এক গেট ইজারা নিয়ে চার গেটে টাকা আদায়

গতকাল সোমবার দুপুর পৌনে ১২টা। রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় চন্দ্রিমা মার্কেটের দক্ষিণ পাশে একটি প্রাইভেট কার থামার সঙ্গে সঙ্গে লাঠি হাতে এসে হাজির এক ব্যক্তি। গাড়ির চালককে একটি টোকেন ধরিয়ে দিয়ে ২০ টাকা আদায় করলেন। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখা যায়, এখানে আসা সব যানবাহনের কাছ থেকে ২০ টাকা করে আদায় করছেন ওই ব্যক্তি। টাকা আদায়কারী ব্যক্তির পরিচয় জানালেন চন্দ্রিমা মার্কেটের নিরাপত্তায় নিয়োজিত আনসার সদস্য শরীফ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হারুন নামের এই ব্যক্তি টোকেন দিয়ে মোটরসাইকেল ও কার থেকে ২০ টাকা করে নেন। কোনো যানবাহন নিউমার্কেট বনলতা কাঁচাবাজারসংলগ্ন রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করলেই ২০ টাকা করে গুনতে হয়।’ এ সময় সেখানে নিউমার্কেট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শাহ আলমকে পুলিশের একটি টিম নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তাদের সামনেই টাকা নেওয়া হচ্ছে। জানতে চাইলে টাকা আদায়কারী হারুন বলেন, মেসার্স টাইমস ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠান নিউমার্কেট এলাকায় পার্কিং ইজারা নিয়েছেন ফরমান আলী ও শাহীন নামের সরকারদলীয় স্থানীয় নেতা। এখানে তিনি দুই বছর ধরে টাকা তোলেন। মাসিক হিসেবে তাকে বেতন দেওয়া হয়। কিন্তু ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা যায়, নিউমার্কেটের ১ নম্বর গেটটি তারা পার্কিংয়ের জন্য ইজারা দিয়েছেন। এর বাইরে টাকা আদায়ের

এখতিয়ার ইজারাদারের নেই। একটি গেট ইজারা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সরদার।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, নিউমার্কেটে প্রবেশে চারটি গেট রয়েছে। ডিএসসিসি একটি গেটসংলগ্ন রাস্তার অংশও পার্কিংয়ের জন্য ইজারা দিয়েছে। কিন্তু বাকি তিনটি গেটের পার্কিং থেকেও টাকা তোলা হয়। ডিএসসিসির নাম ও লোগোসংবলিত রসিদ দিয়ে টাকা আদায় করা হচ্ছে। তারা প্রতিটি যানের জন্য ১৫ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও এখানে ২০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। এ ছাড়া পুরানা পল্টন লেনের রাস্তা বা বিজিবি গেটের সামনে দিয়ে বটতলা হয়ে বনলতা মার্কেটের সামনের রাস্তায় যানবাহন চলাচল করলেও ২০ টাকা করে দিতে হয়। এ নিয়ে প্রায়ই যানবাহনচালক আর মালিকদের সঙ্গে টাকা আদায়কারী ব্যক্তির বাগ্্বিত-া হয়।

নিউ সুপার মার্কেটের (ডি-ব্লক) এক ক্রোকারিজ ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মূলত ১ নম্বর গেট ইজারা দিয়েছে সিটি করপোরেশন। কিন্তু ইজাদারের লোকজন চার গেট থেকে টাকা তোলে। এমনকি বনলতা মার্কেটের সামনের রাস্তা দিয়ে কোনো যানবাহন চলাচল করলে টাকা দিতে হয়।

ব্যবসায়ীরা জানান, নিউমার্কেট এলাকায় পার্কিংয়ের ইজারা কয়েক বছর ধরে নিয়ন্ত্রণ করছে একটি সিন্ডিকেট। তারা পার্কিংয়ের নামে বছরে কমপক্ষে সাড়ে তিন কোটি টাকা আদায় করলেও ডিএসসিসি কোষাগারে জমা হয় নামমাত্র অর্থ। ২০১৫ সাল থেকে নিউমার্কেটের ১ নম্বর গেটসংলগ্ন পার্কিং ইজারা নেন গোলাম সুমেরুল হক রানা নামে ছাত্রলীগের এক নেতা। ডিএসসিসির দরপত্র নিয়ন্ত্রণ করে নামমাত্র অর্থে তারা এ ইজারা নেন। এরপর মিলেমিশে ৫ বছর ধরে পুরো মার্কেট এলাকার সব রাস্তা থেকে টাকা তোলেন। এ সিন্ডিকেটে আছেন ১৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি ফরমান মোল্লা এবং মিজান নামে দুই ব্যক্তি। তারা পুরো নিউমার্কেট এলাকা থেকেই তাদের নিয়োগকৃত ১৫-২০ জন লোকের মাধ্যমে রসিদ দিয়ে টাকা তোলেন। ইজারাদার প্রভাবশালী হওয়ায় ব্যবসায়ীরাও কোনো প্রতিবাদ করেন না। ২০১৪ সালে ‘মেসার্স রিমন এন্টারপ্রাইজ’ নামে আট লাখ টাকায় নিউমার্কেটের ১ নম্বর গেটের পার্কিং ইজারা নেন নিউমার্কেট থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি শফিকুল ইসলাম। টোল আদায়ে নিয়োজিত কয়েকজন জানান, তারা পুরো নিউমার্কেট এলাকায় গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য ২০ টাকা হারে আদায় করেন। প্রতিদিন গড়ে কমবেশি ৪০০ যানবাহন আসে। প্রতিদিন ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা ওঠে। মাসে দাঁড়ায় প্রায় ৩০ লাখ; আর বছরে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা।