উপমহাদেশের বাম রাজনীতির অন্যতম পুরোধা, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ আর নেই। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর এ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সন্ধ্যা ৭টা ৪৯ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৯৮ বছর। গুরুতর অসুস্থ হওয়ায় গত কয়েক দিন ধরে ওই হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন প্রবীণ এই রাজনীতিক। তার মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। গভীর শোক জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ন্যাপের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মো.
ইসমাইল হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, ঠাণ্ডা লেগে বুকে কফ জমে যাওয়া এবং ব্যাকবোনে ব্যথা শুরু হওয়ায় গত ১৩ আগস্ট অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে এ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বার্ধক্যজনিত অন্যান্য রোগ তো ছিলই। একপর্যায়ে ক্রমেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। গত সোমবার (১৯ আগস্ট) তাকে আইসিইউতে রাখেন চিকিৎসকরা। এই কয়েক দিনে তার অবস্থা ছিল সঙ্কটাপূর্ণ। গতকাল সন্ধ্যায় চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে বাম ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনীতিতে তিনি একজন কিংবদন্তিতুল্য। নিজেকে তিনি সবসময় ‘কুঁড়েঘরের মোজাফফর’ বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন। কুঁড়েঘর ন্যাপের দলীয় প্রতীক। ’৫০-এর দশকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে পুরোদস্তুর রাজনীতিক হওয়া অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের ছিল প্রায় আট দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম কুশীলব বলা হতো তাকে। একজন নির্লোভ, নিরহঙ্কারী ও সব শ্রেণির মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পুরোটাই ঢেলে দিয়েছিলেন তিনি সাধারণ ও মেহনতি মানুষের কল্যাণে।
১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লার দেবীদ্বারের এলাহাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মোজাফফর আহমদ। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী মোজাফফর আহমদ রাজনীতি ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৫৪ সালে অধ্যাপনা ছেড়ে রাজনীতিতে যুক্ত হন। মুক্তিযুদ্ধে অবদান স্বরূপ সরকার ২০১৫ সালে তাকে স্বাধীনতা পদকের জন্য মনোনীত করলেও তিনি সবিনয়ে তা ফিরিয়ে দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বারিধারায় মেয়ে আইভি আহমদ ও জামাতা সৈয়দ খালেদুজ্জামানের বাসায় জীবনযাপন করছিলেন তিনি। তার স্ত্রী বেগম আমিনা আহমেদ ন্যাপের কার্যকরী সভাপতি।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের পর বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতা শেষে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ১৯৫২ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। তবে এর আগেই তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু, সেটি ১৯৩৭ সাল। ভাষা আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তিনি।
১৯৫৪ সালে অধ্যাপনা ছেড়ে রাজনীতির সঙ্গে পুরোপুরি গাঁটছড়া বাঁধেন মোজাফফর আহমদ। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে দেবীদ্বার আসন থেকে নির্বাচন করে মুসলিম লীগের শিক্ষামন্ত্রীকে পরাজিত করে রাজনীতিতে আলোচনায় আসেন তিনি। ১৯৫৭ সালের এপ্রিলে পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।
১৯৫৮ সালে তৎকালীন সামরিক শাসক আইয়ুব খানের আমলে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। এমনকি তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়। এরপর আত্মগোপনে চলে যান মোজাফফর আহমদ। তবে, আত্মগোপনে থেকেই তিনি আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে নিজেকে সক্রিয় রাখেন।
প্রায় আট বছর আত্মগোপনে থাকার পর ১৯৬৬ সালে ফের প্রকাশ্য রাজনীতি শুরু করেন তিনি। ১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত হন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। ১৯৬৯ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন তিনিও এ আন্দোলনে নিজেকে সক্রিয় রাখেন। একপর্যায়ে তাকে কারাগারেও যেতে হয়।
একাত্তরে মুক্তি সংগ্রামে যে কয়েকজন মানুষ মূল নেতৃত্ব ও অগ্রভাগে ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ছিলেন তাদের একজন। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এ সময় তিনি বিভিন্ন দেশের সমর্থনলাভের চেষ্টায় ছিলেন তৎপর। এ সময় তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ন্যাপ, সিপিবি ও ছাত্র ইউনিয়নের সমন্বয়ে প্রায় ১৯ হাজার মুক্তিযোদ্ধা তৈরিতে মোজাফফর আহমদের ভূমিকা ছিল অসামান্য। ১৯৭৯ সালে তিনি ন্যাপের হয়ে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালে ন্যাপ, সিপিবি ও প্রগতিশীল ঘরানার রাজনৈতিক শক্তির প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ’৮০-এর দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়ও তাকে কারাগারে যেতে হয়।