শহরের বর্জ্যে ১০ গ্রামে দূষণ

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ড থেকে সংগৃহীত নিত্যদিনের ময়লা-আবর্জনা ফেলার সেনেটারি ল্যান্ডফিল্ডের কারণে দূষিত হয়ে পড়েছে নগরীর ১৬ ও ১৭ নম্বর ওয়ার্ড এবং পাশর্^বর্তী জগন্নাথপুর ইউনিয়নের প্রায় ১০টি গ্রাম। ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধে দুর্বিষহ জীবন পার করছে ওই এলাকার প্রায় ২০ হাজার মানুষ। দিন দিন দূষিত হয়ে পড়ছে এলাকার পরিবেশ ও ফসলি জমি, মরে যাচ্ছে গবাদি পশু ও পুকুরের মাছ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাবেক কুমিল্লা পৌরসভার ময়লা-আবর্জনার পরিমাণ কম থাকলেও ২০১১ সালে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর সীমানা বৃদ্ধির পাশাপাশি জনসংখ্যাও বাড়তে থাকে অস্বাভাবিক হারে। ফলে ময়লা-আবর্জনার পরিমাণও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। এতে দিন যতই বাড়ছে, ততই অতিরিক্ত ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধে অসহনীয় হয়ে উঠছে সেনেটারি ল্যান্ডফিল্ড এলাকার মানুষের বসবাস। ময়লাখোলা বা সেনেটারি ল্যান্ডফিল্ড এলাকায় দুর্গন্ধ এতটাই চরম আকার নিয়েছে যে, ময়লাখোলার পাশের সিটি করপোরেশনের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের সংরাইশ, মৌলভীপাড়া ও নবগ্রাম, ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের সুজানগর ও পাথুরিয়াপাড়া এবং জগন্নাথপুর ইউনিয়নের দৌলতপুর, বাজগড্ডা, জগন্নাথপুর, খামার কৃষ্ণপুর, বালুতুপা, অরন্যপুর ও ঝাঁকুনিপাড়া গ্রামের হাজারো মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা একপ্রকার থমকে দাঁড়িয়েছে। এমনকি দুর্গন্ধের কারণে এই এলাকায় নতুন করে কেউ আত্মীয়তাও করতে চান না বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী। ক্ষতিগ্রস্ত এসব এলাকার মানুষ বারবার প্রতিবাদ জানালেও সিটি করপোরেশন কর্র্তৃপক্ষের কোনো উদ্যোগ নেই এই দুর্ভোগ নিরসনে।

জগন্নাথপুর ইউনিয়নের একটি গ্রাম ঝাঁকুনিপাড়া। গ্রামটির লোকসংখ্যা প্রায় দুই হাজার। এর আশপাশজুড়ে রয়েছে দৌলতপুর, বাজগড্ডা, জগন্নাথপুর, খামার কৃষ্ণপুর, বালুতুপা, অরন্যপুর ও ঝাঁকুনিপাড়া গ্রাম। সব গ্রামের লোকসংখ্যা প্রায় হাজার দশেক। সরেজমিনে ময়লাখোলা এলাকা ঘুরে এবং এর আশপাশ গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন নগরীর ২৭টি ওয়ার্ড থেকে শত শত টন ময়লা-আবর্জনা এখানে ফেলছে নগর কর্র্তৃপক্ষ। ময়লাখোলার মূল প্রবেশমুখে রয়েছে আবর্জনার বিশাল উঁচু স্তূপ। প্রায় ১০.৫৮ একর আয়তনের ময়লাখোলাটির কোনো সীমানা প্রাচীর এবং দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বাতাসে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে দুর্গন্ধ।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানায়, শুধু ঘুমের সময় ছাড়া এই দুর্গন্ধ থেকে কোনোভাবেই মুক্তি মেলে না এলাকাবাসীর। ময়লা ফেলার পর যখন এগুলো ডাম্পিংয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয় তখন অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। বায়ুদূষণের কারণে এলাকার মানুষ বমি, পেটের পীড়া, মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট ও চর্মরোগসহ নানা রোগে ভুগছে। এই দুর্ভোগ থেকে প্রতিকার পেতে এলাকার মানুষ প্রায়ই প্রতিবাদী হয়ে ওঠে, কিন্তু মেলে না কোনো সুফল।

এ বিষয়ে কথা হয় ময়লাখোলা এলাকার বাসিন্দা রমজান আলীর সঙ্গে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ময়লাখোলা এলাকার এক-দেড় মাইল দূর থেকেও দুর্গন্ধ পাওয়া যায়। বর্ষা মৌসুমে বা বছরের অন্যান্য সময় বৃষ্টির পানিতে ময়লা-আবর্জনা আশপাশ জলাশয় ও রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে পড়ে। এতে চর্মরোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। কিন্তু সিটি করপোরেশন কোনো পদক্ষেপই নিচ্ছে না।’

একই এলাকার জহির নামে এক যুবক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের এখানে বাইরের কোনো ভালো পরিবারের লোকজন আত্মীয়তা করতে আসেন না। আবার এখানকার কোনো যুবক-যুবতীর বিয়ের ক্ষেত্রে ময়লাখোলার কথা শুনলে আর আত্মীয়তা করতে চান না।’

ময়লাখোলার কারণে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে জানিয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি ডা. মোসলেহউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ময়লাখোলার কারণে এলাকার জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে। দ্রুত সুনির্দিষ্ট একটি পরিকল্পনার মাধ্যমে ময়লা-আবর্জনা ফেলার স্থান নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।’ ময়লাখোলার কারণে এলাকার বাসিন্দাদের দুর্ভোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখ মো. নুরুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই ময়লা-আবর্জনা বিকল্প কোনো কাজে ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য জাপানি উন্নয়ন সংস্থা জাইকার একটি প্রতিনিধিদল বছর দুয়েক আগে সেনেটারি ল্যান্ডফিল্ড এলাকা পরিদর্শন করে। তখন বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার, বিদ্যুৎ ও গ্যাস তৈরির সম্ভাব্যতা নিয়েও আলোচনা হয়। তবে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি সিটি করপোরেশন।’ অন্যদিকে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র মনিরুল হক ময়লাখোলার কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকার বায়ুদূষণ ও পরিবেশ বিপর্যয়ের বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ময়লাখোলার বর্জ্য ও আবর্জনা থেকে বিকল্প কিছু করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এজন্য দাতা সংস্থা, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলা প্রশাসকসহ একাধিক মাধ্যমে যোগাযোগ করা হচ্ছে। সেগুলোতে সফলতা না এলে সিটি করপোরেশন নিজেই উদ্যোগী হয়ে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’