ঢাকার সাভার উপজেলার আশুলিয়া থানাধীন নিশ্চিন্তপুরের নাজমুল হোসেন (৫৫) নামে এক ব্যক্তির টাকা হাতিয়ে নিয়ে মোহন আলী (২২) নামের যুবকের বিলাসী জীবনযাপনের তথ্য উঠে এসেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অনুসন্ধানে। নাজমুলের করা মামলার অনুসন্ধানে নেমে পিবিআই জানতে পারে, নাজমুল ব্যাংকে টাকা রাখতে যাওয়ার পথে কৌশলে তার ১০ লাখ টাকা ছিনতাই করেন মোহন। সে টাকার মধ্যে দুই লাখ দিয়ে তিনি অ্যাপাচি আরটিআর মোটরসাইকেল কেনেন। নাজমুলের করা মামলা সামলাতে থানায় দালালকে ৫০ হাজার টাকা দেন তিনি। এ ছাড়া মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পরদিন জামিনে মুক্তি পেয়ে মোহন মামলা তুলে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন নাজমুল ও তার পরিবার।
পিবিআইয়ের ভাষ্য, আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে নাজমুলের বাড়িতে ১০ বছর ধরে সপরিবারে ভাড়া থাকতেন মোহন আলী নামের ওই পোশাকশ্রমিক। নাজমুলকে নানা বলে ডাকতেন মোহন। দীর্ঘদিন ধরে বাসায় ভাড়া থাকায় নাজমুলের সঙ্গে গড়ে ওঠে সুসম্পর্ক। সম্প্রতি নাজমুল তার একটি জমি বিক্রি করে ১০ লাখ টাকা পান। গত ১ আগস্ট জমি বিক্রির ওই টাকা আশুলিয়ার জামগড়ায় একটি প্রাইভেট ব্যাংকে রাখতে যাওয়ার পথে কৌশলে হাতিয়ে নেন মোহন। টাকা মেরে তিনি চলে যান গ্রামের বাড়ি নওগাঁর মহাদেবপুরে। নিজের
কোনো ভিটেমাটি না থাকলেও মোহন কেনেন ২ লাখ টাকার মোটরসাইকেল। বাসার আসবাব, ফ্রিজ, টেলিভিশন ও অন্যান্য জিনিস কেনেন। গ্রামের একটি পুকুর লিজ নিয়ে ৫০ হাজার টাকার মাছ ছাড়েন। থানা সামলাতে নওগাঁর মহাদেবপুরের এক দালালকে দেন ৫০ হাজার টাকা।
টাকা ফিরে পেতে নাজমুল আশুলিয়া থানায় মামলা করেন। কিন্তু থানা পুলিশ কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় তিনি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) অভিযোগ করেন। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৬ আগস্ট মোহনকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। ওই সময় মোহনের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা ও মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয় বলে জানায় পিবিআই। তবে গ্রেপ্তারের পরদিনই জামিনে মুক্তি পান মোহন।
নাজমুলের ছেলে পারভেজ হোসেন (২৩) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নিয়েছিল মোহন। তাকে আমার বাবা অনেক বিশ্বাস করত। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে এমনটি করেছে। গ্রেপ্তারের পরদিনই জামিনে মুক্তি পেয়েছে। এখন মামলা তুলে নিতে চাপ দিচ্ছে। মামলা তুলে নিলে ১ লাখ টাকা ফেরত দেবে বলে সে প্রস্তাব দিয়েছে। না হলে আমরা টাকা ফেরত পাব না বলে সে জানিয়েছে।’
গ্রেপ্তারের এক দিন পরই জামিন পাওয়ার বিষয়ে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের পুলিশ সুপার বশির আহমেদ বলেন, ‘আসামি জামিনের বিষয়টি আইনের মধ্যেই আছে। কোর্ট যদি সন্তুষ্ট হয় তাহলে আমাদের যে ফৌজদারি কার্যবিধি আছে, সেই অনুযায়ী জামিনযোগ্য হলে, কোর্ট জামিন দিতে পারে। আমরা আসামি গ্রেপ্তারের পর চার্জশিট সাবমিট করি। সেই অনুযায়ী কোর্ট মামলা পরিচালনা করে।’
আশুলিয়া থানায় করা মামলাটি এখন পিবিআইয়ের হাতে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের এসআই সালেহ ইমরান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলাটি বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পিবিআই হেডকোয়ার্টার্স গ্রহণ করে। থানা থেকে মামলাটি হস্তান্তরের চার দিনের মাথায় আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই। মামলার বাদী ও আসামি আগে থেকেই পরিচিত। আসামি মোহন বাদীকে নানা বলে ডাকত। টাকার লোভে এ কাজটি করেছে বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছে মোহন। বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন থেকেই সে এমন প্রতারণার আশ্রয় নেয়। বাড়িতে সে বিলাসী জীবনযাপন শুরু করে। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে দুবার বাসাও বদল করে।’ তিনি বলেন, ‘পুলিশের ঝামেলা মেটানোর জন্য থানার এক দালালকে ৫০ হাজার টাকা দেয় সে। মোহনের টাকা মারার বিষয়টি তার পরিবারের সবাই জানত। তার বাসা থেকে নগদ ৫ লাখ টাকা উদ্ধার করেছি। মোটরসাইকেলটিও জব্দ করেছি। মোহনকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানোর পরদিনই সে জামিনে বের হয়েছে।’
নাজমুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাকে গাড়িতে তোলার পর প্রথমে বলে গরু কিনে বিক্রি করলে টাকা রাতারাতি কয়েক গুণ বাড়বে। আমি সরল বিশ্বাসে মোহনের কথায় রাজি হয়ে যাই। এরপর তার গ্রামের বাড়ি নওগাঁ জেলার মহাদেবপুরের উদ্দেশে রওনা হয়। পথে আমাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে, মারধর করে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয়। তার মোবাইলও বন্ধ করে ফেলে। পরদিন ফোন করে টাকা ফেরত দেবে বলে কথা দেয়। বিকাশের মাধ্যমে ৯০ হাজার টাকাও ফেরত পাঠায়। এ বিষয়ে মামলা না করতে বলে।’