৯ বছরেও মেলেনি বিশুদ্ধ পানি

নগরবাসীকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০১১ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে রাজশাহী ওয়াসা। তখন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের পানি শাখা আলাদা হয়ে যুক্ত হয় ওয়াসার সঙ্গে। এর আগে ১৯৮৮ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে সিটি করপোরেশনই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নগরবাসীকে পানি সরবরাহ করে আসত। কিন্তু যাত্রার শুরুতেই বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ওয়াসা, আজও তার বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। প্রতিষ্ঠার পর গত বছরগুলোতে ওয়াসা কর্র্তৃপক্ষ নগরীর বিভিন্ন স্থানের পাইপ সংস্কার এবং কর্মপরিধির এলাকা বিস্তারসহ কিছু কার্যক্রম হাতে নিলেও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারেনি। রাজশাহী শহরে ওয়াসার সরবরাহ করা পানিতে অতিমাত্রায় আয়রন নিয়ে বেকায়দায় সাধারণ মানুষ। একই সঙ্গে রয়েছে অতিমাত্রায় ম্যাঙ্গানিজ ও হার্ডনেস (খরতা)। এতে যেমন বিভিন্ন রোগবালাই ছড়াচ্ছে, তেমনি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বাসাবাড়ির বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী। পাইপলাইনে সরবরাহ করা ওয়াসার পানিতে গোসল করলে চুল হয়ে যাচ্ছে আঠালো। কদিন ব্যবহার করলেই যেকোনো পাত্রের রং হয়ে যাচ্ছে লালচে। অথচ বাধ্য হয়ে এই পানিই ব্যবহার করতে হচ্ছে নগরবাসীকে। শহরের বিপুলসংখ্যক মানুষ এই পানিই পান করছেন।

রাজশাহী ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে দৈনিক পানির চাহিদা ১১ কোটি ৩৩ লাখ লিটার। এর বিপরীতে এখন সরবরাহ করা হচ্ছে সাড়ে ৯ কোটি লিটার। এর মধ্যে ৯৩ দশমিক ৬৮ শতাংশই মিলছে ভূগর্ভ থেকে। ১০৩টি গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি তুলে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হচ্ছে। আর বাকি ৬ শতাংশ পানির জোগান আসছে পদ্মা নদী থেকে। নদীর পানি শোধনের পর তা সরবরাহ করা হয় পাইপলাইনে। নগরীতে পানির গ্রাহকসংখ্যা ৪২ হাজার ৬৮০ জন। পানি সরবরাহের জন্য পাইপলাইন নেটওয়ার্ক রয়েছে ৭১২ কিলোমিটার। বর্তমানে নগরীর ৮৪ ভাগ এলাকায় পানি সরবরাহ করতে পারছে ওয়াসা। বাকি ১৬ ভাগ এলাকায় এখনো পানির পাইপলাইন বসানো হয়নি।

পানি সরবরাহের পরিমাণ নিয়ে রাজশাহীর মানুষের তেমন ক্ষোভ বা অভিযোগ না থাকলেও এর মান নিয়ে প্রশ্ন অধিকাংশেরই। নগরীর বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাসাবাড়িতে ওয়াসার সরবরাহ করা পানি সাধারণত রান্না, গোসল ও কাপড় ধোয়াসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করেন তারা। বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা না পেয়ে হস্তচালিত নলকূপের পানিকেই খাবারের জন্য বেছে নিয়েছেন। অনেকেই আবার সাব-মারসিবল পাম্প বসিয়েছেন পান করার পানি সংগ্রহের জন্য। তবে নগরীর হোটেল-রেস্টুরেন্টে ওয়াসার পানিই ভরসা। এ পানিতেই ধোয়া-মোছা, এই পানিই পান করা। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বিশুদ্ধ নয় জেনেও বাধ্য হয়ে প্রতিদিনই হাজার হাজার মানুষ ওয়াসার পানিই পান করছেন। আর নিম্ন আয়ের মানুষ ওয়াসার সরবরাহ করা পানি পান করছেন সবখানেই।

নগরীর ছোট বনগ্রাম এলাকার সেলিনা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পানিতে আয়রন বেশি থাকায় কাপড়চোপড় ভালোভাবে পরিষ্কার করা যায় না। এক-দুই ধোয়া দিলেই নতুন কাপড় নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া বাথরুমের টাইলস, বেসিন ও পানি সরবরাহের পাইপসহ অন্যান্য সামগ্রী পরিষ্কার রাখা যায় না। সেগুলোতে আয়রন জমে লালচে দাগ পড়ে যায়। বাধ্য হয়ে কিছুদিন পরপরই এসব সামগ্রী বদলাতে হচ্ছে।’

এই প্রতিবেদক রাজশাহী ওয়াসা থেকে তাদের সরবরাহ করা পানির মান পরীক্ষা সংক্রান্ত বেশকিছু নথিপত্র সংগ্রহ করেছেন। তাতে দেখা যায়, এখানকার পানিতে আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ ও হার্ডনেসের (খরতা) মাত্রা অনেক বেশি। বাংলাদেশের পানিতে হার্ডনেসের স্বাভাবিক মাত্রা ধরা হয় ৩৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ মিলিগ্রাম। রাজশাহীর জন্য এর স্বাভাবিক মাত্রা ৩৫০। তবে রাজশাহী ওয়াসার প্রতি লিটার পানিতে সর্বোচ্চ হার্ডনেস মিলেছে ৩৫০ থেকে ৫০০ মিলিগ্রাম। প্রতি লিটারে আয়রনের স্বাভাবিক মাত্রা ০.৩ থেকে ১.০ মিলিগ্রাম। কিন্তু এখানে সর্বোচ্চ পাওয়া গেছে ৪.৬০ মিলিগ্রাম। অন্যদিকে প্রতি লিটার পানিতে ০.১ মিলিগ্রাম ম্যাঙ্গানিজের উপস্থিতিকে স্বাভাবিক ধরা হলেও রাজশাহী ওয়াসার পানিতে এর মাত্রা রয়েছে ২.১৬ মিলিগ্রাম। অতিমাত্রায় আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ ও হার্ডনেসযুক্ত পানি পানের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ মাহবুবুর রহমান খান বাদশা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই পানি ব্যবহারে চুল আঠালো ও পড়ে যাওয়াসহ কিছু শারীরিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। এছাড়া এই পানি পান করলে কোষ্ঠকাঠিন্য ও ক্ষুধামন্দাসহ কিছু সমস্যা হওয়ারও আশঙ্কা থাকে।’

তবে ওয়াসা কর্র্তৃপক্ষ বলছে, ভূগর্ভস্থ পানির এই মাত্রা কমানোর কোনো উপায় নেই। সমস্যা নিরসনে নদীর পানি শোধনের জন্য প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

রাজশাহী ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পারভেজ মামুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে পানির কার্যক্রম ওয়াসার হাতে আসার পর বেশকিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখানে আগে লোহার পাইপ বসানো ছিল, সিমেন্টের পাইপ ছিল। সেগুলো পরিবর্তন করে এখন প্লাস্টিকের পাইপ বসানো হয়েছে। নতুন করে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন বসানো হয়েছে। এছাড়া যেসব জায়গায় ড্রেনের ভেতর দিয়ে পাইপলাইন ছিল সেগুলো পরিবর্তন করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পদ্মা নদী থেকে পানি উত্তোলনের পর শোধন করে তা পাইপলাইনে সরবরাহ করার একটি বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে পানিতে আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ ও হার্ডনেসের যে উপস্থিতি তা স্বাভাবিক হয়ে যাবে। গোদাগাড়ীতে এই প্রকল্পের জন্য তিনটি এলাকায় ৫৩ একর জমি অধিগ্রহণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।’