নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে বৈষম্য বাড়ার হারকে ‘আসন্ন মহাবিপদ সংকেত’ অভিহিত করে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোনো দেশের বৈষম্য মাপার সূচক (গিনি সহগ) দশমিক ৫০-এ পৌঁছালে তাদের বৈষম্যের মহাবিপজ্জনক অবস্থায় বলা হয়। ২০১৬ সালের হিসাবে বাংলাদেশের এই সূচক পৌঁছে গেছে দশমিক ৪৮৩-এ। তাই বাংলাদেশ এখন একটি ‘উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশে’ পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আয়বৈষম্য বাড়ার কারণে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে বাহাদুরি করার কিছু নেই বলেও মন্তব্য করেন তারা।
গতকাল শনিবার বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি আয়োজিত ‘বাংলাদেশে আয় ও ধনবৈষম্য’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। উচ্চ আয়বৈষম্যের জন্য রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি, ব্যাংক খাত লুণ্ঠন, পুঁজি পাচারকে দায়ী করে তারা বলেন, রাজনীতি এখন লাভজনক পেশায় পরিণত হয়েছে, দুর্নীতিতে ভর করে কোটিপতিদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সমাজ থেকে আয়বৈষম্য কমাতে হলে দুর্নীতি বন্ধ করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরপেক্ষ ভূমিকায় আনতে হবে, যাতে সবার নায্যতা নিশ্চিত হয়। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে বিধিবিধান অনুযায়ী পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে। আর এসব করতে হলে দরকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও অঙ্গীকার।
অর্থনীতি সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আবুল বারকাতের সভাপতিত্বে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, সব বৈষম্যের উৎস হচ্ছে সুযোগের বৈষম্য। সুযোগ সমান হলে বৈষম্য থাকে না। ধনবাদী সমাজে বৈষম্য হবে। এটা নিয়ন্ত্রণের জন্য শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো দরকার। কিন্তু বৈষম্য কমানোর জন্য যা করা দরকার, তার সবকিছু করাও কঠিন। যেমন ভূমি সংস্কার জরুরি, কিন্তু বিশে^র বেশির ভাগ দেশই তা করতে পারেনি। আবার যেসব দেশে সংস্কার হয়েছে, সেখানে যারা করেছিল তারা টিকতে পারেনি। খেলাপি ঋণ সামাজিক অপরাধ, কিন্তু দেশে সেটা বেড়েই চলেছে। মূলত যে আস্থার মাধ্যমে আর্থিক খাত ও ব্যাংক খাত চালাতে হয় তা অর্জিত হয়নি। মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবস্থা দূর করতে না পারলে এ বৈষম্য দূর করা যাবে না।
তিনি বলেন, ব্যাংক আমানত নেয় স্বল্প মেয়াদে, ঋণ দেয় দীর্ঘ মেয়াদে। এটা বন্ধ করতে হবে। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে। বর্তমানে সোয়া কোটি মানুষের কর দেওয়ার কথা, কিন্তু দিচ্ছে কয়েক লাখ। মানুষ কর দিতে চায়, কিন্তু সে জন্য ভালো সড়ক, ভালো বিদ্যুৎ, হাসপাতাল চায়। সেখানে কাজ করতে হবে। দূষণ বন্ধ করতে হবে। কৃষি প্রক্রিয়াকরণে জোর দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য : সমাধান কোন পথে?’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ১৯৭৩-৭৪ সালে বাংলাদেশের গিনি সহগ (বৈষম্য মাপার সূচক) ছিল শূন্য দশমিক ৩৬, যা ২০১৬ সালে এসে দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৪৮৩-এ। যেসব দেশের এই সূচক শূন্য দশমিক ৫০-এ চলে যায়, তাদের বৈষম্যের মহাবিপজ্জনক অবস্থায় বলা হয়। বাংলাদেশ সেখানে চলে যাচ্ছে। ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে। ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল সময়ে বাংলাদেশের ধনীদের সম্পদ ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ হারে বেড়েছে। সংবিধানে সমাজতন্ত্রের কথা বলা থাকলেও মুক্তবাজার অর্থনৈতিক সুবিধা তা খেয়ে ফেলছে। ৪৪ বছর ধরে স্বজনতোষী পুঁজিবাদের (ক্রোনি ক্যাপিটালিজম) কারণে এ অবস্থা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বৈষম্য হয়েছে শিক্ষায়। স্বাস্থ্যব্যবস্থা ক্রমবর্ধমানভাবে বাজারীকরণ করা হয়েছে। ব্যাংক ঋণ সমাজের ক্ষুদ্র অংশে কুক্ষিগত হয়ে যাচ্ছে। এতে দারিদ্র্য বেড়েছে। আর এসব শুরু হয়েছিল ১৯৭৫ সালের পর থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত সময়ের সামরিক শাসন আমলে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতিই বর্তমানে দেশের উন্নয়নে সবচেয়ে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা। ব্যাংক খাত পুঁজি লুণ্ঠনের আকর্ষণীয় ক্ষেত্র হিসেবে ভূমিকা রাখছে। পুঁজি পাচার হচ্ছে। ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে বাহাদুরি করার কিছু নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। বাহাদুরি না করার কারণ হিসেবে অধ্যাপক মইনুল বলেন, এই প্রবৃদ্ধির হার সত্ত্বেও দেশে বৈষম্য বাড়ছে। বাংলাদেশ এখন একটি ‘উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশে’ পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
মইনুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে ধনীদের আয় বাড়ার হার বিশে^ সবচেয়ে বেশি। বছরে দেশ থেকে পাচার হচ্ছে ৭৫ হাজার কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছেন পোশাক কারখানার মালিকরা। কিন্তু এই খাতের ৩৫ লাখ শ্রমিক আগের মতো দরিদ্রই থেকে গেছেন।
প্রবন্ধে বলা হয়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ অর্জিত হয়েছে বলে সরকারিভাবে প্রাক্কলিত হয়েছে। এ বিবেচনায় বিশে^র অন্যতম গতিশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু দেশে আয়বৈষম্য বাড়ছে ব্যাপক হারে। আয়বৈষম্য বাড়তে থাকার এ প্রবণতাকে দেশের আসন্ন মহাবিপদ সংকেত বললে অতিরিক্ত হবে না।
তিনি বলেন, দেশে কোটিপতির সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এর পেছনে ন্যক্কারজনক পন্থা হলো দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হওয়া। এমন কোনো সরকারি সংস্থার নাম করা যাবে না, যেটা খানিকটা দুর্নীতিমুক্ত। এ ছাড়া বর্তমান জাতীয় সংসদে সাংসদদের ৬২ শতাংশই ব্যবসায়ী। এ সংসদ ব্যবসায়ীদের সংসদ এবং রাজনীতি এখন লোভনীয় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য তিনি ১৬ দফা সুপারিশ করেন। এর মধ্যে বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থা দূর করা অন্যতম। এ ছাড়া দুর্নীতি দূর, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, কৃষিব্যবস্থার বৈষম্য দূর, অর্থাৎ প্রান্তিক কৃষকদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন।
প্রবন্ধের ওপর আলোচনায় বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা পরিষদের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক কে এ এস মুর্শিদ বলেন, সবুজ বিপ্লবের কারণে দেশের এই উন্নয়ন। কিন্তু কৃষকরাই অনেক ক্ষেত্রে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যে কারণে বৈষম্য বাড়ছে। এখন সময় এসেছে রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে কথা বলার। এখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সেবা, নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে নায্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, শিক্ষায় বৈষম্য আছে। বৈষম্য রয়েছে ঋণ বিতরণেও। কুড়িগ্রাম, সুনামগঞ্জে যে পরিমাণ ঋণ যাওয়ার কথা, তা যাচ্ছে না। অথচ কোথাও কোথাও অতিরিক্ত ঋণ দেওয়া হচ্ছে। চাঁদাবাজি, ঘুষ চলছে। এসব বন্ধ না হলে বৈষম্য কমবে না।
মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামান বলেন, সামগ্রিক বৈষম্য যত, তার চেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে আঞ্চলিক বৈষম্য। রাজস্ব আদায় ব্যবস্থায় পরিবর্তন এখন জরুরি। পাশাপাশি রাজস্ব ব্যয়ের ক্ষেত্রেও গভীর পর্যালোচনা দরকার। ভালো অর্থনীতি ও ভালো রাজনীতির মধ্যে মেলবন্ধন দরকার।
অন্য বক্তারা বলেন, অযৌক্তিকভাবে পাটকল বন্ধ করা হয়েছে। সিন্ডিকেট করে কৃষিপণ্যের মূল্য দেওয়া হয় না। এসব বন্ধ না করলে বৈষম্য কমবে না।