টাঙ্গাইলে বালুঘাট নিয়ে বছরজুড়ে চলে সংঘর্ষ

টাঙ্গাইলের কালিহাতী ও ভূঞাপুর উপজেলার সীমান্ত এলাকা ঘেঁষে যমুনা নদীতে বালুঘাটের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রায়ই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে এলাকার প্রভাবশালীরা। এসব সংঘর্ষ নিরসনে যমুনা থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে এলাকাবাসী ফুঁসে উঠেছেন।

বছর তিনেক আগে টাঙ্গাইল-২ (ভূঞাপুর-গোপালপুর) আসনে খন্দকার আসাদুজ্জামান সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় বালুমহাল নিয়ে গুলিবিনিময় ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার জেরে এখনো বিরাজ করছে উত্তেজনা, ঘটছে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া আর পাল্টাপাল্টি মামলা।

বালু উত্তোলন বন্ধ করতে ‘জান দিব তবু বালু দিব না’ এই সেøাগানে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় মানববন্ধন করেছেন সাত গ্রামের তিন সহস্রাধিক মানুষ। গত ১৭ আগস্ট দুপুরে বঙ্গবন্ধু সেতুর দক্ষিণ-পূর্ব পাশের আলীপুরে দুই ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়। সেই সমাবেশে ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, স্থানীয় প্রশাসন ও বিবিএ’র কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে বালু উত্তোলন করে এলাকার প্রভাবশালীরা। তারা এসব অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম মাস্টার, শামসুল আলমসহ এলাকার অনেকেই বলেনÑ বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্বপাড়ের দক্ষিণে কোল ঘেঁষে যমুনা নদী থেকে দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন করে আসছে কালিহাতী উপজেলার গোহালিয়াবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হযরত আলী তালুকদার, গোহালিয়াবাড়ী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সুলতান মেম্বারসহ একটি প্রভাবশালী মহল। বালু উত্তোলনের ফলে উপজেলার চর সিংগুলি, বন সিংগুলি, কায়েম সিংগুলি, জিদহ, ভৈরববাড়ী, আলীপুর, বেলটিয়া, খাগচড়া গ্রাম নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বাড়িঘর হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন সহস্রাধিক মানুষ। মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম আরও বলেন, বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ করায় চাঁদাবাজির মিথ্যা মামলা দিয়ে আমাদের হয়রানি করা হচ্ছে।

অপরদিকে, বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্বপাড়ের উত্তরে কোল ঘেঁষে একই নদী থেকে দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন করে আসছে ভূঞাপুর উপজেলার নিকরাইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মতিন সরকার, নূহু মেম্বার, ছোট আবদুল করিম, হাশেম প্রামাণিক, আইনজীবী আবদুস সবুর, মাসুদ মেম্বার, সাদ্দাম আকন্দ, ছানোয়ার হোসেন, জাহাঙ্গীর মেম্বার, ছাত্রলীগ নেতা নয়ন সরকার ও গবিন্দাসী ইউনিয়নের দোলাল চকদার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় অনেকের অভিযোগ, ভূঞাপুর পৌরসভার মেয়র মাসুদুল হক মাসুদ দীর্ঘদিন ধরে এসব বালুঘাট নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন।

স্থানীয় শামসুল আলম বলেন, বঙ্গবন্ধু সেতুর ৬ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে নদী থেকে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ হলেও তোয়াক্কা করে না প্রভাবশালীরা। দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলনের ফলে হুমকির মুখে পড়েছে বঙ্গবন্ধু সেতু। এছাড়া উত্তরবঙ্গে গ্যাস সংযোগের লাইনও রয়েছে হুমকিতে।

ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, বালু উত্তোলন করে পাহাড়সমান মজুদ করা হয়েছে। উপজেলার গড়িলাবাড়ী গ্রামের জনাব আলী তালুকদার নামের কৃষক বলেন, নদীতে আমার বাড়ি সাত থেকে আটবার ভেঙে গেছে। নদীভাঙন রোধে বালু উত্তোলন বন্ধ ও স্থায়ী ব্যবস্থা চাই।

গত ১২ সেপ্টেম্বর বালু ব্যবসায়ীদের দুই গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এলাকাবাসীও জড়িয়ে পড়ে। পরে অতর্কিত হামলায় অন্তত ১২ জন আহত হয়। এদিকে অতি সম্প্রতি সেতুর দক্ষিণ পাশে কালিহাতী উপজেলায় যমুনা নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধে আগাম প্রস্তুতি নিতে দেখা গেছে ভাঙনকবলিত এলাকাবাসীদের। তাদের সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন ও উঠান বৈঠকসহ নানামুখী কর্মকাণ্ড গণ-আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে আর এতে এলাকার ভাঙনকবলিত মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে আক্রোশ।

সংঘর্ষ মোকাবিলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে দাবি করে টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) শফিকুল ইসলাম বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।