নিত্যপণ্যের বস্তায় আসে ভারতীয় আগ্নেয়াস্ত্র

অবৈধ অস্ত্র কারবারিরা সীমান্ত হাটে সক্রিয়

সিলেট নগরী থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে গোয়াইনঘাট উপজেলার বিছনাকান্দি পার হয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত ‘লাকাট হাট’। দুই দেশের সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে চালু করা হয়েছিল এই হাট। কিন্তু বর্তমানে এই হাটে যাতায়াতের সুযোগ নিয়ে চোরাকারবারিরা ভারতীয় বিভিন্ন পণ্যের সঙ্গে হরহামেশাই দেশে মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্রের চালান ঢোকাচ্ছে। আর এসব আগ্নেয়াস্ত্র হাতবদল হয়ে দেশের বিভিন্ন  এলাকার অপরাধ চক্রের সদস্যদের হাতে ছড়িয়ে পড়ছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

মেঘালয়ের লাকাট হাট ছাড়াও সিলেট সীমান্তঘেঁষা মেঘালয় ও আসামে রয়েছে এ ধরনের আরও বেশ কয়েকটি সীমান্ত হাট, যেখান দিয়ে মাঝেমধ্যেই অবৈধ অস্ত্রের চালান নিয়ে আসছে চোরাকারবারিরা। তারা বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) চোখ এড়িয়ে দীর্ঘদিন ধরেই এই অবৈধ কারবার চালিয়ে আসছে। গতকাল শনিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের (এসএজি) আর্মস ইনফোর্সমেন্ট টিমের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানিয়েছে অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী আবদুস শহীদ, আনছার ও দোলন মিয়া। এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে তাদের তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধার করা হয় তিনটি ভারতীয় রিভলবার ও ১৬ রাউন্ড গুলি। এ ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানায় হওয়া মামলার আসামি হিসেবে গত শুক্রবার ওই তিনজনকে দুদিনের রিমান্ডে নেয় সিটিটিসি।

সিটিটিসির তদন্তকারী কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, শনিবার রিমান্ডের প্রথম দিনে জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কিছু তথ্য দিয়েছেন আবদুস শহীদ। তিনি (শহীদ) গত দুই বছরে সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ২৪৪টি অবৈধ অস্ত্র কেনার কথা স্বীকার করেছেন। মেঘালয়ের লাকাট হাটে নিয়মিত যাতায়াতকারী বিছনাকান্দির বাসিন্দা আরব আলী নামে এক অস্ত্র কারবারির কাছ থেকে এসব অস্ত্র কিনেছেন তিনি।

সিটিটিসির এই তদন্ত কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভারতের মেঘালয়ের এক নাগরিক, যিনি সীমান্ত এলাকার অস্ত্র কারাবারিদের কাছে ‘খাইস্যা’ নামে পরিচিত। মূলত তার কাছ থেকেই বিছনাকান্দির বাসিন্দা আরব আলী এসব অস্ত্র কিনে এনে সীমান্তের এপারে তার বাড়িতে জমা রাখেন। তারপর সেই বাড়িতে বসেই বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবসায়ীর কাছে এসব অস্ত্র বিক্রি করে থাকেন। তার কাছ থেকে আবদুস শহীদ অস্ত্রগুলো কিনে নিয়ে তার (শহীদ) সহযোগী আনছারের মাধ্যমে এসব অস্ত্র বিক্রি করতেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অস্ত্র ব্যবসায়ী আমিন মিয়ার কাছে। আমিন মিয়া আবার তার ক্যারিয়ার (কর্মচারী) দোলন মিয়ার মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, ঢাকা, ঢাকার আশুলিয়া, সাভার, যশোর ও পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার অপরাধীদের কাছে চড়া দামে এসব অস্ত্র বিক্রি করে থাকে।’ দোলন মিয়া পেশায় অটোরিকশা চালক। তবে তার মূল ব্যবসা অস্ত্র বহন করা।

সিটিটিসির স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের (এসএজি) অতিরিক্ত উপকমিশনার (পুলিশ সুপার, পদোন্নতিপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ, শেরপুর, কুষ্টিয়া, পাবনা ও হিলিসহ সীমান্তবর্তী পুরনো রুটগুলোর অস্ত্র পাচারকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি রয়েছে। যে কারণে অবৈধ অস্ত্র কারবারিরা এখন সিলেটের গোয়াইনঘাটের এই নতুন রুট ব্যবহার করছে।’

গোয়াইনঘাটের একাধিক বাসিন্দা দেশ রূপান্তরকে জানান, সীমান্তের এপারেই বেশির ভাগ সীমান্ত হাট বসে। এসব হাট উপলক্ষে ভারত থেকে নানা পণ্য আসে। আবার দেশীয় পান, সুপারি, সাতকড়া ও নানা জাতের মাছ সীমান্তের ওপারে যায়। এই হাট উপলক্ষে কিছু সময়ের জন্য সীমান্ত খুলে দেওয়া হলে ওই সুযোগে অবৈধ কারাবারিরা বিভিন্ন অবৈধ মালামাল নিয়ে আসে। সুনামগঞ্জ ও ভোলাগঞ্জেও এ ধরনের হাট রয়েছে। সিটিটিসির তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, ‘এসব পণ্য আনা-নেওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি চক্র ভারতীয় পণ্যের সঙ্গে অবৈধ অস্ত্র ও মাদক নিয়ে আসে।’   

সীমান্ত হাটের সুযোগ নিয়ে অস্ত্রসহ বিভিন্ন চোরাই মালামাল দেশে ঢোকার বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট ৪৮ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আহমেদ ইউসুফ জামিল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সীমান্তের দুই পাড়েই হাট-বাজার রয়েছে। তবে বর্ডার হাট বলে গোয়াইনঘাটে কোনো হাট নেই। এসব এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত ও চোরাকারবারিদের প্রতিরোধ করতে বিএসএফ ও বিজিবি যৌথভাবে নিয়মিত টহল দিয়ে থাকে। কাজেই এসব পয়েন্ট দিয়ে অবৈধ মালামাল ও অস্ত্র পাচারের কোনো সুযোগ নেই। তারপরও যদি কোনো ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সিলেট জেলার এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, বিছনাকান্দি সীমান্তঘেঁষা মেঘালয়ের লাকাট হাটের জন্য রবিবার ছাড়া সপ্তাহে দুদিন অন্তর হাট বসানো হয়। সেই হাট থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কেনার সুযোগ দিতে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী সাধারণ মানুষকে কিছু সময়ের জন্য আসা-যাওয়ার সুযোগ দেয়।

সিলেট বিজিবির সোনারঘাট ক্যাম্পের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুপুর একটা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত লাকাট হাটে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলেও যাতায়াতকারী সবার দেহ ও মালামাল পরীক্ষা করা হয়।

সিটিটিসির অতিরিক্ত উপকমিশনার জাহাঙ্গীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রেপ্তার হওয়া তিন অস্ত্র ব্যবসায়ী সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে অস্ত্র পাচারের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। তাদের দেওয়া তথ্যের আলোকে বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজন অস্ত্র ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তারের জন্য বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।’