হিমালয়ের পূর্বাঞ্চলের কোল ঘেঁষে ভারত ও তিব্বতের মাঝামাঝি ছোট্ট একটি দেশ ড্রাক ইউল, ভুটান নামেই অধিক পরিচিত। প্রতি বছর যে ঝড়বৃষ্টির কারণে পাথুরে পাহাড় চূড়াগুলোর ক্ষয় এবং উপত্যকাগুলো স্নিগ্ধ সবুজ হয়ে ওঠে, তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই এই নাম। চতুর্দিকে হিমালয়ের বেষ্টনী, সমৃদ্ধ বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং জাতীয় নীতিতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের চেয়ে নাগরিকদের সুখে থাকার বিষয়টি অধিক গুরুত্ব দেওয়ায় ভুটানকে বলা হয় সর্বশেষ সাংগ্রিলা।
নিজেদের সংস্কৃতি নিয়ে গর্বিত ও তা রক্ষার ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন ভুটান বিদেশি প্রভাব থেকে নিজেদের মুক্ত রেখেছে বহু শতাব্দী ধরে। ১৯৭০ সালে প্রথম বিদেশি পর্যটকদের জন্য দুয়ার খোলা দেশটি গত কয়েক দশকে ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস ইনডেক্স’ ধারণার প্রণয়নের মাধ্যমে আধুনিকায়নের একটি অনন্য উদাহারণ হিসেবে ইতিমধ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী’র দায়িত্ব নেওয়া লোটে শেরিং এ বিষয়ে বলেন, ‘আমরা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ রক্ষায় অত্যন্ত সচেতন। কখনো ব্যক্তিস্বার্থ ও সামষ্টিক বা জাতীয় স্বার্থকে আমরা একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলি না। গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস কোনো ‘হা হাহো হো’ ধরনের বিষয় নয়। সুখ কিংবা আনন্দ বলতে আমরা বুঝি মানসিক প্রশান্তি, মানসিক নিয়ন্ত্রণ, জীবনের চাহিদার বিষয়ে সুবিবেচনা, অন্যকে হিংসা না করা, নিজের যা আছে তাতে সন্তুষ্ট থাকা, দয়ার্দ্র হওয়া এবং একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সমাজ গঠন করা।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের রাজা যেমনটা বলেছেন জাতীয় সুখ বা আনন্দ (ন্যাশনাল হ্যাপিনেস) হচ্ছে মূলত আমাদের মানবিক মূল্যবোধের উন্নয়ন ঘটানো। কোনো নীতি যদি আমাদের জনস্বার্থের পরিপন্থী হয়, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হয়, তাহলে আমরা তা কখনোই অনুমোদন করব না।’
দেশের বাসিন্দাদের সুখে থাকার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করতে ‘সেন্টার ফর ভুটান অ্যানড জিএনএইচ (গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস) স্টাডিজ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে সেই দেশের সরকার। ‘গতকাল আপনি কতখানি সুখে ছিলেন’ কিংবা ‘আপনি কি নিয়মিত ধ্যান (মেডিটেশন) করছেন’ এই ধরনের প্রশ্নের মাধ্যমে নিয়মিত জনজরিপ চালায় প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া জাতীয় সুখ বিষয়ক ৯টি সূচক এবং প্রতি পাঁচ বছর পর পর তার পরিবর্তনের হার লক্ষ করাও এই সংস্থাটির দায়িত্ব। এই নয়টি সূচক হলো মানসিক প্রফুল্লতা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সুশাসন, পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা, সময়ানুবর্তিতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সংস্কৃতি ও জীবনমান।