বরগুনায় রিফাত হত্যা

দেলোয়ার-সুনাম মুখোমুখি

বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা হিসেবে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সুনাম দেবনাথের নাম উল্লেখ করে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে তার নাম না থাকায় গত মঙ্গলবার আদালত প্রাঙ্গণে ক্ষোভ প্রকাশ করে রিফাত হত্যা মামলার আসামি মো. রাশিদুল হাসান রিশান ফরাজী এবং তার বড় ভাই রিফাত ফরাজী। আর তাদের ওই মন্তব্যের পর মুখোমুখি অবস্থানে চলে এসেছে বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে চিরচেনা দুই প্রতিপক্ষ সদর আসনের সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলে বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুনাম দেবনাথ এবং সাবেক সাংসদ ও জেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন। সুনাম দেবনাথের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন তিনি। তিনি ও তার পরিবারকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্যই এসব কথা বলানো হচ্ছে। অন্যদিকে দেলোয়ার হোসেনের দাবি, রিশান ও রিফাত ফরাজী এবং তাদের পরিবারের সঙ্গে তার কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই। তাদের দুই ভাইকে কোনো কিছুই তিনি বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে শিখিয়ে দেওয়া হয়নি।

এর আগে গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলার নিয়মিত ধার্য তারিখে রিফাত হত্যা মামলার আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়। হাজিরা শেষে প্রিজন ভ্যানে ওঠানোর সময় বাইরের মানুষজন ও সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে রিশান ও রিফাত চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘এটা অন্যায়, এটা অবিচার। যে (রিফাত শরীফ হত্যার পরিকল্পনা) করছে সে কেন ৭ নম্বর, সুনাম দেবনাথ কেন আসামি নাই, সুনাম দেবনাথ হত্যার নির্দেশদাতা, আমরা সুনাম দেবনাথের লোক। সে কেন আসামি নাই, বাদশা হত্যার কেন বিচার নাই? এটা অবিচার, এটা অন্যায়।’ এ সময় রিশান ফরাজীসহ আরও কয়েকজন আসামি বলেন ওঠে, ‘মিন্নি কেন ৭ নম্বর আসামি।’

গত ২৬ জুন রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই আলোচনায় রয়েছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলে সুনাম। রিফাত হত্যাকাণ্ডের পর তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির যোগসাজশের ইঙ্গিত করে সুনাম তার ফেইসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। পরে তা সরিয়েও নেন। হত্যা মামলার সময় সাক্ষীর তালিকায় মিন্নির নাম থাকলেও এখন তিনিও একজন আসামি।

রিফাত হত্যার পরদিন ২৭ জুন তার বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বাদী হয়ে বরগুনা থানায় ১২ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা করেন। এতে প্রধান সাক্ষী করা হয়েছিল মিন্নিকে। কিন্তু মামলার ১৮ দিন পর গত ১৩ জুলাই এই হত্যাকাণ্ডে মিন্নি জড়িত এমন দাবি করে সংবাদ সম্মেলন করেন তার শ্বশুর দুলাল শরীফ। এরপরই মামলার তদন্ত নাটকীয় মোড় নেয়। সংবাদ সম্মেলনের পরদিন মিন্নির গ্রেপ্তার দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশও করা হয়। ওই সমাবেশে দুলাল শরীফ ছাড়াও স্থানীয় সাংসদ ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলে বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক সুনাম দেবনাথ মিন্নির গ্রেপ্তার দাবি করে বক্তব্য দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৬ জুলাই জিজ্ঞাসাবাদের নামে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে মিন্নিকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে মিন্নি রিফাত হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয় বলেও জানায় পুলিশ।

তবে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হক কিশোরের দাবি, মিন্নির কাছ থেকে জোর করে জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। তিনি এ হত্যা মামলার এক নম্বর সাক্ষীকে (মিন্নি) আসামি করা ও রিমান্ডে নেওয়ার জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুকে দায়ী করে আসছেন। তিনি এর আগে বলেছিলেন, ‘সবকিছুই শম্ভু বাবুর খেলা। তার ছেলে সুনাম দেবনাথকে রক্ষা করার জন্য আমার মেয়েকে বলি দেওয়া হচ্ছে।’ সুনামের বিরুদ্ধে কিশোরের অভিযোগ, তার জন্যই এতদিন মিন্নির পক্ষে আদালতে দাঁড়াননি আইনজীবীরা। এ নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহু সমালোচনার পর বরগুনা ও ঢাকার আইনজীবীদের একটি অংশ মিন্নির পক্ষে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।

এছাড়া রিফাত হত্যার পরপরই তার খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দানকারী হিসেবে যে দুজনের নাম আলোচনায় এসেছিল তার একজন এই সুনাম দেবনাথ। অন্যজন বরগুনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন।

রিফাত হত্যা মামলার প্রাপ্তবয়স্ক ১ নম্বর আসামি রিফাত ফরাজী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক ১ নম্বর আসামি রিশান ফরাজী বরগুনা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে। রিফাত হত্যার পরপরই এ বিষয়ে গণমাধ্যমে বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশিত হয়। কথিত রয়েছে যে, দেলোয়ার হোসেনের স্ত্রী শামসুন্নাহার খুকীর সঙ্গে নিহত রিফাতের একসময় বাগ্বিতণ্ডা হয়েছিল। সেই প্রতিশোধ নিতেই রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার সময় রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজীকে আগ্রাসী ভূমিকায় দেখা যায়। এছাড়াও দেলোয়ার হোসেনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও রিফাত ও রিশানকে দেখা গেছে বলে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন।

রিফাত ও রিশানের আদালত প্রাঙ্গণে করা মন্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে সুনাম দেবনাথ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসামি রিশান যে পরিবারের সদস্য, সে পরিবারের সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক বিরোধিতা ২০০১ সাল থেকে। গত নির্বাচনেও তাদের সঙ্গে আমাদের মনোনয়নযুদ্ধ হয়েছে এবং নির্বাচনের আগ থেকেই তারা আমাদের বিরুদ্ধে বহু ষড়যন্ত্র করেও কোনোভাবে ঘায়েল করতে পারেনি।’ তিনি বলেন, ‘রিফাত হত্যা মামলার দুই মাস পর্যন্ত তদন্ত হয়েছে। যেখানে সব আসামি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। তারা সেখানে আমার কথা না বলে এখন কেন বলছে? নিশ্চয়ই জেলের বাইরে থেকে কেউ তাদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে এসব বিতর্কিত কথা বলাচ্ছে।’

সুনাম আরও বলেন, ‘রিফাত হত্যার পর এই আসামিদের নিয়ে আমি ফেইসবুকে একটা লেখা দিয়েছিলাম। এই ফরাজী ভ্রাতৃদ্বয় কার আত্মীয়? এবং কীভাবে বহু অপরাধ করে বারবার রেহাই পেয়ে যেত সে কথাও তখন বলেছি। এখন এই পর্যায়ে আসামিরা আমার কথা বললে আপনাদের বোঝা উচিত পূর্ব শত্রুতার জের ধরেই এই কথাগুলো বলছে। দীর্ঘদিন ধরে আমার বাবা ও পরিবারকে নিয়ে যে ষড়যন্ত্র হচ্ছে এই ঘটনাও সেই ষড়যন্ত্রের অংশ।’

এদিকে সুনামের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বরগুনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সাবেক সাংসদ দেলোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুনাম একটা হাঁটুর বয়সী ছেলে। ওর সঙ্গে আমার প্রতিদ্বন্দ্বিতা সাজে না। আমি ওর বাবার সঙ্গে রাজনীতি করি। এখন আমার বিরুদ্ধে যদি এসব অভিযোগ করা হয় সেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।’ তিনি আরও বলেন, ‘রিফাত ও রিশানকে আমি কখনো আশ্রয়-প্রশ্রয় দিইনি। রিশান ফরাজী আমার বৈবাহিকসূত্রে আত্মীয়। ওদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। দীর্ঘদিন ধরে আমার স্ত্রী কিংবা আমার পরিবারের কারও সঙ্গেই ওদের সম্পর্ক নেই। আমি শতভাগ নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি, আমি কিংবা আমার পরিবারের কোনো সদস্য রিশান ফরাজীদের সঙ্গে সুনামকে নিয়ে কোনো কথা বলেনি কিংবা কাউকে দিয়ে বলায়নি।’