মাদক কারবারে ঝুঁকছে অস্ত্র ব্যবসায়ীরানা

অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায় লাভের চেয়ে ঝুঁকি বেশি। ধরা পড়লে সাজার মেয়াদও বেশি। তাই দেশের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন জেলার অবৈধ অস্ত্র কারবারিরা তাদের পুরনো কারবার ছেড়ে এখন মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। কারণ মাদক ব্যবসাকালে ধরা পড়লেও সহজে জামিন মেলে। বিচারিক শাস্তিও কম হয়। র‌্যাব ও পুলিশের হাতে বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায়ীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এসব তথ্য জানতে পেরেছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) আর্মস এনফোর্সমেন্ট টিমের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, গত কয়েক বছরে অবৈধ অস্ত্রসহ শতাধিক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়। যাদের বেশিরভাগই বর্তমানে জামিনে কারামুক্ত অবস্থায় আছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ দেশের বাইরে পালিয়ে গেলেও অনেকে অবৈধ অস্ত্রের কারবার ছেড়ে মাদকের ব্যবসায় যুক্ত হয়েছে। তারা দেশের বিভিন্ন জেলার সীমান্তবর্তী রুট দিয়ে মাদকের চালান নিয়ে আসছে।

দিনাজপুরের হিলি সীমান্ত এলাকায় মাদক পরিবহনের একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে মতিন নামে এক অবৈধ অস্ত্র কারবারি। এর আগে তাকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছিল সিটিটিসির আর্মস এনফোর্সমেন্ট টিম। এ ছাড়া পাবনার মামুন, যশোরের রবি, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের লিয়াকত মেম্বার ও শফিকুল একইভাবে সংশ্লিষ্ট সীমান্ত এলাকার মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে। অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ সীমান্তে কাবিল, সোহেল, মামুন ও মো. আলী এবং একই জেলার তেলেকূপি সীমান্তে সিরাজ এখন গাঁজা, ফেনসিডিল ও ইয়াবার কারবার শুরু করেছে।

সিটিটিসির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. জাহাঙ্গীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত এলাকার অস্ত্র ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তাদের অনেকেই জামিনে ছাড়া পেয়ে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।’

অস্ত্র ব্যবসা ছেড়ে মাদক ব্যবসায় ঝুঁকে পড়ার কারণ হিসেবে সিটিটিসির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জের অস্ত্র ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগই দরিদ্র শ্রেণির। একবার ধরা পড়লে আইনি সহায়তা নিতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। যার ফলে অস্ত্র ব্যবসার জন্য নতুন করে মোটা অঙ্কের পুঁজি খাটাতে না পেরে

অল্প পুঁজিতে ফেনসিডিলের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ অস্ত্র ব্যবসা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছে।’

সিটিটিসির তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে আর্মস এনফোর্সমেন্ট টিমের হাতে অন্তত ৫০টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছে অর্ধ শতাধিক ব্যক্তি।

সিটিটিসির অপর এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, সম্প্রতি পুরান ঢাকার অস্ত্র ব্যবসায়ী আক্রাম জুনায়েদ জামিন নিয়ে দেশের বাইরে পালিয়ে গেছে। এ ছাড়া একই এলাকার অস্ত্র ব্যবসায়ী ইস্রাফিল, খলিল, কামাল ও কবির  জামিনে বাইরে বেরিয়ে একই পেশা চালিয়ে যাচ্ছে। এই কর্মকর্তা বলেন, ‘রাজধানীর বাইরে সীমান্তবর্তী এলাকার মধ্যে কুষ্টিয়া, শেরপুর, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের অস্ত্র ব্যবসায়ীরা বারবার ধরা পড়লেও জামিনে বের হয়ে একই পেশায় যুক্ত হয়।’

সিটিটিসির স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের (এসএজি) অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (পুলিশ সুপার, পদোন্নতিপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটি রুটে যে পরিমাণ মাদকের ট্রানজেকশন হয়, সেই তুলনায় অস্ত্রের সংখ্যা খুবই কম। কারণ একটি অবৈধ অস্ত্রের প্রতি স্ট্রং ইন্টেলিজেন্স কাজ করলেও মাদকের বিভিন্ন চালানের সংখ্যার তুলনায় তা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। এ ছাড়া অস্ত্র ব্যবসার ঝুঁকি যেমন বেশি, শাস্তিও বেশি। অন্যদিকে মাদক ব্যবসায় লাভ বেশি কিন্তু ঝুঁকি ও শাস্তি কম ভেবে আগের অস্ত্র ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে যাচ্ছে।’