সাকিবদের আস্থা অর্জনই ডমিঙ্গোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ

সকাল ৬টায় ঘুম থেকে উঠেছেন। ৮টায় মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ক্যাম্পের খেলোয়াড়দের সঙ্গে তার দেখা হবে। প্রধান কোচের দায়িত্ব বুঝে নেবেন। সকালের জরুরি কাজগুলো সেরে হাতে ঘণ্টা দেড়েক সময় রেখে রওনা দিলেন রাসেল ডমিঙ্গো। এরপর প্রথম চমক। ২০ মিনিটেই স্টেডিয়ামে পৌঁছে গেলেন! সাড়ে ১০টায় প্রেস কনফারেন্স। প্রথমবার ঢাকায়। জনাকীর্ণ সম্মেলন কক্ষে পৌঁছে আরেক ধাক্কায় মুখ থেকে অস্ফুট স্বরে বের হয়ে আসে, ‘এত মানুষ!’

ক্রিকেটের জন্য বাংলাদেশের এই আবেগই নাকি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ৪৪ বছরের ডমিঙ্গোকে টেনে এনেছে

 

 

 

 

এই ভিন্ন সংস্কৃতিতে, ভিন্ন এক চ্যালেঞ্জ নিতে। ‘এটা সম্ভবত বাংলাদেশে আমার সপ্তম সফর। ২০০৪ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ উপলক্ষে প্রথম এসেছিলাম।’ এরপরই টানলেন বাংলাদেশ দলের প্রধান কোচ হতে তার প্রবল আগ্রহী হয়ে ওঠার পেছনের বিষয়টা, ‘আমাকে সবসময় টেনেছে এই যে সামনে যারা আছেন তারা। দক্ষিণ আফ্রিকায় খেলার একটা সংবাদ সম্মেলনে সাকুল্যে ৮-৯ জন মানুষ পাবেন। এত রিপোর্টার আমি আমার জীবনে দেখিনি। (মঙ্গলবার) বিমানবন্দরে শ’খানেক ক্যামেরা দেখলাম। দলের জন্য এই প্যাশনই আমাকে বিশ্বের এই অংশে টেনে এনেছে।’

কিন্তু মানুষ চায় সাফল্য। যেটা ওয়ানডেতে বেশ মিলছিল। বিশ্বকাপে গিয়ে গোত্তা খেল দল। সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিমের পারফরম্যান্স অনেক কিছু ঢেকে দিলেও বাংলাদেশ যে একটা দল হয়ে খেলতে পারেনি তা প্রমাণিত। এরপর শ্রীলঙ্কায়ও তাই, ওয়ানডে সিরিজে ৩-০তে হার। ভেঙেচুরে যাওয়া এমন দলকে একটা দলে পরিণত করাই প্রথম এবং সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নয় ডমিঙ্গোর জন্য?

‘শ্রীলঙ্কায় হেরেছে বলে আমি এটাকে বাজে দল বলতে রাজি নই। বিশ্বকাপ থেকে ফিরে আবার সোজা আরেক সফরে যাওয়া সবসময় কঠিন। লাসিথ (মালিঙ্গা), (নুয়ান) কুলাসেকারা বিদায় নিচ্ছিল বলে শ্রীলঙ্কা দলের আরও বেশি কিছু অর্জনের ছিল’Ñ যুক্তি দিয়ে বিশ্বকাপের প্রসঙ্গে পা রাখেন ডমিঙ্গো, যেন অভিভাবক তার দায়িত্বে থাকা সবাইকে প্রবল স্নেহ ও দায়িত্বে আগলে নিতে চাইলেন প্রথম সুযোগেইÑ ‘বিশ্বকাপে আমার মনে হয় তারা ভালো খেলেছে। হেরে যাওয়া কয়েকটা ম্যাচ জেতার কাছাকাছি ছিল তারা।’ ডমিঙ্গো ব্যাখ্যা দিয়ে মাশরাফীর দলকে কাছে টানেনÑ ‘ভেবে দেখুন, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষের ম্যাচটা হয়তো একটা রান আউটের মাশুল। ওদের হার-জিতের ব্যবধান খুব কাছাকাছি। সুতরাং, আমার চোখে এই দলটা আসলে বিশ্ব ক্রিকেটের সত্যিকারের শক্তি হওয়ার পথে। নির্দিষ্ট দিনে ঠিক সময়ে যদি ঠিক সিদ্ধান্তটা নিতে পারে তাহলে দলটা এখনকার চেয়ে অনেক এগিয়ে যাবে।’

কিন্তু বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ১০ দলের মধ্যে অষ্টম। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তানের বিপক্ষে হার চোখে লেগেছিল। ৪৪ বছরের অর্ধেকটা সময় ক্রিকেট শেখানোর দায়িত্ব পালন করা ডমিঙ্গো তবু নিরুত্তাপ ও শান্ত থেকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলে যান, ‘তালিকা বলছে বাংলাদেশ সপ্তম (অষ্টম আসলে) হিসেবে শেষ করেছে। আমার চোখে তারা এর চেয়ে ভালো। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আমার যথেষ্ট সময় কেটেছে এটা বোঝার জন্য যে, ফলাফল কখনো কখনো ভিন্ন সিদ্ধান্তে উপনীত করতে পারে। তাই দল হিসেবে আপনি আসলে কোথায় আছেন তা ওটা দিয়ে নির্ণয় করতে চাইলে ন্যায্য হয় না। বিশ্বকাপে এমন অনেক ইতিবাচক ব্যাপার ছিল যার ওপর ভর করে সামনে এগোনো যায়। এমন অনেক জায়গা আছে উন্নতির। কিন্তু বিশ্বকাপে অনেক ইতিবাচক ব্যাপারও আছে।’

দু’বছরের চুক্তিতে বাংলাদেশে। সংবাদ সম্মেলনে পাশেই ছিলেন স্বদেশি চার্লস ল্যাঙ্গাভেল্ট, ফাস্ট বোলিং কোচ। নিল ম্যাকেঞ্জি আগে থেকেই ব্যাটিং কোচ হিসেবে আছেন এদেশে। রায়ান কুক ফিল্ডিং কোচ। কোচিং টিমে দক্ষিণ আফ্রিকান কোয়ার্টেট। ডমিঙ্গোর জন্য স্বস্তির। কিন্তু ভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের মানিয়ে নেওয়ার দায়, ক্রিকেটারদের নয়। স্পষ্ট করেই বললেন তা ডমিঙ্গো, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেট আমাদের সঙ্গে মানিয়ে নেবে এটা আমরা আশা করতে পারি না। আমাদেরই মানিয়ে নিতে হবে। এই ক্রিকেট সংস্থা ও ক্রিকেটারদের সঙ্গে যায় এমন একটি প্রক্রিয়া আমাদের বের করতে হবে।’

সঙ্গে স্পষ্ট উচ্চারণ, ‘আমার প্রথম লক্ষ্য হলো আগামী এক-দুই সপ্তাহে খেলোয়াড়দের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা, তাদের বোঝা, ওদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা। খেলোয়াড়দের বিশ্বাস অর্জনই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দেখি খেলোয়াড়রা সেটা কীভাবে নেয়।’

ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অনূর্ধ্ব-১৫ থেকে সব পর্যায়ে বিচরণের অভিজ্ঞতা ডমিঙ্গোর। ‘ফিডার সিস্টেম’কে তাই গুরুত্ব দেন খুব, ‘ওখান থেকেই আপনার পরের পর্যায়ের খেলোয়াড় উঠে আসে। জাতীয় দলের পাশে ওদের ওপর চোখ রাখার ব্যাপারে জোর দিতে চাই আর সময় এলে সেটা গ্রহণ করে তাদের খেলানোর সুযোগ নিতে হবে আমাকে।’ কোচ নিজেও বাংলাদেশ ক্রিকেটের একজন নির্বাচক বলে সেটা পাবেন আরও বেশি।

৫ সেপ্টেম্বর থেকে আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্ট বাংলাদেশের। তারপর আফগানিস্তান-জিম্বাবুয়েকে নিয়ে ত্রিদেশীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজ। এরপর ‘এ’ দলের সঙ্গে শ্রীলঙ্কা সফরের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন প্রধান কোচ। এইচপি দলের সঙ্গেও সমন্বয় করবেন।

টেস্ট ডমিঙ্গোর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরম্যাট। সেই টেস্টই কি না বাংলাদেশ খেলেছে ৬ মাস আগে! ‘বেশি বেশি টেস্ট না খেললে ছন্দে থাকা কঠিন’ ডমিঙ্গো বলছিলেন, ‘টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে একটা দল টেস্ট খেলার দিকে বেশি নজর দিতে পারবে। আমরা জানি যে বাংলাদেশ এক বা দুই টেস্টের সিরিজ খেলে। আশা করি এবার তারা তিন বা চার টেস্টের সিরিজ খেলবে। এটা তাদের ওই ফরম্যাটে অভ্যস্ত করে তুলবে। বিশ্বকাপ ও ৫০ ওভারের ফরম্যাট থেকে এখন ওদিকে চোখ রাখা জরুরি। সামনের ক’মাসে আমরা লাল বলের দিকে বেশি নজর দিতে পারব।’

টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপকে সত্যিকারের শক্তিশালী দল হয়ে ওঠার মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরে ডমিঙ্গো তার কথার ইতি টানেন, ‘এটা বাংলাদেশের জন্য টেস্ট ম্যাচ ক্রিকেটে নিয়মিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিরাট সুযোগ। এই ফরম্যাট যত বেশি খেলবেন তত ভালো হয়ে উঠবেন। সম্ভবত এখানেই বাংলাদেশের অভাব, তারা বেশি টেস্ট খেলে না। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের খেলা টেস্টের সংখ্যা বিচার করলেই বুঝবেন কেন তারা এই সংস্করণে এতটা শক্তিশালী।’