আর্চার ক্রিকেটের গোপন ছাত্র : জর্ডান

জোফরা আর্চার ও ক্রিস জর্ডান গল্পটা দুই বন্ধুর। দুজনেরই জন্ম বার্বাডোজে। যদিও জোফরার ৬ বছর আগে জন্ম জর্ডানের। কিন্তু দুজনের আগ্রহের বিষয়বস্তুও একÑ ক্রিকেট। ছেলেবেলা থেকে ক্রিকেট নিয়ে পড়ে থাকা দুই বন্ধু এক সময় পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে। খেলতে খেলতে দলও এক হয়ে যায় তাদের। ২০১৬ থেকে ইংলিশ কাউন্টি দল সাসেক্সে খেলেন আর্চার। আর তিন বছর আগে থেকে এই ক্লাবের সদস্য জর্ডান। দুজনে এখন একসঙ্গে একই ফ্ল্যাটে থাকেন সাসেক্সের হোভে। চলমান অ্যাশেজের প্রথম টেস্টে ডাক পাননি আর্চার। কিন্তু জানতেন দ্বিতীয় ম্যাচ দিয়ে টেস্ট অভিষেক হবে। তাই হোভে জর্ডানের সোফায় বসে এজবাস্টন টেস্ট দেখার সময় নিজের বোলিং কৌশল ঠিক করছিলেন আর্চার। এক সাক্ষাৎকারে বন্ধুর ব্যাপারে নানা বিষয় তুলে আনেন ক্রিস জর্ডান।

আর্চার ও জর্ডান একে অন্যের এতই ভালো বন্ধু যে নিজেরা নিজেদের ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করেন। তবে এই আর্চারের জন্যই জর্ডানের ইংল্যান্ড জাতীয় দলের ক্যারিয়ার হুমকির মুখে। আর্চার দলে সুযোগ পাওয়ায় বিশ্বকাপ স্বপ্ন কাটা পড়ে তার। একই কারণে অ্যাশেজ দলেও সুযোগ পাননি। তবুও এতটুকু আক্ষেপ নেই জর্ডানের। একই বাড়িতে একসঙ্গে থেকে আগের মতোই হাসিঠাট্টায় মাতেন দুজন। এজবাস্টন টেস্টের দিনগুলোতেও একসঙ্গে ছিলেন তারা।

ইংল্যান্ডের নতুন সেনসেশন আর্চার যে একদম ক্রিকেটপাগল তা ওই সময়ের কিছু উদাহরণ টেনে পরিষ্কার করে দিলেন জর্ডান, ‘আপনারা কেউ হয়তো এ বিষয়টি জানেন না। ও কিন্তু ক্রিকেটের গোপন ছাত্র। ধরুন, সে ঘরে আছে এবং টেলিভিশনে যেকোনো একটি ক্রিকেট ম্যাচ চলছে। নিজের সোফায় হোক বা আমারটিতে সে ওই ম্যাচ পুরোটা দেখবে এবং নিজে নিজে অনেক বিষয় বিশ্লেষণ করে শিখবে। এজবাস্টন টেস্টের পুরোটাই সে ঘরে বসে দেখেছে। কোন ব্যাটসম্যানকে কীভাবে আউট করবে তার নীলনকশা তৈরি করছিল নিজের মাথায়। ওই টেস্টে সবচেয়ে ভালো করা স্মিথকে কীভাবে ফেরানো যায় তা ভাবছিল সে। আইপিএলে জোফরা ও স্মিথ একই দলে খেলে (রাজস্থান রয়্যালস)। নেটে স্মিথকে বল করেছে সে। এজবাস্টনে স্মিথের ব্যাটিং দেখে সে আইপিএলের অনুশীলনে স্মিথের কী ভুল হয়েছিল সেগুলো মনে করতে শুরু করে। সেসব ধরে সে স্মিথকে ফেরানোর পরিকল্পনা নেয়।’

সপ্তাহ খানেক পর লর্ডসে ঠিকই স্মিথকে দারুণ কাবু করে ফেলেন আর্চার। উইকেট পাননি কিন্তু দুর্ধর্ষ বাউন্সারের আঘাতে স্মিথকে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে এই সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার যা ক্ষতি করার তা করে দিয়েছেন। স্মিথকে তার ক্যারিয়ারের অন্যতম কঠিন স্পেলের অভিজ্ঞতা দিয়ে দেন আর্চার।

এক ম্যাচ আগে আর্চারের সঙ্গে বসে অ্যাশেজ উপভোগ করেছেন জর্ডান। এক ম্যাচ পর জর্ডানকে একা ঘরে আর্চারের বোলিং উপভোগ করতে হলো টিভিতে। এবার আর্চারের ভূমিকা পালন করতে হলো তাকে। জানালেন, প্রতি বলের পর বুঝতে পারছিলেন এবার সে কোন ডেলিভারি ছাড়বে। আঘাত পাওয়ার আগে স্মিথ যখন আর্চারকে চার মেরেছিলেন তখনই জর্ডান বুঝে যান এবার পেস সীমা ছাড়াবে। ‘স্মিথ কভার ড্রাইভ করে আর্চারকে চার মারল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম এবার সে ৮৭-৮৮ থেকে বলের গতি ৯০-এ তুলবে। সেটাই হলো। আর্চার মার খাওয়া পছন্দ করে না। যখনই এমন কিছু হয় তখন সে অতিরিক্ত গতি তোলে। আর্চার যদি উইকেট নাও পায় সে দলের জন্য নিয়ন্ত্রিত বোলিং করে। আরেকটি বিষয় ওর সম্পর্কে বলতে পারি, খেয়াল করবেন প্রতি স্পেলে সে আগেরটির চেয়ে বেশি গতি তুলতে পারে।’

এই গতির জন্য সমালোচিত হতে হয়েছে আর্চারকে। তার বলে স্মিথ আঘাত পাওয়ার পর দৌড়ে অজি ব্যাটসম্যানের সামনে যেতে দেখা যায়নি আর্চারকে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল সমালোচনার ঝড় উঠেছে। জর্ডান অবশ্য বন্ধুর পক্ষে থেকেই কথা বললেন, ‘আপনি যদি ৫ মিনিট আর্চারের সঙ্গে কথা বলেন তবেই বুঝবেন যে সে কতটা শান্ত মনের। সে কখনই ইচ্ছে করে কাউকে আঘাত করার কথা ভাবে না। ড্রেসিংরুমে সে খুব মজা করে এবং ভিডিও গেম খেলতে ভীষণ পছন্দ করে। আমরা সবাই জানি বাউন্সারে ব্যাটসম্যানদের আঘাত পাওয়াটা ক্রিকেটের অংশ। আর্চার হয়তো স্মিথের উইকেট না পেয়ে ওই সময় বিমর্ষ ছিল।’

বার্বাডোজের প্রথম শ্রেণির একটি ক্রিকেট ম্যাচে প্রথমবার আর্চারকে দেখেছিলেন জর্ডান। এ সময় উইন্ডিজের অন্যতম সেরা উদীয়মান ব্যাটসম্যান শেই হোপ সেদিন ছিলেন জর্ডানের দলে। আর্চারের ব্যাপারে তাকে সতর্ক করেছিলেন হোপ। বলেছিলেন, ‘মাত্র ১৬ বছরের একটি ছেলে আছে ওই দলে। ছোট রানআপ নিলেও তার গতি খুব বেশি। ওকে সাবধানে খেল।’ সত্যিই সেই থেকে আর্চারকে সাবধানেই খেলতে হয় ব্যাটসম্যানদের।

এরপর প্রতিপক্ষ থেকে বন্ধু হয়ে যাওয়া আর্চারের আত্মবিশ্বাস যে দিন দিন বেড়েছে তাও জানালেন জর্ডান। তাই বিশ্বকাপ ফাইনালের দিন তার বিশ্বাস ছিল ইংল্যান্ডকে আর্চারই জেতাবেন। জর্ডান তার বিশ্বাসটা এভাবে তুলে ধরলেন, ‘বিশ্বকাপ ফাইনালে মূল ম্যাচের শেষদিকে ওকে যখন নামতে দেখি আমি নির্ভার ছিলাম যে ইংল্যান্ড শিরোপা জিতবে। কারণ কেউই আর্চারের ব্যাটিং এখনো দেখেনি। কিন্তু সে যখন ব্যর্থ হলো এবং সুপার ওভারে তার হাতে বল উঠল তখন দ্বিতীয়বারের মতো আশ্বস্ত হলাম যে আমরা জিতব। কারণ জানতাম, আর্চার ব্যাট হাতে পারেনি; বল হাতে অবশ্যই সে কিছু করবে। তার আত্মবিশ্বাস কিন্তু অনেক উঁচুতে।’

নিজের ক্রিকেট ক্যারিয়ারকে অনেক বিস্তৃত করতে চেয়েছিলেন আর্চার। তাই বার্বাডোজের পাসপোর্ট করেননি। করেছেন ইংল্যান্ডের। জর্ডানের বিশ্বাস, ইংল্যান্ডের হয়ে লম্বা ক্যারিয়ার হবে আর্চারের।