নদীতে চলে যাচ্ছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের শেষটুকুও

চাঁদপুরে আশ্রয়ণ প্রকল্পে এসেও আশ্রয় মিলছে না হতদরিদ্র মানুষদের। আশ্রয়হারা মানুষদের জন্য সরকারের গড়ে তোলা আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলো নদীভাঙনের ফলে আজ হুমকির মুখে। প্রমত্তা পদ্মা-মেঘনা নদীর ভাঙনে বিলীন হচ্ছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের একের পর এক বসতঘর। নদীভাঙনের কবলে পড়ে ভিটেহারা হতদরিদ্ররা আবারও আশ্রয়হারা হওয়ার পথে। নিজেদের শেষ আশ্রয়টুকু হারানোর ভয়ে এসব পরিবারের সদস্যরা এখন চোখেমুখে দেখছে অন্ধকার। চাঁদপুর সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নে অবস্থিত ‘পদ্মা-মেঘনা নদী’বেষ্টিত আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় এ দৃশ্য দেখা যায়।

প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীভাঙনে অনেক বসতঘর বিলীন হয়ে গেছে। যেসব পরিবারের বসতঘর বিলীন হয়েছে, তাদের প্রকল্প এলাকার অন্য বসতঘরে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। ভাঙনের ভয়াবহতা অব্যাহত থাকায় ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে পরিবারগুলো।

নদীভাঙন ঝুঁকিতে থাকা আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ হরিনা আশ্রয়ণ প্রকল্প, হরিনা সম্প্রসারণ আশ্রয়ণ প্রকল্প, পদ্মা আশ্রয়ণ প্রকল্প, পদ্মা সম্প্রসারণ আশ্রয়ণ প্রকল্প, ইলশেপাড় আশ্রয়ণ প্রকল্প, গোক্ষুরদী আশ্রয়ণ প্রকল্প ও গোক্ষুরদী সম্প্রসারণ আশ্রয়ণ প্রকল্প।

লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আলমগীর হোসেন জানান, নদীর চরাঞ্চলে গড়ে তোলা সাতটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৩৫টি ব্যারাকে ৬৭৫টি পরিবারকে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু প্রমত্তা পদ্মা-মেঘনা নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বসতঘরগুলো। এভাবে নদীভাঙন অব্যাহত থাকলে পুরো আশ্রয়ণ প্রকল্প নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা বলেন, নদীভাঙনের কবলে পড়ে আমরা গৃহহারা হয়েছিলাম। সরকার আমাদের মাথা গোঁজার ঠিকানা করে দিলেও নদী আমাদের তাড়া করেই বেড়াচ্ছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পে এসেও আমরা আশ্রয়হীন হয়ে পড়ছি। এখানে বসবাস করতে আমরা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। কখন যেন ঘরসহ নদীতে তলিয়ে যাই আমার এই ভয়ে রাতে ঘুম আসে না। আমাদের এই আশ্রয়ণ প্রকল্পে নদীভাঙন প্রতিরোধে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তা না হলে আমাদের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়স্থলটুকুও আর রইবে না।

চাঁদপুর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম দেওয়ান বলেন, ভাঙন এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আশ্রয়ণ প্রকল্পের অন্য ঘরে আশ্রয় দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পে নদীভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহায়তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাময়িকভাবে ভাঙন প্রতিরোধে ইতোমধ্যে সেখানে কিছু বালিভর্তি বস্তা ফেলা হয়েছে।

তিনি জানান, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে নদীভাংতি ও অসহায় পরিবারের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পের নামে বসতঘর দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। ওই সময় চাঁদপুরের লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের হরিনা মৌজায় পদ্মা-মেঘনা নদীর চরাঞ্চলে সাতটি আশ্রয়ণ প্রকল্প গড়ে তোলা হয়।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা সোহরাব হোসেন ও বিল্লাল হোসেন হাওলাদার বলেন, বিভিন্ন সময়ে নদীভাঙনের কারণে আমরা ঘরবাড়ি হারিয়েছি। এরপর আমরা সরকারের দেওয়া এই আশ্রয়ণ প্রকল্পে এসে আশ্রয় পেয়েছি। কিন্তু নদী কিছুতেই আমাদের পিছু ছাড়ছে না। ইতোমধ্যে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ২৫টি ব্যারাকের ৬০টি পরিবার থাকার বসতঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। অন্যসব ব্যারাকে বসবাসরত পরিবারেরও দিন কাটছে অনিশ্চয়তায়। গত এক মাস যাবত এই এলাকায় নদী ভাঙছে। প্রতিদিন কোনো না কোনো বসতঘর নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আমাদের একটাই দাবি গৃহহারা আমাদের এই পরিবারের শেষ আশ্রয়টুকু বাঁচাতে কর্র্তৃপক্ষ যেন দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কানিজ ফাতেমা বলেন, নদীভাঙনরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নদীভাঙনে কোনো পরিবার যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে ব্যাপারে নজর রাখা হচ্ছে। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।