সাংবাদিকদের সঙ্গে ‘সংবিধান সংশোধন কমিটি’র সভা

সংবিধানের মৌলিক সংস্কারে আবারও গণভোট হবে

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:০৯ এএম

রাষ্ট্র পরিচালনায় গুণগত পরিবর্তন ও সংবিধানে মৌলিক সংস্কার আনার লক্ষ্যে আবারও দেশব্যাপী গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংবিধান সংশোধনসম্পর্কিত বিশেষ কমিটির আহ্বায়ক সালাউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, আগামী বছরের জানুয়ারিতে সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনের বিল উত্থাপন হতে পারে। এতে সংবিধানের প্রস্তাবনাসহ বেশ কিছু অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আসবে। আর এসব পরিবর্তনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের আগে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে গণভোটের প্রয়োজন হবে। গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদের গণমাধ্যম সেন্টারে ‘সংবিধান সংশোধন কমিটি’র তৃতীয় সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এসব তথ্য জানান তিনি।

গণভোট প্রসঙ্গে সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, ৫ আগস্টের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের পর সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনী বাতিল হওয়ায় ১৪২ অনুচ্ছেদটি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। সংবিধানে প্রস্তাবনা, অনুচ্ছেদ ৮, ৪৮, ৫৬ ও ১৪২ এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনলে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে অবশ্যই জনগণকে গণভোট দিতে হবে। বিল পাসের পর এই সাংবিধানিক গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।

সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে বেলা আড়াইটা থেকে বিকেল সোয়া ৫টা পর্যন্ত পৌনে তিন ঘণ্টাব্যাপী এ সংক্রান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সাংবাদিক সংগঠনের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন। মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে তারা সংবিধান সংশোধনের বিভিন্ন দিক, গণআকাক্সক্ষা এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে নিজস্ব মতামত উপস্থাপন করেন। বৈঠকে অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধশত জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানের সংশোধনী সম্পন্ন করার ওপর জোর দেন। বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দলকে প্রক্রিয়ার বাইরে না রেখে, সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও আস্থার সঙ্গে তাদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সরকারের উদ্দেশে জোর দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা বিগত সরকারের স্বেচ্ছাচারিতার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যকার বিপজ্জনক একচ্ছত্র প্রভাব কমানোর জোরালো সুপারিশ করেন।

বৈঠকে দৈনিক ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, নিউএজ সম্পাদক নুরুল কবির, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমেদ, প্রতিদিনের বাংলাদেশ সম্পাদক মারুফ কামাল খান, দেশ রূপান্তর সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী, কালবেলা সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, দ্য ডেইলি ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম প্রমুখ।

সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সুরক্ষায় গণভোট নিয়ে সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বিএনপির পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার জন্য তারা ১৭ বছর সংগ্রাম করেছে, ভবিষ্যতের কোনো সংসদ যেন তা সহজে বাতিল করতে না পারে, সে জন্য এ-সংক্রান্ত অনুচ্ছেদগুলোতে সংশোধনী আনতেও যেন গণভোটের প্রয়োজন হয়, সেই বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমাদের অগ্রাধিকার হলো জুলাই জাতীয় সনদ। তবে নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ম্যান্ডেট পাওয়া বিষয়গুলোও আমরা ধারণ করব। সংবিধানে ‘মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’, যা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রস্তাবনায় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে অনুচ্ছেদ ৮-এ যুক্ত করেছিলেন, তা আমরা ফিরিয়ে আনব। এটি আমাদের ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি।”

সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে সালাউদ্দিন আহমদ বলেন,  ‘সম্পাদকদের অনেকেই বিরোধী দলের সদস্যদের অংশগ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছেন। আমরাও তাদের মতামতের সঙ্গে একমত। আমরা তাদের (বিরোধী দল) বারবার আহ্বান জানিয়েছি এবং এখনো জানাই। তারা কমিটিতে যোগ দিলে স্বাগত জানাব। আমরা চাই আমাদের মধ্যে কোনো বিভক্তি না থাকুক, ঐকমত্যের ভিত্তিতেই আমরা কাজ করতে চাই।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা সংবিধানের প্রস্তাবনা থেকে শুরু করে তফসিল এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বিষয়ে বিস্তারিত মতামত ও প্রস্তাব দিয়েছেন। অনেকেই লিখিত প্রস্তাব দেবেন। এসব প্রস্তাব ও আলোচনা রিপোর্ট ও পুস্তিকা আকারে প্রণয়ন করা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ডিসেম্বরের মধ্যেই সংবিধান সংশোধন কমিটির প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপনের প্রচেষ্টা চলছে। এ প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে আইন মন্ত্রণালয় থেকে একটি বিল আসবে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, আগামী জানুয়ারিতে অধিবেশনে বিলটি সংসদে আসতে পারে। এরপর বিলের ওপর আলোচনা ও সংশোধনী শেষে পাস হলে গণভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত হবে।

বৈঠকে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন, সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, সংসদ সদস্য ফারজানা শারমীন, সাকিলা ফারজানা, মো. মাহমুদুল হক রুবেল ও মো. অলিউল্লাহ। 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত