লাভের মৌসুমেও মন্দা

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত উৎপাদনমুখী কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশের মৌসুম শুরু হয়েছে। জুন মাসে হিসাব বছর শেষ হওয়া কোম্পানিগুলোর অধিকাংশই আগামী মাস থেকে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা শুরু করবে। তবে পুঁজিবাজারে এর কোনো প্রভাব পড়ছে না। চলতি মাসের শুরুর দিকে কয়েকদিনের সামান্য ঊর্ধ্বগতির পর আবারও দরপতনের মধ্যে পড়েছে বাজার। পর্যাপ্ত ক্রেতা না থাকায় এ মৌসুমেও চাঙ্গাভাব দেখা যাচ্ছে না পুঁজিবাজারে। ক্রেতা সংকটে পড়ে অধিকাংশ শেয়ার দর হারাচ্ছে। চলতি বছর মিউচুয়াল ফান্ড ছাড়া লভ্যাংশ ঘোষণার প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা প্রায় ৮৩ শতাংশ শেয়ারের দর কমে গেছে। পর্যালোচনায় এমন তথ্য মিলেছে।

ব্যাংক ব্যবস্থায় তারল্য সংকটের জেরে ২০১৮ সাল থেকেই পুঁজিবাজার মন্দা পরিস্থিতিতে রয়েছে। ২০১৮ সালে অধিকাংশ শেয়ারের দরপতনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক প্রায় ১৪ শতাংশ কমে যায়। চলতি বছরের শুরুর প্রথম মাসে মূল্যসূচকের উল্লম্ফন সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত এ ধারা বজায় থাকেনি। স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিষ্ক্রিয়তা ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির চাপে চলতি জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে মূল্যসূচকের পতন দেখা দেয়। চলতি মাসের শুরুতে দরপতন কিছুটা কমে ছোট ছোট ঊর্ধ্বগতি দেখা গেলেও আবারও ক্রেতা সংকট তৈরি হয়েছে। এতে কয়েকদিন মূল্যসূচক সামান্য বাড়লেও পরবর্তী সময়ের বড় পতন অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি মাসে ১২ কার্যদিবসে সূচকে যতটুকু পয়েন্ট যোগ হয়েছিল, পরবর্তী তিন কার্যদিবসের পতনে তারচেয়ে বেশি সূচক কমে গেছে। গতকালও ৭৫ শতাংশ শেয়ারের দরপতনে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক কমেছে প্রায় ৩৯ পয়েন্ট। আর এতে সূচকটি নেমে এসেছে ৫১৩৯ পয়েন্টে। গতকাল খাদ্য, ট্যানারি ও জ¦ালানি ছাড়া বাকি সবগুলো খাতই দর হারিয়েছে।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিএসইতে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজগুলোর মধ্যে জুন মাস হিসাব বছর শেষ হওয়া সিকিউরিটিজের সংখ্যা হচ্ছে ২৪৮টি। এরমধ্যে মিউচুয়াল ফান্ডগুলো ইতিমধ্যেই লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। ফলে লভ্যাংশ ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে ২১১টি কোম্পানি। এরমধ্যে চলতি বছর ১৭৪টি কোম্পানির শেয়ারের দর আগের বছরের তুলনায় কমেছে। লভ্যাংশ ঘোষণার সম্ভাবনাতেও এসব শেয়ারের দর বাড়ছে না। ফলে এসব শেয়ারে বিনিয়োগকারীরা বড় অংকের লোকসানে রয়েছেন।      

চলতি বছর সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে কাগজ খাত। গতকাল পর্যন্ত খাতটি প্রায় ২৬ শতাংশ দর হারিয়েছে। এ সময়ে পাট খাত হারিয়েছে ১৭ শতাংশ বাজার মূলধন। চলতি বছর পাট খাতের সবগুলো কোম্পানির শেয়ারের দর কমেছে। এরমধ্যে জুট স্পিন ৩৪ দশমিক ৫ ও সোনালী আঁশ ২৮ শতাংশ দর হারিয়েছে।

আগের বছরের ধারাবাহিকতায় চলতি বছরও সিমেন্ট খাত প্রায় ১৭ শতাংশ বাজার মূলধন হারিয়েছে। ২০১৮ সালেও সিমেন্ট কোম্পানিগুলো ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ বাজার মূলধন হারায়। সিমেন্ট খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবগুলোর দর কমলেও সবচেয়ে বেশি বাজার মূলধন হারিয়েছে বহুজাতিক কোম্পানি হাইডেলবার্গ সিমেন্ট। চলতি বছর এ কোম্পানিটির শেয়ার দর কমেছে ৩৭ শতাংশ। এছাড়া এমআই সিমেন্ট ও কনফিডেন্স সিমেন্ট ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ শেয়ার দর হারিয়েছে।

চলতি বছর বস্ত্র খাতের কোম্পানিগুলো ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ মূল্য হারিয়েছে। পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছর বস্ত্র চার কোম্পানি ছাড়া অবশিষ্ট সবগুলোর দর কমেছে। এরমধ্যে ভিএফএস থ্রেড, আরএন স্পিনিং মিলস, সিমটেক্স, শাশা ডেনিমস, বেক্সিমকো সিনথেটিক্স, তুংহাই, মিথুন নিটিং, কেয়া কসমেটিক্স, জাহিন টেক্সটাইলসহ ১৩টি কোম্পানি ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ দর হারিয়েছে।

ইস্পাত খাতের ছয় কোম্পানির সবগুলো দর হারিয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে এসএস স্টিল। কোম্পানিটি চলতি বছর তালিকাভুক্তির পর থেকেই ৩৭ শতাংশ দর হারিয়েছে। ইস্পাত শিল্পের দেশের শীর্ষ কোম্পানি বিএসআরএম গ্রুপের বিএসআরএম লিমিটেড শেয়ারের দর কমেছে ১৫ শতাংশের বেশি। একই গ্রুপের অপর কোম্পানি বিএসআরএম স্টিল মিলস লিমিটেডও দর হারিয়েছে।

সিরামিক খাতের পাঁচ কোম্পানির মধ্যে একমাত্র স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক ছাড়া বাকি সব কোম্পানির দর কমেছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে ফু-ওয়াং সিরামিকস। ফার্মাসিউটিক্যালস ও রসায়ন খাতে মিশ্রাবস্থা থাকলেও একমি ল্যাবরেটরিজ, অ্যাম্বী ফার্মা, সিলভা, ইন্দো-বাংলা, সেন্ট্রাল, ফার কেমিক্যাল, কাশেম ইন্ডাস্ট্রিজ সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে। ২০১৮ সালে সিরামিকস খাত ৭ দশমিক ৭ শতাংশ দর হারায়।

প্রকৌশল খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে আফতাব অটো, ইফাদ অটো, অ্যাপোলো ইস্পাত, বিডি থাই, কপারটেক ও ওইম্যাক্সের শেয়ারে সবচেয়ে বেশি লোকসানে রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এসব শেয়ারের দর চলতি বছর ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। আগের বছরও খাতটি সাড়ে ৭ শতাংশ বাজার মূলধন হারিয়েছে।

 সেবা ও নির্মাণ খাত ২০১৮ সালে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ বাজার মূলধন হারায়। আর চলতি বছরের গতকাল পর্যন্ত খাতটি প্রায় ৬ শতাংশ দর হারিয়েছে। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি খাত ৬ শতাংশ বাজার মূলধন হারালেও ইনটেক লিমিটেড হারিয়েছে প্রায় ৪৯ শতাংশ দর। বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়লেও বাজার মূলধনে শীর্ষ কোম্পানি গ্রামীণফোন হারিয়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ দর। এর বাইরে ট্যানারি ১১ দশমিক ৪ শতাংশ বাজার মূলধন হারিয়েছে।

এছাড়া সূচকে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যাংক ও ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক খাতও দর হারিয়েছে। ২০১৮ সালে ব্যাংক খাত ২০ দশমিক ৭ শতাংশ বাজার মূলধন হারায়। চলতি বছর এ খাতটি ১ দশমিক ৬ শতাংশ দর হারিয়েছে। ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক খাতের শেয়ার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস অবসায়নে যাওয়ায় চলতি বছর পুরো খাতটিতে বিপর্যয় নেমে এসেছে। চলতি বছরের গতকাল পর্যন্ত এ খাতটি ১৫ শতাংশ দর হারিয়েছে। বিপরীতে সাধারণ বীমা, জ্বালানি, বিবিধ, ফার্মাসিউটিক্যালস, জীবন বীমা ও খাদ্য খাতের বাজার মূলধন বেড়েছে।