বাংলাদেশকে ‘পরাশক্তি’ দেখতে চান ডমিঙ্গো

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নতুন কোচ খোঁজের শুরুটা হয়েছিল অনেককে ধরে। সেই তালিকায় সবাই হাই প্রোফাইল কোচ। সেখানে রাসেল ডমিঙ্গোর নামটা অনেক পরে ছিল। বিসিবির পছন্দের তালিকায় ছিলেন অ্যান্ডি ও গ্রান্ট ফ্লাওয়ার, মাইক হেসন, পল ফারব্রেস। এছাড়া চন্দিকা হাথুরুসিংহের ফিরে আসাও বাতাসে ভাসছিল। এমনকি শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান থেকে বিতাড়িত মিকি আর্থারও বিসিবির রাডারে ঢুকে যান। এই সবার সঙ্গে ডমিঙ্গোর পার্থক্যটা ইচ্ছায়, একনিষ্ঠতায়। সেখানেই হেভিওয়েটদের টপকে বাংলাদেশের কোচের দায়িত্বটা পেয়ে গেলেন তিনি।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা খুব স্পষ্টভাবে দেখাতে পেরেছিলেন ডমিঙ্গো। সাক্ষাৎকার দিতে নিজে এসেছিলেন বিসিবিতে। আর এই ছোট্ট সাক্ষাৎকার পর্বে বিসিবি পরিচালকদের মন জিতে নিয়েছেন ৪৪ বছর বয়সী এই প্রোটিয়া। বিসিবি যখন সত্যি-সত্যি তাকে নিয়ে ভাবছে তখনো হেসন বাংলাদেশের কোচ হওয়ার দৌড়ে ছিলেন। কিন্তু টাইগার ক্রিকেটের প্রতি ডমিঙ্গোর ভালোবাসা ও আগ্রহ সরিয়ে দিয়েছে বাকিদের। ৯ দিনের মাথায় সংবাদ সম্মেলন করে ডমিঙ্গোর আনুষ্ঠানিক নিয়োগের ঘোষণা দেন বিসিবিপ্রধান নাজমুল হাসান পাপন। সেখানে দুই বছরের প্রাথমিক চুক্তির প্রতিটি দিন কোনো ছুটি ছাড়া বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়ে নতুন কোচের কাজ করার ইচ্ছার কথা জানান বিসিবিপ্রধান।

ডমিঙ্গোর পেশাদারত্ব মনে দাগ কেটে যায় বিসিবি পরিচালকদের। এছাড়া নিজের কাজ নিয়ে ডমিঙ্গোর প্রেজেন্টেশনও খুব আকৃষ্ট করেছে সবাইকে। এতটাই যে, সংবাদ সম্মেলনে বারবারই নতুন কোচের পেশাদারত্ব কাজ করার ইচ্ছার বিষয়টি তুলছিলেন পাপন। ইএসপিএনক্রিকইনফোর সঙ্গে আলাপচারিতায় বিসিবিকে দেওয়া প্রেজেন্টেশনের কিছুটা তুলে ধরেছেন ডমিঙ্গো। যেখানে জাতীয় দলের পাশাপাশি বয়সভিত্তিক দলগুলোকে নিয়ে কাজের কথা বলেছেন তিনি। হাসিমুখে শুরু করেন এভাবে, ‘আমার কোন জিনিসটা তাদের (বিসিবি) সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে তা না হয় বিসিবির কর্মকর্তাদেরই জিজ্ঞেস করে নিন। এমনিতে আমার মনে হয় আমার বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা ওদের ভালো লেগেছে। আমি অনূর্ধ্ব-১৫ থেকে শুরু করে জাতীয় দল মানে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত কোচিং করিয়েছি। তাই বলব সব পর্যায়ের ক্রিকেটারদের সঙ্গে মেশার অভিজ্ঞতা আছে আমার। জাতীয় দল অবশ্যই আপনার মূল লক্ষ্য থাকবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু জাতীয় দলের নিচে কী হচ্ছে সেদিকেও আপনাকে লক্ষ রাখতে হবে। মূলত সেখান থেকেই তো ক্রিকেটার উঠে আসে। আমি তাদের বুঝিয়েছি যে, তরুণ ক্রিকেটার তুলে আনার ব্যাপারে আমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারি, যা ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট কার্যকর হবে।’

তরুণদের নিয়ে কাজ করার খুব ভালো অভিজ্ঞতা আছে ডমিঙ্গোর। দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেটের সঙ্গে দুই দশকের সম্পর্কে তার শুরুটাই হয়েছিল ইস্টার্ন প্রোভিন্সের যুব দলের সঙ্গে। তরুণ ও প্রতিভাবানদের তৈরির ব্যাপারে ডমিঙ্গো জানান, ‘বাংলাদেশ দলে খুব ভালো গ্রুপ আছে। কিন্তু তরুণ ক্রিকেটার প্রস্তুত রাখা সবসময়ই ভালো। এতে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের ওপর কিছুটা চাপ থাকে। এর মাধ্যমে ওদের কাছ থেকে সেরা ক্রিকেট সবসময়ই পাবেন। আবার তরুণদের মাঝে মাঝে সুযোগ দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেকোনো সময় পা রাখার জন্য প্রস্তুতও রাখতে পারবেন। আমি জেনেছি যে, বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল ইংল্যান্ডে ওদের যুব দলকে চারবার হারিয়েছে এবং ভারতের সঙ্গেও জিতেছে। এর মানে বাংলাদেশের পাইপলাইনে সত্যিই কিছু ভালো ক্রিকেটার আছে। আমার কাজ হবে ইমার্জিং দলের কোচ ও অনূর্ধ্ব-১৯ দলের কোচদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা। এতে কোন কোন তরুণ জাতীয় দলে পা রাখার মতো তা জানতে পারব।’

২০১৯ বিশ্বকাপটা প্রত্যাশা মতো কাটেনি বাংলাদেশের। এরপর শ্রীলঙ্কা সফরটাও গেছে বাজে। ডমিঙ্গো অবশ্য বিশ্বকাপ নিয়েও আগ্রহ দেখালেন। শ্রীলঙ্কা সফরের ব্যর্থতা নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। কারণ হিসেবে জানেন, বিশ্বকাপের মতো একটি টুর্নামেন্টে প্রত্যাশা পূরণ না হলে পরের সিরিজেই ভালো করা কঠিন। দক্ষিণ আফ্রিকার কোচ থাকাকালীন ২০১৫ বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা টেনে ডমিঙ্গো জানান, ‘এই রকম পরিস্থিতিতে জাতীয় দলের কোচ হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা আছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১৫ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে হারের দিন আমি মাঠে ছিলাম। এই রকম অবস্থা থেকে উঠে আসা সত্যিই কঠিন। যদি এরপরই আরেকটি সিরিজ থাকে তবে কখনই ওই সিরিজে মনোযোগ দেওয়া যায় না। তাই আমি শ্রীলঙ্কা সিরিজটি নিয়ে ভাবছি না। আমি বড় টুর্নামেন্টের ব্যর্থতা কীভাবে কাটিয়ে উঠতে হয় তা নিয়ে কাজ করব। আমাদের অবশ্যই এই টুর্নামেন্টের ভুলগুলো নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।’

একজন জাতীয় দলের কোচ হিসেবে তার কাছে কী আশা থাকতে পারে সেসব ভালোই জানা আছে ডমিঙ্গোর। অভিজ্ঞতার কারণেই জানেন এই পর্যায়ে ব্যর্থতা কত বড় ধাক্কা হয়ে আসতে পারে, ‘একটি পেশাদার দলের সব দায়িত্ব একজন কোচের। সেটা আমি জানি। একটি-দুটি ম্যাচ হারলেই আপনাকে প্রবল চাপ নিতে হবে। এটাই পেশাদারত্ব। সব খেলাতেই এমন হয়। আপনাকে এর মোকাবিলা করা শিখতে হবে। দক্ষিণ আফ্রিকার কোচ হিসেবেও একই পরিস্থিতি এসেছিল আমার ওপর। আমি এই চাপ কাটিয়ে সাফল্য আনার জন্য প্রস্তুত।’

বিশ্ব ক্রিকেটে সত্যিকারের পরাশক্তি হয়ে উঠতে সবকিছু ঠিকঠাকই আছে বলে মনে করি। আর এ কারণেই বাংলাদেশকে নিয়ে আমি রোমাঞ্চিত বলেছেন ডমিঙ্গো।