জামায়াত নিষিদ্ধ করার নামগন্ধ নেই

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামীর বিচারের উদ্যোগ আইন সংশোধনের অজুহাতে অনেকটা থমকেই আছে। জামায়াতের বিচারের বিষয়ে ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রী ও সরকারি দলের নেতারা একসময় প্রতিশ্রুতি দিলেও তাদের সেই মনোভাব এখন আর নেই। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে জামায়াতের শীর্ষ কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর বিচার কার্যকর হয়েছে। অনেকের বিচারকাজ এখনো চলছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের পরিকল্পক ও নির্দেশদাতা হিসেবে জামায়াত ও এর অঙ্গ সংগঠনের বিচার এখনো শুরু করতে পারেনি টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ।

জামায়াতের বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে প্রতিবেদন প্রস্তুত করার পর সাড়ে পাঁচ বছর সময় পার হলেও বিচারের উদ্যোগ তথা সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন না হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবার, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ ও

 

ট্রাইব্যুনালসংশ্লিষ্টরা হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তারা বলছেন, বিভিন্ন সময়ে এ উদ্যোগ নেওয়ার কথা সরকারের তরফে বলা হলেও এখন তারা এ বিষয়ে খুব একটা কথা বলেন না। জামায়াতের বিচার যেন অধরাই রয়ে যাচ্ছে। এটিকে সরকারের রাজনৈতিক ‘কৌশল’ বলে মনে করছেন তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জামায়াতের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের সংশোধনীর খসড়া মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেলেই বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এর আগে বলেছিলেন, দ্রুতই তা মন্ত্রিসভায় তোলা হবে। কিন্তু সেটি আর হয়ে ওঠেনি। বিচারের উদ্যোগও শুরু হয়নি।

জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে জানান, বিষয়টি সরকার গুরুত্ব সহকারে দেখছে। আইনের খসড়াটি মন্ত্রিপরিষদে রয়েছে। ক্রম অনুসারে এটি মন্ত্রিসভায় উঠবে। তবে কবে নাগাদ উঠবে সে বিষয়ে কোনো ধারণা দিতে পারেননি তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০১৩ সালের আগস্টে জামায়াতের বিষয়ে তদন্ত শুরু করার পর ২০১৪ সালের ২৭ মার্চ তা প্রসিকিউশন শাখায় জমা দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। প্রতিবেদনে জামায়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের সাতটি অভিযোগ আনা হয়। পাশাপাশি বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরদের সমন্বয়ে একটি আইনজীবী প্যানেলও গঠন করা হয়। আইনজীবীরা প্রতিবেদন পরীক্ষা করে অভিযোগ আকারে ট্রাইব্যুনালে দাখিলের প্রস্তুতি নেন। কিন্তু বিদ্যমান আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনে সংগঠনের বিচার ও শাস্তির বিধান নেই বলে তখন সরকারের তরফে জানানো হয়। পরে ওই বছরই মানবতাবিরোধী অপরাধী সংগঠনের শাস্তির বিধান যুক্ত করে আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেয় আইন মন্ত্রণালয়। কিন্তু দীর্ঘদিনেও সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরুর না হওয়ায় হতাশ সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।

প্রস্তাবিত ওই খসড়া সংশোধনীতে এই আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় ‘ব্যক্তি’ শব্দটির পরে ‘অথবা সংগঠন’, ‘দায়’ শব্দের পরে ‘অথবা সাংগঠনিক দায়’, ‘অভিযুক্ত ব্যক্তির’ পরে ‘অভিযুক্ত ব্যক্তি বা সংগঠন’ যুক্ত করা হয়। এছাড়া বিচারে সংগঠনের দোষ প্রমাণিত হলে ওই সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করা হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর আমরা যখন অভিযোগ প্রস্তুত করতে উদ্যোগ নিলাম তখন আইন সংশোধনের কথা বলে আমাদের ধীরে চলার কথা বলা হলো। এ নিয়ে যখন কথা ওঠে তখন মনে হয়, আইনটি বোধহয় কালকেই হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আইন যে হবে এর কোনো নড়াচড়া আমরা দেখছি না। জামায়াতের বিচারের যে দাবি সেটি আদৌ বাস্তবায়ন হবে কি নাÑ এ নিয়ে আমাদের সংশয় রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটি সরকারের রাজনৈতিক কৌশল নাকি অপকৌশল, সেটি সময়ই বলে দেবে। আমরা যারা ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত আমাদের আকাক্সক্ষা রয়েছে যে, এই বিচারটি দ্রুত হোক।’

ইতিহাসবিদ ও গবেষক অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চার দশকের বেশি সময় ধরে জামায়াত নিষিদ্ধ ও তাদের বিচারের দাবি জানিয়ে আসছি। এখন আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় যাক বা না যাক, সরকার চাইলে এই বিচার এক সপ্তাহের মধ্যে হতে পারে আর না চাইলে আগামী ১০ বছরেও হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি দলের নেতারা যখন মনে করেন এটি করলে কোনো লাভ নেই, তখন তারা সরব হন না। কিন্তু যদি মনে করেন সরব হওয়ার মতো বিষয় তখন তারা সরব হন। এখন সরকার যদি মনে করে আমাদের দাবি যৌক্তিক তাহলে দ্রুতই বিচারের উদ্যোগ নিতে পারে।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক সানাউল হক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা তো আমাদের কাজ করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলাম। আমরা ধরে নিয়েছিলাম জামায়াতের বিচার সরকার চায় বলেই আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আমরা এখনো বিশ্বাস করি এই বিচার করার সদিচ্ছা সরকারের রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জার্মানিতে যখন নাৎসি বাহিনীর বিচার হলো, বিচারের সঙ্গে সঙ্গে নাৎসি বাহিনীর সবাইকে কিন্তু আদালত যুদ্ধাপরাধী হিসেবে দোষীসাব্যস্ত করল। সংগঠনের বিচার হলে এ সংগঠনের নেতৃত্বে এবং সদস্য হিসেবে যারা ছিল প্রমাণসাপেক্ষে তারা প্রত্যেকেই যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত হতো এবং আমরাও যুদ্ধাপরাধের মামলার একটা সমাপ্তির দিকে যেতে পারতাম।’

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘আইনের খসড়াটি এখন মন্ত্রিপরিষদে রয়েছে। সিরিয়াল অনুযায়ী এটি মন্ত্রিসভায় উঠবে।’ সংশোধনের জন্য শিগগির এটি মন্ত্রিসভায় তোলা হবে কি নাÑ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘দেখুন, আমরা খুব গুরুত্ব সহকারে বিষয়টি দেখছি। জামায়াতের অন্যান্য মামলাও রয়েছে। আশা করি এটিও হয়ে যাবে।’

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ২০১০ সালের মার্চে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যাত্রা শুরু করে। ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের রায়ের পর্যবেক্ষণে জামায়াতকে একটি ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে আখ্যায়িত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এরপর জামায়াতের বিচারের দাবি আরও জোরালো হয়ে ওঠে।

একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শুনানি নিয়ে ২০১৩ সালের ১ আগস্ট হাইকোর্টের তিন সদস্যের একটি বৃহত্তর বেঞ্চ এক রায়ে দল হিসেবে জামায়াতের রেজিস্ট্রেশন (নিবন্ধন) অবৈধ ও বেআইনি ঘোষণা করে। এর আগে জামায়াত তাদের গঠনতন্ত্র একাধিকবার সংশোধন করে নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়। তাতে এর নাম ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ’র পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ করা হয়। এই রায়ের পর ইসি জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল ও নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করে। হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে করা জামায়াতের আপিল ছয় বছরের বেশি সময় ধরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন।

হাইকোর্টের ওই রায়, জামায়াত নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ এবং সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে পারে এমন মতের বিষয়ে জোরালো যুক্তি রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেন, ‘সরকার নির্বাহী আদেশে জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারে। কিন্তু সরকারের পরিবর্তন হলে অন্য সরকার এসে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনও করে ফেলতে পারে। কিন্তু আদালতের মাধ্যমে জামায়াতের বিচার হলে রায় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কমÑ এ যুক্তিতেও বিচারের উদ্যোগ ত্বরান্বিত করা যায়।’