সব প্রস্তুতিই ছিল যায়নি একজনও

সব ধরনের প্রস্তুতির পরও শেষ মুহূর্তে স্থগিত হয়ে গেছে বহুল প্রত্যাশিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নয়াপাড়া-২৬ নম্বর ক্যাম্পে কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন স্থগিত ঘোষণা করেন। তবে হতাশ না হয়ে এই চলমান প্রক্রিয়াটি অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

এবারের দফায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য বৃহস্পতিবার দিনক্ষণ ঠিক করা হয়েছিল। এ জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নয়াপাড়া শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্প, কেরণতলী ট্রানজিট ক্যাম্প ও নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুমধুম ট্রানজিট ক্যাম্পসহ সব ধরনের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়। প্রস্তুত রাখা হয়েছিল বাস, ট্রাক ও অন্যান্য সব সুবিধা। নেওয়া হয়েছিল সব ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থাও।

বাংলাদেশের ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার সীমান্তে রোহিঙ্গাদের অভ্যর্থনা জানাতে সে দেশের কেন্দ্রীয় ও রাখাইন প্রাদেশিক মন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। তাদের সঙ্গে ছিলেন জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা, উন্নয়ন সংস্থা, রেড ক্রিসেন্টসহ আরও অনেক সংস্থার প্রতিনিধি।

বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত ২৯০ রোহিঙ্গার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে জানিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম জানান, ‘সাক্ষাৎকার দেওয়া রোহিঙ্গাদের কেউই মিয়ানমারে যাবে না বলে জানিয়েছে। যাদের আজ ২২ আগস্ট স্বদেশে ফেরত যাওয়ার কথা ছিল। তবে আমরা এই চলমান প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখব।’

তিনি জানান, ‘মিয়ানমার সরকারের দেওয়া ছাড়পত্র অনুযায়ী ১ হাজার ৩৭টি পরিবারের মোট ৩ হাজার ৫৪০ জনকে ফেরত নেওয়ার প্রথম তালিকাটি দেওয়া হয়েছে। আমরা সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। সব ধরনের প্রস্তুতি ছিল আমাদের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রত্যাবাসন হয়নি।

এদিকে রোহিঙ্গাদের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের ফিরে না যাওয়ার বিষয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের ব্যাখ্যা দিয়েছেন টেকনাফ উপজেলার শালবাগান ২৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চেয়ারম্যান বজলুর ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমাদের নাগরিকত্বসহ দাবিকৃত ৫টি শর্ত না মানলে কিছুতেই মিয়ানমার ফিরব না। আগে রাখাইনে বন্দি রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিয়ে মুক্তি দিতে হবে। আমরা মিয়ানমার সরকারকে বিশ্বাস করি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা রাখাইনে ফিরতে চাই, তবে ফিরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো সেখানে সৃষ্টি হয়নি। মিয়ানমার সরকার এখনো মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর নানাভাবে নির্যাতন করছে। এ অবস্থায় রাখাইনে যাওয়া মানে পুনরায় বিপদ ডেকে আনা।’

এদিকে কয়েকটি এনজিওর বিরুদ্ধে ক্যাম্পগুলোতে বিচ্ছিন্নভাবে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে না ফেরার ব্যাপারে ইন্ধন জোগানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের পদক্ষেপ ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তাচৌকিতে হামলার ঘটনার পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নিপীড়নের মুখে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। তাদের সঙ্গে রয়েছে ১৯৮২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত নানা অজুহাতে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া আরও অন্তত সাড়ে তিন লাখ রোহিঙ্গা। সব মিলে বাংলাদেশে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে এই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়। একই বছরের ৬ জুন নেপিদোতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যেও সমঝোতা চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, গত বছরের ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। তবে আবারও হামলার মুখে পড়ার আশঙ্কায় রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরতে অস্বীকৃতি জানানোয় ব্যর্থ হয় ওই উদ্যোগ।

সর্বশেষ চলতি বছরের জুলাই মাসে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে নতুন করে উদ্যোগের অংশ হিসেবে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদল। ১৫ সদস্যের দলটি দুই দিন ধরে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলোচনা ও বৈঠক করে। এসব বৈঠকে রোহিঙ্গাদের তরফে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব ও চলাফেরায় স্বাধীনতার দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয়। সেই ধারাবাহিকতা গতকাল রোহিঙ্গাদের একটি দল মিয়ানমারে ফেরার কথা ছিল।