আর্থিক ব্যবস্থায় তারল্য সংকটের কারণে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে স্বল্প সময়ের জন্য ধার করা অর্থের সুদের হার বা কলমানি রেট বাড়ছে। গত বুধবার আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে কলমানি রেট দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশে, যা গত সাড়ে তিন বছরে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
গত ২৮ আগস্ট আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে স্বল্প সময়ে ধার করা অর্থের সুদের সর্বোচ্চ হার দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশে। এদিন সর্বনিম্ন সুদের হার ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ভারিত সুদহার দাঁড়ায় ৫ দশমিক ০৭ শতাংশ। এদিন কলমানি মার্কেট থেকে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ৩ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা ধার নেয়। আর চলতি মাসে কলমানি থেকে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ধারের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৫ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা।
সাধারণত নগদ টাকার সংকট হলে এক ব্যাংক অন্য ব্যাংক থেকে সাময়িকভাবে টাকা ধার নেয়। এক রাতের (ওভার নাইট) জন্য এ ধার দেওয়া হয়। ধার দেওয়া-নেওয়া কার্যক্রমকে আন্তঃব্যাংক কলমানি মার্কেট বলা হয়। নগদ টাকা ধারের চাহিদার ওপর এ মার্কেটের সুদহার ওঠানামা করে।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ধারের পরিমাণ বাড়ায় কলমানি মার্কেটে প্রভাব ফেলছে। ২০১৮ সাল থেকেই ব্যাংক ব্যবস্থায় তারল্য সংকট রয়েছে। চলতি বছরও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একটি বড় অংশ তারল্য সংকটে রয়েছে। এ কারণে চলতি অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি ঋণপ্রবাহের হার কমিয়ে আনা হয়েছে। তবে বাড়ানো হয়েছে সরকারি ঋণের হার। চলতি অর্থবছরের ২০ আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ধারের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার কোটি টাকা। পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৬ সালের পর চলতি বছরই কলমানি মার্কেটে সুদের হার সর্বোচ্চে উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ সালের ২ মে কলমানি মার্কেটে গড় সুদহার ছিল ৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ। সে বছর কলমানি সুদের গড় হার প্রায় একই ছিল। সে সর্বনিম্ন সুদহার ১ দশমিক ৫ ও সর্বোচ্চ সুদহার ছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১৭ সালে কলমানিতে গড় সুদহার মাঝে মাঝে ৪ শতাংশে উন্নীত হলেও তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
কলমানিতে সুদহার কিছুটা বাড়তে শুরু করে ২০১৮ সাল থেকে। সে সময় অগ্রিম ঋণ অনুপাত (এডিআর) বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট তৈরি হয়। তবে যে হারে তারল্যের অভাব দেখা যায়, কলমানিতে সুদের হারে তেমন প্রভাব পড়েনি।
২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত কলমানিতে গড় সুদহার সাড়ে ৪ শতাংশে উন্নীত হলেও পরবর্তী সময়ে সুদহার সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে আসে। তারল্য সংকট থাকলেও গত সাড়ে তিন বছরের মধ্যে ২০১৮ সালে আগস্টে কলমানি মার্কেটের সুদহার সর্বনিম্নে নেমে আসে। এ সময় কলমানি মার্কেটে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ হলেও সর্বনিম্ন সুদহার শূন্য দশমিক ১০ শতাংশে নেমে আসে। ২০১৮ সালের ৬ আগস্ট কলমানিতে ভারিত সুদহার দাঁড়ায় ১ দশমিক ৪৪ শতাংশে। গত এক দশকে এত কম সুদহারে লেনদেন হয়নি কলমানি মার্কেটে।
২০০৯ সালের অক্টোবরে গড়ে ২ দশমিক ৮ শতাংশ সুদে লেনদেন হয় কলমানি মার্কেটে। তবে ২০১৮ সালের আগস্টের শেষার্ধ থেকেই কলমানি বাজার কিছুটা অস্থির হয়ে উঠতে দেখা যায়। ওই বছরের ২০ আগস্ট কলমানিতে গড় সুদহার বেড়ে ৫ দশমিক ০৪ শতাংশে উন্নীত হয়। পরে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে এলে চলতি জুলাই মাসে সর্বনিম্ন শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশে অর্থ ধার পাওয়া যায়, যা ছিল স্বল্প সময়ের জন্য।
ঈদকে কেন্দ্র করে চলতি আগস্ট মাস থেকেই কলমানি মার্কেটে সুদহার বাড়তে থাকে। এ সময় সর্বনিম্ন গড় সুদহার দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৩৭ শতাংশে। আর সর্বোচ্চ সুদহার ছিল সাড়ে ৫ শতাংশ। আর ২৮ আগস্ট গড় সুদহার দাঁড়ায় ৫ দশমিক ০৭ শতাংশ, যা ২০১৬ সালের ২ মের পর সর্বোচ্চ।
প্রতি বছরই ঈদের আগে গ্রাহকদের নগদ টাকার চাহিদা বাড়ে কয়েক গুণ। ফলে এ সময় অনেক ব্যাংকে নগদ টাকার সংকট দেখা দেয়। এই সংকট মোকাবিলায় আন্তঃব্যাংক কলমানি বা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ধার করে ব্যাংকগুলো। তবে এবার ঈদের আগে সুদহার বাড়লেও পরে তা আর কমতে দেখা যায়নি। আগামীতে ব্যাংকগুলোর এডিআর সমন্বয়কে কেন্দ্র করে কলমানি মার্কেটের উত্তাপ আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।