ভারত-নির্ধারিত নতুন দরে আমদানি করা পেঁয়াজ এখনো বাজারে আসেনি। এর আগেই পণ্যটির অস্বাভাবিক দাম বাড়িয়েছেন দেশের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। এ নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডাকা সভায় সাড়া দেননি আমদানিকারক ও বড় ব্যবসায়ীরা। গতকাল মঙ্গলবার মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ওই সভায় একমাত্র আমদানিকারক হিসেবে ঢাকার নর্থব্রুক হল রোডের হাফিজ করপোরেশনের মালিক হাফিজুর রহমান যোগ দেন। রাজধানীর শ্যামবাজারসহ অন্যান্য বাজারের কিছু পাইকারি ব্যবসায়ী সভায় যোগ দিলেও তেমন কোনো বক্তব্য রাখেননি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভার নোটিস থেকে জানা যায়, সভায় এমন ব্যবসায়ীদের ডাকা হয় যারা পেঁয়াজ আমদানি কিংবা বেচাবিক্রির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। সিটি গ্রুপের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান, মেঘনা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোস্তফা কামাল ও এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমসহ (মাসুদ) বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য আমদানিকারকদের ডাকা হয়েছে। তারা কেউই সভায় যোগ দেননি।
পেঁয়াজের দামের ঊর্ধ্বগতি রুখতে গতকাল বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির সভাপতিত্বে অংশীজনদের সভা হওয়ার কথা ছিল। মন্ত্রী অন্য জরুরি কাজে ব্যস্ত থাকায় তাতে সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. জাফর উদ্দীন। সভায় ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি কম হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আজকে এ মন্ত্রণালয়ে আমার প্রথম কার্যদিবস। আমি সব অবহিত নই।’
সচিব বলেন, দেশে পেঁয়াজের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ফলে দাম নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই। শিগগিরই পেঁয়াজের দাম কমে স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পণ্যটির সরবরাহ ও দাম স্বাভাবিক রাখতে বাজারে মনিটরিং বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা দেবে মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে টিসিবির মাধ্যমে খোলা বাজারে বিক্রি অব্যাহত থাকবে।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজের ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য ৮৫০ ডলার নির্ধারণ করেছে। এরপর থেকে বাংলাদেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১৫ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৭০ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এদিন আমদানি করা পেঁয়াজ ৬০ থেকে ৬৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে, যা গত শুক্রবার ছিল ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। পেঁয়াজের ক্ষেত্রে আমদানি নির্ভরতা রয়েছে। বছরে ১০ থেকে ১২ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়। এর সিংহভাগই আসে ভারত থেকে। ফলে ভারতের বাজারের ওঠানামায় বাংলাদেশের বাজার প্রভাবিত হয়।
নিজের প্রথম কর্মদিবস এবং সব বিষয়ে পুরোপুরি ধারণা নেওয়ার সুযোগ হয়নি জানিয়ে বাণিজ্য সচিব বলেন, এই মিটিং থেকে যা বোঝা গেল তার সারাংশ হচ্ছে, দেশের বাজারে গত কয়েকদিন ধরে পেঁয়াজের যে দাম বেড়েছে তা অযৌক্তিক। পর্যাপ্ত মজুদ ও সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ করে দাম বেড়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। এজন্য মন্ত্রণালয় কিছু উদ্যোগ এরই মধ্যে নিয়েছে। আরও কিছু কাজ করা হবে। পেঁয়াজের সরবরাহ ও দাম স্বাভাবিক রাখতে বাজার মনিটরিং জোরদার করা হবে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে পাইকারি ও খুচরা বাজার মনিটরিংয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সহজে আমদানির ব্যবস্থা করতে পেঁয়াজের এলসি মার্জিন ও সুদহার কমানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অনুরোধ করা হয়েছে। বন্দর থেকে দ্রুত খালাস এবং গন্তব্যে যাতে দ্রুত পৌঁছায় সেজন্য বন্দর কর্র্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শিগগিরই চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এনবিআরকেও সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এছাড়া টিসিবির মাধ্যমে ট্রাক সেল শুরু করা হয়েছে। যতদিন প্রয়োজন এটা চলতে থাকবে।
বাণিজ্য সচিব বলেন, উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। পাইকারি বাজারে দামের চেয়ে খুচরা বাজারে দাম অনেক বেশি। এটা কমানোর জন্য বাজারে মনিটরিং বাড়ানো হবে। পাশাপাশি ভারতের বিকল্প বাজার থেকে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হবে। বর্তমানে আমদানির পাইপলাইনে এবং দেশের অভ্যন্তরে যে মজুদ আছে তা সন্তোষজনক। কাজেই পেঁয়াজ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।
ট্যারিফ কমিশনের সদস্য শাহ মো. আবু রায়হান আল বেরুনী বলেন, দেশে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ মজুদ রয়েছে। তবে এটাও মনে রাখতে বর্তমানে পেঁয়াজ চাষের মৌসুম, আগামী দেড় মাস পরে নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসবে। যদিও বাংলাদেশের প্রধান আমদানি বাজারে ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য অনেক বেড়েছে। ফলে এ সময়ে পেঁয়াজের দাম কিছুটা বাড়তে পারে। তবে নতুন পেঁয়াজ বাজারে এলে দাম কমে আসবে। চট্টগ্রাম ও ঢাকার পাইকারি বাজারে গতকাল ৫৫ টাকা কেজিতে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় দাম কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন।
বৈঠকে টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান জাহাঙ্গীর, এনবিআর, ট্যারিফ কমিশন, ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধি ও রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার সমিতির নেতারা উপস্থিত ছিলেন।