বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনেই সমাধান

গত শুক্রবার রাজধানীর মিরপুরে ‘চলন্তিকা’ বস্তিতে এক অগ্নিকান্ডে অন্তত আট হাজার ঘর ভস্মীভূত হয়েছে।  নিম্ন আয়ের মানুষের ঘনবসতিতে এ অগ্নিকা- স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, বস্তিতে অগ্নিকান্ড ঘটলে কেন যথাসময়ে তা নেভানোর উদ্যোগ সফল হয় না। কেন রাতারাতি হাজারো মানুষকে সহায়-সম্বল হারিয়ে পথে বসতে হয়। ভুক্তভোগীরা অগ্নিকান্ডের বিষয়টিকে ভিন্ন চোখে দেখছেন। বড় ভবন তৈরির জন্য জমি খালি করতেই এই বস্তিতে আগুন লাগানো হয়েছে বলে ভুক্তভোগী ও স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছে।

যে জায়গায় এ বস্তিটি গড়ে উঠেছিল, সেটি মূলত জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষের জায়গা। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩ সালে রূপনগর থানার পেছনের ওই ঝিলের ২০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। তখন স্থানীয়রা এই নিচু জমিতে ময়লা ফেলতে শুরু করে। এতে ঝিলটি ভরে যায়। এর ওপর কাঠের পাটাতন দিয়ে বস্তিঘর গড়ে উঠতে শুরু করে। ২০০০ সালে পুরো জমি বস্তিতে ভরে যায়। ওই বস্তির নিয়ন্ত্রণ বরাবরই ছিল ক্ষমতাসীন স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের হাতে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে এই নিয়ন্ত্রণ পাল্টে যেত।  এই নেতাকর্মীরা বস্তিতে মাদক ব্যবসা থেকে শুরু করে অবৈধ গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল। বস্তিকে কেন্দ্র করে জমে উঠেছিল তাদের রমরমা বাণিজ্য।

গ্রাম থেকে জীবিকার সন্ধানে শহরে আসার পর নি¤œবিত্ত মানুষের ঠিকানা বস্তিগুলো। গৃহকর্মী, পোশাকশ্রমিক, রিকশাচালকসহ দিনমজুরশ্রেণির লোকজনই বস্তির বাসিন্দা। শহরবাসী মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার জরুরি প্রয়োজন মেটান এই নিম্নবর্গের মানুষেরা। ফলে, শহরে এ মানুষদের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা জরুরি। শহর শুধু উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্তের বসবাসের জন্য নয়। শহরের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এবং নিরাপত্তা পাওয়ার দাবিদার নিম্নবিত্তরাও। কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতায় তারা ন্যূনতম অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএসের সর্বশেষ বস্তিশুমারি ২০১৪ অনুযায়ী, সারা দেশে বস্তি রয়েছে ১৩ হাজার ৯৩৫টি। এর মধ্যে সিটি করপোরেশন এলাকায় বস্তির সংখ্যা ৯ হাজার ১১৩। সিটি করপোরেশন এলাকার বস্তিগুলোর মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে রয়েছে ৩ হাজার ৩৯৪টি। চট্টগ্রামে এ সংখ্যা ২ হাজার ২১৬। এসব বস্তিবাসীর অধিকাংশই কোনো-না-কোনোভাবে নগর অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছেন।  এসব বস্তির বাসিন্দাদের ১৩ দশমিক ১৮ শতাংশ পোশাকশ্রমিক হিসেবে কর্মরত। ৬ দশমিক ৯২ শতাংশ রিকশা/ভ্যান চালনা ও ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ ছোট ব্যবসা পরিচালনা করেন। ৬ দশমিক ৪১ শতাংশ গৃহপরিচারিকা, ৫ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ দিনমজুর ও ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ নির্মাণশ্রমিকের কাজ করেন।

এসব বস্তিবাসী মানুষের যে ধরনের নিরাপত্তা এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ নানা পরিষেবা পাওয়ার যে নৈতিক অধিকার রয়েছে তা থেকে তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বঞ্চিত। তার ওপর থাকে উচ্ছেদের ভয় ও আতঙ্ক।   অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এসব বস্তিতে রহস্যজনকভাবে অগ্নিকান্ডের মতো ঘটনা ঘটে। যার পরিণতিতে সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসতে হয় নিম্নবিত্ত এই মানুষগুলোকে। অভিযোগ ওঠে, বস্তির জমি দখল করার জন্যই এসব অগ্নিকান্ড পূর্বপরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩-২০১৮ পর্যন্ত শুধু রাজধানীর বস্তিগুলোতেই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ১৭৮টি। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ১৭ জন। এর মধ্যে ২০১৪ সালে রাজধানীর মিরপুরে জেনেভা ক্যাম্পে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটে। আগুনে পুড়ে প্রাণ হারায় ক্যাম্পের ১০ জন। ২০১৭ সালের ১৬ মার্চ রাজধানীর গুলশান ও বনানী এলাকার সীমারেখায় অবস্থিত কড়াইল বস্তিতে গভীর রাতে আগুন লাগে। কেরোসিনের চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়। একইভাবে অনুদঘাটিত রয়ে গেছে বস্তিটিতে সংঘটিত আগের অগ্নিকাণ্ডগুলোর কারণও। বস্তির সংখ্যা ঢাকায় বেশি হলেও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা চট্টগ্রামে বেশি। ২০১৩-১৭ সালে এখানকার

বস্তিগুলোয় আগুন লেগেছে মোট ৮৭২ বার। এসব অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি না ঘটলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বিপুল। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও রংপুরের বস্তিগুলোয় ২০১৩-২০১৮ পর্যন্ত অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে ১৪৬টি।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ সত্য হলে বস্তিতে অগ্নিকান্ডের ঘটনাগুলো ভীষণ উদ্বেগের এবং জননিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। জোর করে দখলের মাধ্যমে বস্তি উচ্ছেদ কখনো প্রকৃত সমাধান হতে পারে না। আবার, বিভিন্ন অসদুপায় যেমন অগ্নিকান্ডের মতো ঘটনা ঘটিয়ে উচ্ছেদও কাম্য নয়। কেননা এসব

বস্তিতে যে নিম্নবিত্ত মানুষেরা বাস করে থাকে তারা শহর তথা দেশের অর্থনীতির বড় ধরনের চালিকাশক্তি। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বস্তির জমি অধিগ্রহণ করা প্রয়োজন হতে পারে। সেক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বস্তিবাসীদের সরিয়ে নেওয়া এবং উপযুক্ত পুনর্বাসনই প্রকৃত সমাধান। সরকার ও সংশ্লিষ্টদের এ ব্যাপারে আন্তরিক ও তৎপর হতে হবে।