ভারতের আসামে চূড়ান্ত নাগরিক তালিকা (এনআরসি) প্রকাশ করা হচ্ছে ৩১ আগস্ট। এই তালিকা থেকে বাদ পড়তে যাচ্ছে ৪০ লাখ মানুষ, যাদের অধিকাংশই সংখ্যালঘু মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর। এ নিয়ে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যটির মানুষের মধ্যে নাগরিকত্ব হারানোর আতঙ্ক বিরাজ করছে।
নিউজ এইটিন জানায়, ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে যারা আসামে বসবাসের নথিপত্র দেখাতে পারবেন তারাই দেশটির নাগরিক হিসেবে নিজেদের প্রমাণে সক্ষম হবেন। এর ভিত্তিতে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে ভারত সরকার রাজ্যটির নাগরিক তালিকার চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশ করে, যাতে বাদ পড়ে ৪০ লাখ মানুষের নাম। যথাযথ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় তাদের নাম বাদ পড়েছে বলে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এদিকে শুধু মুসলিম বাসিন্দারাই নয় রাজ্যটির অনেক হিন্দু পরিবারও নাগরিকত্ব হারানোর আতঙ্কে আছে। যারা দেশবিভাগের সময় এবং এর পরবর্তী সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকার হয়ে আসামে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
৫৮ বছর বয়সী দুলাল দাশ মাত্র সাত বছর বয়সে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মুখে পড়ে ১৯৬৮ সালে ততকালীন পূর্ব পাকিস্তান বর্তমানে বাংলাদেশের ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে পরিবারের সঙ্গে আসামে পালিয়ে এসেছিলেন।
পাঁচ দশক ধরে ভারতে বাস করা এই ব্যক্তি বলেন, “আমাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল, আমরা জীবন বাঁচাতে ভারতে পালিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু পাঁচ দশক ধরে ভারতে বসবাস করে আবারও রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার সম্মুখীন হচ্ছি আমরা। আমরা আতঙ্কে আছি আমার এবং আমার পরিবারের সদস্যদের নাম এনআরসিতে নাও থাকতে পারে।”
২০১৮ সালে খসড়া তালিকায় দুলাল দাশ, স্ত্রী মমতা এবং ছেলে রাজেশ দাশের নাম আসেনি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখানোর পরেও তাদের নাম এনআরসি খসড়া তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা এখনো নিশ্চিত না আমাদের নাম এনআরসিতে থাকবে কী না। আমরা কী আবারও রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ব?”
তার মতো আরও ২৭৪ হিন্দু পরিবারেও একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ১৯৭১ সালের আগে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকার হয়ে এসব পরিবার ততকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসাম রাজ্যের রাজধানী শহর গুয়াহাটি থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে কামরূপ জেলার বনগাঁওর বাসিন্দা হন।
কোচ-রাজবংশী, হাজং ও গারো সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত এসব হিন্দু পরিবার গত এক বছর ধরে স্থানীয় এনআরসি সেবা কেন্দ্রের কাছে পুরোনো ও বিবর্ণ হয়ে যাওয়া কাগজের টুকরো নিয়ে ধরনা দিয়ে বেড়িয়েছে। যাতে প্রমাণ মেলে তারা ১৯৭১ সালের আগ থেকে আসামে বসবাস করে আসছে। এরপরেও এনআরসিতে তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় হতাশ ও উদ্বিগ্ন তারা।
শরণার্থী হিসেবে ভারতে যাওয়ার পর দেশটির সরকার তাদের থাকার জন্য ছোট জমিও দিয়েছিল প্রত্যেক পরিবারকে। যাদের এখন দুই প্রজন্মও বেড়ে উঠেছে ভারতের নাগরিক হিসেবে। কিন্তু এখন এসে আবারও রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার সম্মুখীন এসব হিন্দু পরিবার।
এসব হিন্দু পরিবারের মতো কামরূপের বনগাঁ প্রায় ২৩ কিলোমিটার দূরে মালিবাড়ি পাথর এলাকায় বসবাসরত প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ খুব নিদ্রাহীন রাত কাটাচ্ছেন। নাগরিকত্ব প্রমাণে যাবতীয় কাগজপত্র দেখানোর পর এনআরসি খসড়া তালিকায় নাম আসে এসব মুসলিম বাসিন্দাদের। কিন্তু খসড়া তালিকা প্রকাশের পর পরিবার প্রতি একজনকে পুনরায় নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য ডাকা হয়। এতে পরিবারগুলো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। শেষপর্যন্ত তাদের নাম থাকছে কী না নাগরিকত্ব তালিকায় নাকি রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী সিরাজুল আলী বলেন, “চলতি মাসের শুরু থেকে পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের জন্য নির্দেশনা জারির পর গ্রামবাসীরা উদ্বিগ্ন। আমাদের বেশির ভাগ লোক এনআরসি কর্তৃপক্ষের দ্বারা প্রকাশিত প্রাথমিক এবং চূড়ান্ত উভয় খসড়াতেই অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু সর্বশেষ নির্দেশনা জারির পর আমরা নাগরিকত্ব হারানোর নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছি।”
তবে ত্রুটিযুক্ত এই এনআরসি তালিকা প্রকাশের পরও এতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ এখনই বন্ধ হচ্ছে না। কেন্দ্রীয় সরকার এর মধ্যে জানিয়েছে, যারা চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়বে তারা ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নাগরিকত্ব যাচাই করার পুনরায় সুযোগ পাবে।
তালিকা প্রকাশের পর আপিল করার জন্য সময় ৬০ দিন থেকে ১২০ দিন করা হয়েছে। আপিল জানাতে কাজ করছে ১০০টি ফরেইনার্স ট্রাইব্যুনাল (এফটিএস), অতিরিক্ত আরও ২০০টি এফটিএস গঠন করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে আবেদনের পরেও যদি কেউ নাগরিকত্ব হারায় উচ্চ আদালতে গিয়ে পুনরায় আবেদন করার সুযোগ থাকছে।