নেমে আসত এক গতিজড়তা। রাস্তাঘাট অন্য দিনগুলোর তুলনায় অনেকটাই ফাঁকা আর ধূসর মনে হতো।

কর্মজীবীরা তাদের কাজের ভেতর, বেকাররা তাদের হা-হুতাশের ভেতর, স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা তাদের গুরুজনের ভয়াল স্মৃতির বিহ্বলতার ভেতর এই দিনটিতে কেমন লুকিয়ে পড়ত সব ফাঁকা করে।

নির্দিষ্ট এই দিনটিতেই শহরে চোখে পড়ত বিশেষ কিছু চরিত্র। যারা বছরব্যাপী কমিউনিটির মধ্যেই বিস্মৃত হয়ে থাকতেন নিজেদের পাগলামি নিয়ে। এদের কেউ হয়তো বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর থেকে ভাত খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন, কেউ মাংস খান না, কেউ কেউ খালি পায়ে হাঁটেন, কেউ সেদিনের পর থেকে আর চুল কাটেন না... ইত্যাদি ইত্যাদি, এই লোকগুলো তাদের অভ্যাসের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদের এক নীরব ভাষা জারি রেখেছেন অনেক দিন ধরে। অন্যদিনের তুলনায় ফাঁকা আর ধূসর রাস্তায় সেদিন বেশি করে চোখে পড়ত আপাতদৃষ্টিতে পাগল এই লোকগুলোকে, যারা আসলে ওই ভয়াল হত্যাকাণ্ডের নীরব প্রতিবাদকারী। হয়তো, অদ্ভুত স্থবিরতা বয়ে চলমান দিনটিতেই অজানা বৈরাগ্য ভরা চায়ের টং দোকান থেকে ওই লোকগুলোকে দেখে সকলের মনে পড়ে যায় দিনটিতে এই জল-জমি-ধূলি ধূসরিত প্রতিবেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। সারা বছর ভুলে থাকা ওই প্রান্তিক নাম না জানা লোকগুলো বিশেষ হয়ে উঠতেন তখন।

এ সবই ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর কুখ্যাত ইনডেমনিটি বিল বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা দায়েরের আগের ঘটনা। ফলে ওই নৃশংস হত্যাযজ্ঞের বিচার আদৌ হবে কি না, হলেও তা নিয়েও সারা দেশের মানুষের মতো সংশয়ের মধ্যে ছিল গোপালগঞ্জবাসীও।

৩.

যে কোনো বার্ষিকী, তা আনন্দেরই হোক কিংবা বেদনার; আমাদের পুরনো ঘটনা আর মানুষের কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রতি বছর যখন তারিখগুলো ঘুরে আসে, আমাদের মনে পড়ে কী ঘটেছিল সেই দিন। আমরা জানি ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ভোরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি বিপথগামী দল বঙ্গবন্ধুর ধানম-ি ৩২-এর বাসভবনে গিয়ে তাকে হত্যা করে। আমরা যা জানি না তা হলো, সেদিন স্তব্ধ হয়ে যাওয়া একটা গোটা জাতির প্রতিটি মানুষের মনের সংক্ষুব্ধতা অথবা হতবিহ্বলতা। যা বয়ে বেড়াতে বেড়াতে ‘হুজুন’ হয়ে ধরা দেয় আমাদের মানসপটে। ইতিহাসের মহানায়ক যেখানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং যেখানে অন্তিম শয়নে শায়িত রয়েছেন সেই গোপালগঞ্জে কী ঘটেছিল সেই ভয়াল ১৫ই আগস্ট, তা জানতে ইচ্ছে করে।

৪.

ওই সময় অর্থাৎ ১৯৭৫ এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট মাথায় রেখেই এ বিষয়ে অনুসন্ধান চালাতে হয়েছে। সারা দেশের মতো গোপালগঞ্জেও তখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলমতের অস্তিত্ব থাকলেও, চলছে বাকশাল গঠনের প্রক্রিয়া। আওয়ামী লীগ ও তার বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন তো বটেই, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও তার নেতাকর্মীরা একীভূত হওয়ার একটি প্রক্রিয়ার ভেতর ছিল তখন। মুজিব হত্যার ৪৪ বছর পর সেখানে সেই দিনটিকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনার খোঁজ করতে গেলে স্বীকার-অস্বীকারের বর্তমান লাভ-লোকসানের রাজনীতি আমাদের কানাগলিতে ফেলে দিতে পারে। তবে বিভিন্ন পক্ষ-বিপক্ষের সঙ্গে কথা বলে এটুকু নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ঘটনায়, ওই দিনই গোপালগঞ্জে প্রতিবাদ হয়েছিল। পরবর্তী সময়েও আরও কয়েকবার শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে স্থানীয়ভাবে ছোট ছোট বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশ, পোস্টারিং, লিফলেটিং হয়েছিল। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তখন ধরপাকড়ের মুখে অধিকাংশই পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন বা আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন, অনেকে ঘটনার আকস্মিকতায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন। মূলত কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের কিছু নেতাকর্মীই এসব প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে গিয়েছিলেন।

৫.

স্থানীয় সাংবাদিক বাপী সাহা বছর দুয়েক আগে বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছিলেন। তিনি জানান, ১৫ই আগস্টের বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে মতান্তর আছে। সেটা কাটাতে কথা বলেছি ওই মিছিলের অন্যতম অংশগ্রহণকারী এবং প্রত্যক্ষদর্শী, আবু হোসেন আর এনায়েত হোসেনের সঙ্গে।

যেটুকু জানা যায়, সেদিন শওকত চৌধুরী, এনায়েত হোসেন, হিরু চৌধুরী, মোক্তারসহ আরও কয়েকজন সম্মিলিতভাবে পোস্ট অফিসের মোড়ে একটি মিছিল করেন। নব্বইয়ের গণআন্দোলনের সময় যেভাবে চার দিক থেকে দুই-চার-আটজন করে এসে মিছিল নিয়ে চলে যেত, সে রকমই একটা ঝটিকা মিছিল হয়েছিল। পরে পৌর পার্ক, এর আশপাশে এবং বঙ্গবন্ধু কলেজের ভেতরেও কয়েকটা প্রতিবাদ হয়েছিল। স্থানীয়ভাবে একটি লিফলেট বের করা হয়েছিল। লিফলেট ড্রাফট করেছিলেন শওকত চৌধুরী। গোপনে একটি প্রেসে সেটি ছাপানো হয়। সেই প্রেসের ম্যানেজার ছিলেন গৌরাঙ্গ মৈত্র। কিছু লিফলেট বিতরণ করা গেলেও বেশিরভাগই পুলিশের হাতে ধরাও পড়ে।

এ বিষয়ে কমিউনিস্ট পার্টির বর্তমান জেলা সভাপতি আবু হোসেন বলেন, ‘সঠিক তারিখ মনে করতে পারছি না, তবে ১৫ই আগস্টের পরপরই সিপিবি, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যরা মিলে আমরা বঙ্গবন্ধু কলেজের শহীদ মিনারে প্রতিবাদ করলাম বঙ্গবন্ধুর ছবিসহ। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ আমাদের ঘিরে ফেলল। ছাত্রদের ব্যারিকেড দিয়ে নিয়ে গেল। আমাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে থানায় নিয়ে এলো। এ ঘটনা শুনে সে সময়কার আওয়ামী লীগ নেতা, গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মরহুম মোহাম্মদ আলী খান আবু মিয়া নিজে থানায় চলে এলেন। ওসি সাহেবকে অনুরোধ করলেন, ওসি সাহেব, এই আন্দোলন করার কথা ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ, কৃষক লীগ। তারা করেনি। আন্দোলন করেছে ছাত্র ইউনিয়ন কমিউনিস্ট পার্টি। এবং এত বড় একটা ন্যায়সংগত আন্দোলন, আপনি এদের ছেড়ে দেন। আমি তখন আবু ভাইকে বললাম, ওসি সাহেব ফরিদপুরের এসপিকে ফোন করে বলেছেন, দাগি আসামি ধরেছি। কিন্তু শওকত চৌধুরীকে ধরতে পারিনি। তাকে ধরলে এখানে আর কোনো আন্দোলন হবে না। তাকে চালান দিয়ে দিতে হবে। আর ছাত্রদের বলল যে তোমাদের মুচলেকা লিখিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে। তারপর ছাত্রদের ছেড়ে দিল, আর আমাকে চালান করে দিল কোর্টে। আবু ভাইয়ের কথা শুনল না। সেখান থেকে পরে জামিন পেলাম।’

আবু হোসেন যে মিছিলের বর্ণনা দিয়েছেন, সেটি প্রথম দিনের ঘটনা নয়। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী মিছিলে শওকত চৌধুরী, এনায়েত হোসেন, মণিলাল বিশ্বাসসহ বলে বেশ কয়েকজন ছিলেন। তবে সবার নাম এখন আর মনে করতে পারেন না আবু হোসেন। তবে তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়ন নেতা ও পরবর্তী জীবনে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগদান করা শওকত চৌধুরীর নেতৃত্বেই বিক্ষোভ সংঘটিত হওয়ার কথা নিশ্চিত করেন তিনি। আরও জানান, বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে গোপালগঞ্জ থেকে ছাপানো লিফলেটের লেখকও ছিলেন শওকত চৌধুরী।

৬.

আবু হোসেনের সঙ্গে কথা বলে আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি ঠিক কবে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে গোপালগঞ্জে প্রতিবাদ হয়েছিল। তাই আমরা যাই তৎকালীন ছাত্রনেতা ও বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক এনায়েত হোসেনের সঙ্গে কথা বলতে-

প্রশ্ন : ১৫ই আগস্টের ঘটনার একটা প্রতিবাদ করেছিলেন আপনারা। সেটা কত তারিখে করেছিলেন?

উত্তর : আমরা তো প্রথম দিনই করেছিলাম। ছোট আকারে। সংগঠিতভাবে বড় করে হয়েছিল পরে। এর আগে আমরা ছোট মিছিল, পোস্টারিং, লিফলেটিং এসব করেছি। কোন ঘটনার কথা জিজ্ঞাসা করছ?

প্রশ্ন : প্রথম দিনেই?

উত্তর : হ্যাঁ প্রথম দিনই হয়েছিল, ১৫ই আগস্ট। প্রথম দিন আমরা তো সবাই ঘটনা জেনে হতভম্ব। সবাই খবর পেয়ে চৌরঙ্গীর দিকে আসছিলাম। পুরো ঘটনা খোঁজখবরের জন্য। পোস্ট অফিসের মোড়ে ছিল হিরু চৌধুরী। সেখানে তো আরও লোকজন জড়ো হয়েছিল, সবাই খোঁজখবর জানতে চাইছিল।

প্রশ্ন : তারপর?

উত্তর : সবাই বলছিল এটা তো হতে পারে না, বঙ্গবন্ধুকে মারতে পারে না। এটা মিথ্যা, গুজব। সে সময় আওয়ামী লীগ নেতা হিরু চৌধুরীকে হুমকি দিয়ে পালিয়ে যেতে বলে একজন চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধী। এতে শওকত চৌধুরী ক্ষেপে গিয়ে সেখানে দাঁড়িয়েই ‘মুজিব হত্যার বিচার চাই’ ‘একাত্তরের দালালেরা হুঁশিয়ার সাবধান’ বলে সেøাগান শুরু করেন। তখন আমরাও সেøাগান দিলাম। আমি ছিলাম, শওকত ভাই, মোক্তার ভাই এরকম আরও কিছু লোকজন ছিল।

প্রশ্ন : স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি যারা, তারা এক হয়ে গেলেন। তখন কোনো আওয়ামী লীগ-সিপিবি ছিল না...?

উত্তর : তখন তো একটা পটভূমি ছিল। তখন তো বাকশাল তৈরি হয়ে গেছে। অলরেডি গোপালগঞ্জে বাকশালের একটা কমিটি ঘোষিত হয়েছে। আমরা এর আগে থেকেই একসঙ্গে কাজ করতাম। মানে বাকশাল হচ্ছে হবে তখন। সে সময় আমরা প্রগতিশীলরা মোটামুটি একসঙ্গেই ছিলাম। তখন তো রাজনৈতিক দলগুলো সব আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। আমরা বাকশালের সঙ্গেই ছিলাম। ছাত্ররা, ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনিয়ন যুক্তভাবেই কাজ করতাম।

প্রশ্ন : প্রথম দিন সেখানে আপনারা কতজন ছিলেন?

উত্তর : আট নয়জন হবে।

প্রশ্ন : এরপরে আপনারা কী করলেন?

উত্তর : এরপর তো সবাই আমরা হতভম্ব হয়েছিলাম। ভাবছিলাম কী করা যায়। আমরা তখন অপেক্ষায় ছিলাম এই হয়তো আমাদের ঢাকা থেকে ডাক দেবে। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীরা আছেন, আর্মি আছে, আর্মিরা তো বিচ্ছিন্নভাবে এটা করেছে, বাকিরা তো আছেন। আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতা সবাই তো আছেন, একটা কিছু ঘটবে। এ অবস্থা থাকবে না। প্রথম তো আমরা গুজব ধরে নিয়েছিলাম, আমরা যখন ইন্ডিয়ার খবর শুনলাম তার আগ পর্যন্ত তো আমরা বিশ্বাসই করছিলাম না। তারপর দেখা গেল যে এক এক করে জিএস প্রধান, সেনাবাহিনীর প্রধান, পুলিশ প্রধান, নৌবাহিনীর প্রধান সব একেকজন শপথ নিচ্ছেন। মানে মোশতাকের পক্ষে সমর্থন দিচ্ছেন। রেডিওতে ভাষণ দিচ্ছেন। তখনো আমরা আশা ছাড়িনি। শুনছিলাম মন্ত্রীরাও শপথ নিচ্ছেন। বিকেলবেলা শুনলাম যে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীদের প্রায় সবাই, দুই তিনজন বাদে। সন্ধ্যাবেলায় টিভিতে দেখা গেল মুজিবকোট পরে সব শপথ নিচ্ছেন।

প্রশ্ন : প্রথম দিনের পর কি আপনারা থেমে গেলেন?

উত্তর : না, বিচ্ছিন্নভাবে পরেও হয়েছে। কথা হচ্ছে, এই প্রতিবাদ তো কোনো সংগঠিত বিষয় ছিল না। লিফলেটিং, পোস্টারিং যে করেছিলাম সেটা খুব সতর্কভাবে। চেইন অফ কমান্ড খুব গোপন ছিল।

প্রশ্ন : আপনারা একটা লিফলেটও তো করেছিলেন?

উত্তর : একটা না। প্রথমে একটা লিফলেট করা হয়েছিল। আরেকটা লিফলেট করেছিলাম পরে। প্রথম যে লিফলেট বিতরণ হয় সেটা ঢাকা থেকে এসেছিল। একটা লিফলেট আর আরেকটা হ্যান্ডলেট, ছোট একটা। ছোট একটা জিনিস, আরেকটা পুরো ঘটনা নিয়ে। ঢাকায় একটা জিনিস ছাপানো হয়েছিল, ‘কাঁদো বাঙালি কাঁদো’ শিরোনামে। আমরা এক কপি পেয়েছিলাম সেটা এখানে অ্যাসোসিয়েট করেছিলাম। ওই যে প্রেসের গৌরাঙ্গ মৈত্র, তাকে জিজ্ঞাসা করলে জানা যাবে। গোপালগঞ্জে মাজরায় আমরা মিটিং করেছিলাম। গোপনে ফরিদপুর জেলার সবাই গিয়েছিলাম। বিভিন্ন জায়গায় গোপনে ছোট ছোট মিটিং হয়েছে। যোগাযোগ হয়েছে। তখন তো মোবাইল ফোন ছিল না। ল্যান্ডফোনও কম লোকই ব্যবহার করত। তার ওপর আবার সব লাইনে আড়ি পাতা হতো। খবর পাওয়ার উপায় ছিল না। ঢাকা থেকে যে পত্রিকা বের হতো সেটাও গোপালগঞ্জে আসত একদিন পরে। তখন তো যোগাযোগের এত মাধ্যম ছিল না।

প্রশ্ন : কেউ কি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন?

উত্তর : শওকত ভাই ধরা পড়েছিলেন, তবে সেটা আরও দুই মাস পরে। মিরাজ ইন্ডিয়ায় পালিয়ে চলে গেল। ও গিয়ে একটা চিঠি লিখেছিল। চিঠিতে লেখা ছিল, কাদের সিদ্দিকীসহ আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী তখন চলে গিয়েছিলেন ইন্ডিয়ায়। গিয়ে এরকম প্রতিবাদ সংগঠিত করার চেষ্টা করেছিলেন। মিরাজ চিঠিতে লিখেছিল শওকত ভাইকে। মিরাজ তো আগেই পালিয়ে চলে যায়, তার সেই চিঠিসহ ধরা পড়েন শওকত চৌধুরী। অথচ তার মাত্র আধাঘণ্টা আগেই আমরা চৌরঙ্গীতে বসে ওই চিঠি নিয়ে আলাপ করছিলাম। সবাই একসংগেই ছিলাম। শওকত ভাই, আমি, মানিক ভাই, কুটি ভাই। আমরা কথা বলে চা-টা খেয়ে যার যার মতো চলে গেছি। আমরা একপথে যেতাম না তো। কেউ নদী দিয়ে যেতাম, কেউ একসঙ্গে চলতাম না। হয়তো ৫/১০ মিনিটের জন্য দেখা হতো। এছাড়া কেউ একসঙ্গে বসতামও না।

৭.

এ বিষয়ে হিরু চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলে এনায়েত হোসেনের উল্লিখিত ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়া, ১৮ আগস্ট আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও একটি বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছিল বলে জানা যায়। আমাদের অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ওই নির্দিষ্ট দিনটির ঘটনা প্রবাহ ছিল অনেকটা এরকম- বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার খবর পাওয়ার পরপরই মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি হিসেবে পরিচিত স্থানীয় আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের কতিপয় নেতাকর্মী ওই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। ১৫ই আগস্ট স্থানীয় পোস্ট অফিস মোড়ে শওকত চৌধুরী, এনায়েত হোসেন, হিরু চৌধুরী, মোক্তারসহ আরও কয়েকজন ঘটনার খোঁজখবর নিতে জড়ো হন। তারাই একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিকভাবে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকবার শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে স্থানীয়ভাবে ছোট ছোট বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশ, পোস্টারিং, লিফলেটিং করেছেন কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তখন ধরপাকড়ের মুখে অধিকাংশই পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন বা আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন, অনেকে ঘটনার আকস্মিকতায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে অক্টোবরে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার সংকল্প ব্যক্ত করে ভারত পালিয়ে যাওয়া ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী মিরাজের চিঠির সূত্র ধরে শওকত চৌধুরী গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত এই প্রতিবাদ-বিক্ষোভ নানাভাবে অব্যাহত ছিল।

৮.

সুফি মতাদর্শে হুজুনকে বর্ণনা করা হয়েছে ঈশ্বরের নৈকট্য লাভে ব্যর্থতার তীব্র যন্ত্রণা হিসেবে। যে যন্ত্রণায় তাড়িত হয়ে মানুষ আরও বেশি ঈশ্বরের নিকটবর্তী হওয়ার চেষ্টা করে। সুফিদের ক্ষেত্রে সেটা ইবাদত বা সাধনা। আর ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে কোনো ঘটনার অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যের সত্যমিথ্যা যাচাই এবং বিভিন্ন তথ্যের তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘটনাসমূহের একটি চিত্র নির্মাণের চেষ্টাকে বলা যেতে পারে ইতিহাস চর্চা। ১৫ই আগস্টকে ঘিরে আমাদের এ ধরনের চর্চার কোনো বিকল্প নেই, কারণ দীর্ঘদিন বিষয়গুলো নিয়ে অনুসন্ধান তো দূরের কথা, আলাপ তোলাই বারণ ছিল। ফলে এই অনুসন্ধান জারি থাকুক ওই দিনটিতে বাংলার প্রতিটি কোনায় কোথায় কীভাবে রক্তক্ষরণ হয়েছিল এবং হয়েছিল বিক্ষোভ-প্রতিবাদ, তা প্রকাশ্যে আসুক।

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন দেশ রূপান্তরের গোপালগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি রাজীব আহমেদ রাজু]