মিটারের আওতায় আসবে সব গ্রাহক

চাহিদার তুলনায় মজুদ কম থাকায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি হওয়া শুরু হলেও সাহসাই বাসাবাড়িতে নতুন করে গ্যাস সংযোগ দেবে না সরকার। উচ্চমূল্যে আমদানি করা এ গ্যাস সংযোগে অগ্রাধিকার পাবে রপ্তানিমুখী ও আমদানি বিকল্প শিল্পখাত। গ্যাস বরাদ্দের অগ্রাধিকারের তালিকায় সবার তলানিতে থাকছে গৃহস্থালি। ভবিষ্যতে বাসাবাড়িতে চুলাভিত্তিক গ্যাসের দর নির্ধারণের বর্তমান প্রথা থেকে সরে গিয়ে মিটারের আওতায় আনা হবে সব ব্যবহারকারীকে। অর্থাৎ গৃহস্থালি কাজে চুলার সংখ্যা যা-ই হোক, বেশি গ্যাস পোড়ালে বাড়তি বিল গুনতে হবে।

এসব বিধান রেখে ‘প্রাকৃতিক গ্যাস বরাদ্দ নীতিমালা-২০১৯’-এর খসড়া করেছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। খসড়াটি চূড়ান্ত করতে আগামী ৯ সেপ্টেম্বর বিভাগের সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমের সভাপতিত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা ডাকা হয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, প্রথম খসড়া তৈরির পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের মতামত নেওয়ার পর সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করে দ্বিতীয় খসড়া তৈরি করা হয়েছে। ৯ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে চূড়ান্ত হওয়ার পর এটি জারি করা হবে।

প্রস্তাবিত নীতিমালার দ্বিতীয় খসড়ার একটি কপি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গ্যাস বরাদ্দের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের তালিকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ খাতে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখা হবে। তালিকা অনুযায়ী গ্যাস সংযোগে অগ্রাধিকার পাবে শিল্প, সার, বিদ্যুৎ, ক্যাপটিভ পাওয়ার, চা বাগান, বাণিজ্যিক, সিএনজি ও গৃহস্থালি।

গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানায় সরকার। ওই সময় অনেকেই নতুন সংযোগের জন্য আবেদন করেছেন। নির্বাচনের পর সরকার গৃহস্থালিতে গ্যাস সংযোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে নির্ধারিত হারে টাকা জমা দিয়ে আবেদন করার পরও অনেকে সংযোগ পাননি। খসড়া নীতিতে বলা হয়েছেÑ আবাসিক, বাণিজ্যিক ও সিএনজি খাতে পাইপলাইন গ্যাস সরবরাহের বদলে ব্যাপকভিত্তিতে এলপিজি (লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় রেগুলেটরি সহায়তা দেওয়া হবে।

খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী বর্তমানে দেশে সরবরাহ করা প্রায় ৩২০০ মিলিয়ন কিউবিক ফিট পার ডে (এমএমসিএফডি) প্রাকৃতিক গ্যাসের মধ্যে দেশজ উৎপাদন প্রায় ২৭০০ এমএমসিএফডি। দেশে গ্যাসের চাহিদা পূরণে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। আমদানি করা এলএনজির পেছনে ব্যয় দেশজভাবে উৎপাদিত গ্যাসের চেয়ে অনেক বেশি।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, সরকারের ভিশন ২০২১ ও ভিশন ২০৪১-এর লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে একদিকে গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন জোগান নিশ্চিত করা প্রয়োজন, অন্যদিকে দেশজ গ্যাসের সীমাবদ্ধতার কারণে যেসব খাতে সরবরাহ করা হলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে সেসব খাত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিহ্নিত করে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তিনি জানান, এলএনজি আকারে প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। কাজেই বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি মোকাবিলার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে দেশে গ্যাসনির্ভর যেসব খাত বা প্রতিষ্ঠান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় বা বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে সক্ষম সেসব খাতকে গ্যাস সরবরাহে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

প্রস্তাবিত নীতিমালার দ্বিতীয় খসড়ার একটি কপি দেশ রূপান্তরের হাতে এসেছে, যাতে বলা হয়েছেÑ বিক্ষিপ্তভাবে স্থাপিত শিল্পের বদলে পরিকল্পিতভাবে নির্ধারিত অঞ্চলে স্থাপিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান অগ্রাধিকার পাবে। বাণিজ্যিক খাতে গ্যাসের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে হবে। তবে হাসপাতালের মতো জরুরি সেবা খাতে বিষয়টি শিথিলযোগ্য হবে।

গাড়িতে অটোগ্যাস ব্যবহার উৎসাহিত করার কথা উল্লেখ করে এতে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী ইলেক্ট্রনিক, হাইব্রিড ও ব্যাটারিচালিত গাড়ির চাহিদা বাড়ছে, অটোগ্যাসের চাহিদাও বাড়ছে। সিলিন্ডার একবার রিফিল করলে সিএনজির তুলনায় অটোগ্যাস ব্যবহার করে গাড়ি ৪ থেকে ৫ গুণ দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। তাই পরিবহন খাতে পর্যায়ক্রমে সিএনজির বদলে অটোগ্যাস উৎসাহিত করা হবে।

বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও পরিকল্পিত শিল্প এলাকায় গ্যাস বরাদ্দে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ করে এতে বলা হয়েছে, দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি উন্নতি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অদক্ষ ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যায়ক্রমে ফেজআউট করা হবে। বিশেষ ক্ষেত্র বাদে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ সীমিত করা হবে। গ্যাস উৎপাদন, আমদানি, সঞ্চালন ও বিতরণ পর্যায়ে আধুনিক মিটারিং সিস্টেম চালু করা হবে। প্রতিটি বাল্ক ইউজার ও শিল্প-কারখানায় নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে ইলেক্ট্যনিক ভলিউমেট্রিক কারেক্টর (ইভিসি) স্থাপন করা হবে।

বৃহৎ গ্যাস ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানে এনার্জি অডিটিং সিস্টেম চালু করার কথা বলা হয়েছে খসড়া নীতিমালায়। এছাড়া বেশি গ্যাস ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রয়োজনে সমঝোতার ভিত্তিতে পৃথক ট্যারিফ নির্ধারণ করে স্পেশাল গ্যাস সেলস এগ্রিমেন্ট করার কথাও বলা হয়েছে।