ধর্ষণের শিকার অন্তঃসত্ত্বা কিশোরীর দাদি-চাচির সহায়তায় বাচ্চা অপসারণ!

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার এক কিশোরী  ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর বিয়ে করার কথা বলে নারায়ণগঞ্জের রায়গঞ্জে নিয়ে গিয়ে সিজারের মাধ্যমে বাচ্চা অপসারণের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সন্তানকে হারানোর পর বিপর্যস্ত ওই কিশোরী সামাজিক মর্যাদা ফিরে পেতে ধর্ষক ও বাচ্চা অপসারণের সঙ্গে জড়িত চারজনের বিরুদ্ধে শরীয়তপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা দায়ের করেছেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, নড়িয়া উপজেলার এক ডাব বিক্রেতার মেয়ে ভুক্তভোগী ওই কিশোরী মানুষের বাসায় ঝিয়ের কাজ করেন। একই গ্রামের প্রতিবেশী মৃত রশীদ ব্যাপারীর ছেলে বাবুল ব্যাপারী বিভিন্ন সময় ওই কিশোরীকে উত্ত্যক্ত করত।

 ওই কিশোরীর অভিযোগ, ২০১৮ সালের আগস্ট মাসের ১০ তারিখে খালিবাড়ি পেয়ে বাবুল তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। মেয়েটি চিৎকার চেঁচামেচি করলে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। পরে বিয়ে করার প্রলোভন দেখিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করে ওই কিশোরীকে। একপর্যায়ে ওই কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পরলে বিষয়টি কাউকে জানাতে নিষেধ করে বাবুল। প্রায় পাঁচ মাস পর নারায়ণগঞ্জে বসবাসরত মেয়েটির দাদি ও চাচির সঙ্গে যোগাযোগ করে ধর্ষক বাবুল। নারায়ণগঞ্জে গিয়ে বিয়ে করার কথা বলে মেয়েটির দাদির সঙ্গে সেখানে পাঠিয়ে দেয়া হয়। চলতি বছরের  ৫ই মে নারায়ণগঞ্জের একটি বেসরকারি হাসপাতালে সিজারের মাধ্যমে ওই কিশোরীর একটি কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। অপারেশনের পর পরই কিছুটা জ্ঞান ফিরে আসলে চিকিৎসক কিশোরীকে তার বাচ্চাটি দেখায়। পুরোপুরি জ্ঞান ফিরে আসলে সে তার জন্ম দেওয়া শিশুকে দেখতে চাইলে ওই কিশোরীর দাদি ও চাচি জানায় তার মৃত বাচ্চা হয়েছে। একদিন হাসপাতালে রেখে কোন কাগজপত্র ছাড়াই মেয়েটিকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। গ্রামের বাড়িতে এসে ওই কিশোরী বাবুল ব্যাপারীর কাছে তার বিয়ের কথা বললে উল্টো তাকে অপবাদ দিতে থাকে। অন্যদিকে চিকিৎসার অভাবে তার পেটের ক্ষত স্থানে ইনফেকশন হয়ে যায়। পরে ওই কিশোরীর মা তাকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করায়।

ওই ঘটনায় ১১ জুলাই ওই কিশোরী বাদী হয়ে বাবুল ব্যাপারী (৩০), বাবুলের দুই ভাই নুরুল আমিন ব্যাপারী (৪৫) ও ইসমাইল ব্যাপারী (৪২) বাচ্চা অপসারণের সঙ্গে জড়িত ওই কিশোরীর দাদি (৬০), চাচিকে (৪৫) আসামি করে শরীয়তপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা দায়ের করে।

ঘটনার শিকার ওই কিশোরী কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, আমাকে প্রথমে জোর করে ধর্ষণ করে। এই কথা কাউকে বললে আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। আর আমি যদি কাউকে কিছু না বলি তাহলে আমাকে বিয়ে করবে বলে কথা দেয় বাবুল। আমার বাবা- মা কাজে গেলে বিয়ে করার কথা বলে আমাকে নিয়মিত ধর্ষণ করে বাবুল। পরে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে আমার দাদি আর চাচির সহযোগিতায় আমাকে প্রায় তিন মাস আটকে রাখে। তারা আমার সিজার করে ডেলিভারি করায়। সিজারের পর ডাক্তার আমারে বাচ্চা দেখাইছে। আমি পুরোপুরি জ্ঞান ফিরে পেয়ে বাচ্চা দেখতে চাইলে আমাকে মারধর করে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়।

ওই কিশোরীর মা বলেন, আমরা গরিব। আমি মানুষের বাড়ি ঝিয়ের কাজ করি। আমার মেয়েটাকে বাবুল ব্যাপারী এমন কাজ করল। আমরা এখন সমাজে মুখ দেখাতে পারি না। আমরা গরিব বলে কেউ আমাগো কথা বিশ্বাস করতে চায় না। আমরা গরিব বলে কি বিচার পাবনা?

ওই কিশোরীর বাবা বলেন, আমি গরিব মানুষ। আমার মেয়ের সঙ্গে অবিচার করা হইছে। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। যাতে আমার মাইয়ার মতো আর কারুর এমন ক্ষতিকরতে না পারে।

 

এ ব্যাপারে কথা বলতে অভিযুক্ত বাবুল ব্যাপারীর বাড়িতে গেলে সে এই বিষয় নিয়ে কোন কথা বলতে রাজি হয়নি। কোন কথা থাকলে গ্রামের ইউপি সদস্যের কাছে বলবে বলে হুমকিও দেয়।

ওই গ্রামের ইউপি সদস্য আব্দুস ছালাম ব্যাপারী বলেন, এই ঘটনায় মেয়েটির পরিবার আদালতের কাছে বিচার চেয়েছে। বিষয়টি আদালতের ব্যাপার। আমি এই ব্যাপারে কোন কথা বলতে চাই না।

মামলার আইনজীবী ও বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন শরীয়তপুর জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট  রওশন আরা বেগম বলেন, ঘটনাটি শুনে আমি খুবই মর্মাহত হই। ওই কিশোরী একজন সহজ সরল মেয়ে। আমার কাছে যখন আসে তখন ও অপারেশনের জায়গায়  হাত দিয়ে চেপে ধরে রাখছিল। আমি দেখি অবস্থা খুব খারাপ। তখন তাকে তার মায়ের সাথে  দ্রুত শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে পাঠাই চিকিৎসার জন্য। ওরা মেয়েটিকে কোন ওষুধ ছাড়াই পাঠিয়ে দিয়েছে। আমি আইনজীবী হিসেবে মামলাটি পরিচালনা করছি। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) ফরিদপুরকে  তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে ।