কৌটাটা তখনো হাতেই ধরা

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ছিল শনিবার, বিকেল ৫টা ২২ মিনিট। ভোরের কাগজের রিপোর্টিং নোট প্যাডের শেষের দিকে সময়টা লিখে কলমটাসহ লেখা বন্ধ করে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর যেখানে সমাবেশের ট্রাক সেদিকে তাকিয়ে আছি। ট্রাকের কাছ থেকে আমার দূরত্ব ৩-৪ গজ হবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাসহ সিনিয়র নেতারা ট্রাক থেকে নামবেন এবং মিছিল শুরু হবে। অফিস থেকে বলা হয়েছে, মিছিলটা আমি ফলো করব।

ভোরের কাগজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ইখতিয়ার উদ্দিন বিকেল ৩টায় দায়িত্ব ভাগ করে বলেছেন, তুমি মহিলা আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকবে। তাহলে শেখ হাসিনার বক্তৃতাটা ভালো করে শুনতে পারবে। মহাসমাবেশের পুরো নিউজ তিনিই লিখবেন আর আমি ও কয়েকজন তাকে সহযোগিতা করব। দুপুর আড়াইটার আগেই আমি প্রেস ক্লাব থেকে বিভিন্ন কাগজের কয়েকজন সহকর্মীসহ সমাবেশের দিকে যেতে থাকি। তিল ধারণের ঠাঁই নেই। কোনো রকমে এগোচ্ছি। ৩টার কিছু আগে ট্রাকের পাশে এসে দাঁড়ালাম। ইখতিয়ার ভাই ফোন করে বলছিলেন, এত ভিড়। তুমি মঞ্চের (ট্রাকের) উল্টোদিকে যেখানে আইভী আপারা আছেন সেখানে যেতে পারলে ভালো। শেখ হাসিনার বক্তৃতাটা নোট নিও। আমি সব দেখছি। সাবধানে থেকো।

কয়েকজন নেতার বক্তব্যের পর আওয়ামী লীগ সভাপতি বক্তব্য শুরু করলেন। তার পাশে আওয়ামী লীগের সে সময়ের সিনিয়র নেতারা দাঁড়ানো। ট্রাকে ভোরের কাগজের আলোকচিত্রী মামুন আবেদীন। শেখ হাসিনার হাতে একটা ছোট কাগজ। মাঝে মাঝে সেটি থেকে তিনি বক্তব্য দিচ্ছেন। লোকে লোকারণ্য। মুহুর্মুহু হাততালি। সিলেটে বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত আনোয়ার চৌধুরীর (বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত) ও তার কয়েক দিন পর সিলেটে আওয়ামী লীগ নেতার ওপর পৃথক দুটি গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদেই ২১ আগস্ট সন্ত্রাসবিরোধী মহাসমাবেশ ডেকেছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু কে জানত ওই মহাসমাবেশকে ঘিরেই প্রস্তুতি নিয়েছিল ইতিহাস বদলে দেওয়ার। আরও এক ১৫ আগস্টের জন্ম দিতে চেয়েছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের প্রাণ নিয়ে। সমাবেশ ছিল জনসমুদ্রের, দুপুর ১২টা থেকেই খন্ড খন্ড মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা সমাবেশস্থলের আশপাশে জমায়েত হয়েছেন।

সংবাদকর্মী হিসেবে এত বড় সমাবেশ কাভার করা আমার জন্য খুব আনন্দের। তাই আমার প্রস্তুতিটাও ছিল। দুপুর ১টা থেকেই পল্টন এলাকায়। নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলছি। ট্রাকের দিকে তাকিয়ে আছি। সাদা-কালোর কম্বিনেশনের একটা শাড়ি পরে শেখ হাসিনা বক্তব্য দিচ্ছেন। লাখো মানুষের নিঃশ্বাসও যেন পড়ছে না। পিনপতন নীরবতা নিয়ে মানুষ শুনছে। গ্রেনেড হামলার তীব্র প্রতিবাদ, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে সমাবেশে আসা মানুষ। মাঝে মাঝে স্লোগান। এক অন্যরকম পরিবেশ।

আমি খুব চেষ্টা করছি মহিলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি আইভী রহমানের নেতৃত্বে জড়ো হওয়া নারীদের পাশে যেতে। কারণ বক্তব্য শেষে শেখ হাসিনা ট্রাক থেকে নামবেন। ট্রাক থেকে একটু দূরে শেখ হাসিনাকে বহনকারী গাড়িটি। ওই গাড়িতে করে তিনি মিছিলের নেতৃত্ব দেবেনÑ এমনটাই আমরা জানি। আর তার পাশে নারী নেত্রীরা থাকবেন। আমার হতাশা, কেন ভিড় ঠেলে যেতে পারছি না। এত ভিড়ে মিছিলের ধারেকাছেও যেতে পারব না! এদিকে শেখ হাসিনা বক্তব্য শেষ করলেন। ট্রাক থেকে নামার জন্য কিছুটা সামনে আসছেন। তখন একটু হুড়মুড় অবস্থা। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান হচ্ছে। ঠিক এই সময় ট্রাকের ওপর থেকে এক আলোকচিত্রী বললেন, আপা একটু দাঁড়ান, আমরা কটা ছবি তুলব। এরপর আর কোনো কিছুই কানে আসেনি। আমারও আইভী আপার পাশে যাওয়া হলো না। এর আগে মিরপুরের নেত্রী ও কমিশনার শাহিদা তারেক দীপ্তি হাত ইশারায় আমাকে ডাকলেন।

তখনই মনে হলো বিকট শব্দে কেঁপে উঠেছে পৃথিবী। আমি যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলাম। মনে হলো মাটি থেকে আমি কয়েক ফুট উপরে উঠে গেছি। প্রথমবারের শব্দের পর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আরও শব্দ। চারদিকে ছোটাছুটি। ট্রাকে তাকালাম, দেখলাম ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ হানিফ, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী মায়া, সাবের হোসেন চৌধুরীসহ আওয়ামী লীগ নেতারা মানবঢাল তৈরি করেছেন। আমার মনে হলো এক মিনিটের মধ্যে  একদল লোক কাউকে শূন্যে তুলে একটা গাড়ি হবে (এখন মনে হচ্ছে), বসিয়ে দিল। একটা গাড়ির হালকা শব্দ। তারপর চারদিক থেকে গুলিবর্ষণ। বৃষ্টির মতো চারদিক থেকে গুলি। খুনিরা যেন দূরবীণ লাগিয়ে দেখছিল, তাদের লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। তাই শেখ হাসিনার গাড়ি লক্ষ করে গুলি করেছিল। সেই গুলি আশপাশে ভবনের কাঁচের গ্লাস ভেদ করেছে। আর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে তখন চিৎকার, কালো ধোঁয়া। পা বন্ধ হয়ে আসছিল। আলোচিত্রী জিয়াকে মনে হলো দেখলাম। মুহূর্তে এলাকা কালো আর অন্ধকার হয়ে গেল। বাবাগো, মাগো বাঁচাও, মরে গেলাম চিৎকারের মধ্যেই আমার ফোনে রিং হলো। আমার পক্ষে ধরা সম্ভব হলো না। আমিও চিৎকার করে উঠলাম, হাত ভেজা। রাস্তায় দেখি রক্ত আর জুতা। মনে হলো অনেক লাশ। ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে থাকতে দেখেছি মানুষের দেহ। মনে হলো পুরো দেশ লাশে ছেয়ে গেছে। মানুষ ছোটাছুটি করছে।

হঠাৎ তাকিয়ে দেখি, আইভী আপার পা গলে পড়ছে। যেভাবে পুকুরে বা স্বচ্ছ পানিতে ছায়া পড়তে থাকলে কেউ যদি হঠাৎ পানিটা নেড়ে দেয়, তেমনি পা টলে আইভী আপা পড়ে যাচ্ছেন। নেতাকর্মীরা তাকে ধরে তোলার চেষ্টা করছে। হাঁটু থেকে শুধুই রক্ত।

আমি হতভম্ব। কোনদিকে যাব? জনসমুদ্র মুহূর্তে আমার কাছে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হলো। হাঁটতে পারছি না। মনে হচ্ছে সবই রক্ত, পা আটকে যাচ্ছে। আমার ফোন বেজেই চলেছে। মনে হলো, রাস্তার পাশে রেলিং এ আদা চাচা বসে আছেন। তার মাথা থেকে রক্ত ঝরছে। কী করব, কোথায় যাব, কোনো কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না। তারপর দেখি বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পুলিশ নেমে গেছে। তারাও এলোপাতাড়ি মানুষ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

সমাবেশ কাভার করে আসার জন্য আমাদের জন্য বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে সিএনজি অটোরিকশা রাখা ছিল। আহত হয়ে পড়ে আছে অনেকে। কারও হাত পড়ে আছে, কারও পা। মাথা ছিন্নভিন্ন। চলার শক্তি নেই। বামপাশে তাকিয়ে দেখি, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সুরঞ্জিত  সেনগুপ্তসহ কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছেন। সুরঞ্জিতদার মাথা দিয়ে রক্ত পড়ছে। আর কে বা কারা একটা পিকআপ ভ্যানে লাশ তুলছে। আধ ঘণ্টার মধ্যেই অনেকেই এসেছেন। যে যার মতো করে আহতদের তুলে নিয়ে যাচ্ছেন হাসপাতালে। রিপোর্টার জাহাঙ্গীর আলমসহ আমরা কয়েকজন জানার চেষ্টা করছি শেখ হাসিনার কী হলো?

আমি আদা চাচার কাছে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম হাতে ধরে আছে শুকনো আদার কৌটাটা। আগেই আদা চাচার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আসতেন মাঝে মাঝে। বঙ্গবন্ধু তাকে ¯েœহ করতেন। সেই সময় সব সভা সমাবেশে আদা চাচা পুঁটলিতে শুকনো আদা নিয়ে যেতেন। বঙ্গবন্ধু বক্তব্যের আগে তার কাছ থেকে আদা চেয়ে নিতেন। এরপর শেখ হাসিনা দেশে আসার পরও তিনি একই কাজ করতেন। ২১ আগস্টের সমাবেশের দুদিন আগে আদা চাচা শেখ হাসিনার জন্য নিজ হাতে আদা ছিলে ধুয়ে শুকিয়ে নিয়েছেন। তিনি ভেবেছিলেন, সমাবেশ শেষে শেখ হাসিনা গাড়িতে উঠতে নিলে তিনি সেই কৌটাটা প্রিয় নেত্রীকে দেবেন। আদা চাচার মেয়ে ওইদিন রাতে ঢাকা মেডিকেলে এই বলে কাঁদছিলেন।

আদা চাচাকে ধরে একটা ভ্যানে তুলে দেওয়া হলো। পাশেই দেখি রফিকুল। তিনিও বঙ্গবন্ধুর ভক্ত ছিলেন। তিনি ও দুই যুবক মাটিতে পড়ে আছে। পাশ কেটে যাওয়ার সময় মনে হলো গোঙ্গরাচ্ছেন। দেখি তারা বেঁচে আছেন। অফিসের সিএনজিতে দুইজনের সহযোগিতা নিয়ে তাদের ঢাকা মেডিকেলে পাঠালাম। মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশে কেউ বোধ হয় আর বেঁচে নেই। মৃত্যুস্তূপে দাঁড়িয়ে আছি। একঘন্টা পর কালো ধোয়া কাটলো। রাস্তায় শুধু রক্ত আর জুতা। মেয়েদের ব্যাগ, ক্লিপ পড়ে আছে। ট্রাকের পাশে একটা গ্রেনেড তখনও পড়েই ছিল। মনে হলো, এই গ্রেনেডটা বিস্ফোরিত হলে শেখ হাসিনাসহ কেউই বাঁচত না।

সাড়ে ৬টায় অফিসে এলাম। আমি কিছুই লিখিনি। টেলিভিশনে দেখছিলাম। ততক্ষণে দেশ বিদেশ ছড়িয়ে পড়েছে। চারদিক থেকে টেলিফোন। ভাবতে পারছি না বেঁচে আছি। অফিসের কাজ শেষ করে রাত সাড়ে ৮টায় আবারও গেলাম বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে। দেখি ধোয়া মোছা চলছে। ঢুকতে দেওয়া হয়নি ওই এলাকায় আমাদের। চলে গেলাম ঢাকা মেডিকেল। আহত মানুষের আর্তনাদ। পরদিন মর্গে। লাশ পড়ে আছে। অবহেলায়। এরপর প্রায় দেড়মাস ঘুমাতে পারিনি। চোখ বন্ধ করলেই বিকট শব্দ আর লাশ, জুতার ছবি ভেসে উঠেছে। কানে বেজেছে এলোমেলো গুলির শব্দ।