সৌদি আরব যে যুদ্ধ করতে খুব আগ্রহ দেখাচ্ছে তা নয়, তবে তাদের যুদ্ধ এড়ানোর সুযোগগুলো কমে আসছে। আর এতে তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের মোটেই সমস্যা নেই। সৌদি আরব যে কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়েছে তার জাজ্বল্যমান প্রমাণ খুরাইস তেল উৎপাদন কেন্দ্রের পুড়ে যাওয়া পাইপ আর টাওয়ারের দৃশ্য। গত সপ্তাহে এ কেন্দ্রের টাওয়ারগুলোতে এসে আঘাত হানে চার চারটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র।
ঘটনার এক সপ্তাহ পর আমি খুরাইস তেল উৎপাদন কেন্দ্রে যাই। তখনো উদ্ধারকর্মীরা ঝাড়ামোছা আর মেরামত কাজে ব্যস্ত। হোস পাইপ দিয়ে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল ঝরে পড়া তেল। কিন্তু তুমুল এই আঞ্চলিক ক্ষমতার লড়াইয়ের ভারসাম্যের ব্যাপারটা সহজে বুঝতে চাইলে যেতে হবে রাজধানী রিয়াদে।
প্রাণবন্ত কিন্তু ধূলিময় মরুশহর রিয়াদে নতুন নতুন আকাশচুম্বী দালান উঠছে। অন্যদিকে নগরের চল্লিশ লাখ বাসিন্দার পায়ের তলায় গড়ে উঠছে কয়েকশ কোটি ডলারের নতুন রেল নেটওয়ার্ক। সৌদি আরবের অর্থনীতির অবস্থা এই মুহূর্তে সন্তোষজনক। রাজ্যের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (নামের আদ্যক্ষর অনুসারে ‘এমবিএস’ হিসেবে সবার কাছে পরিচিত) এর ওপর ভর করে অনেক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করছেন। তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মোটা অর্থ লাগে। ‘আরামকো’র তেল উৎপাদন কেন্দ্রে গত সপ্তাহের হামলার কারণে এতে ভাটা পড়তে পারে। সংক্ষেপে বলতে গেলে- যুদ্ধ বাধলে সৌদির ক্ষতি অনেক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ‘সর্বোচ্চ চাপে’ ইতিমধ্যেই কাহিল ইরানের সে ক্ষতির আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে কম।
রিয়াদে চালু এখনকার ধারণা হচ্ছে, ইরানের মোল্লাতন্ত্র এখন অস্তিত্বের হুমকিতে। দেশটির ধর্মীয় নেতারা বেহাল অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে না পারলে উৎখাত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন। এই যুক্তি অনুযায়ী, ইরানের কট্টরপন্থিরা হয় নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ‘যুদ্ধের সমতুল্য’ কিছু করা কিংবা দেশবাসীর মনোযোগকে ঘরের সমস্যা থেকে বাইরের শত্রুর দিকে সরিয়ে দিয়ে একটা বাজি ধরে দেখতে তৈরি। ইরানই তাদের তেল উৎপাদন কেন্দ্রে হামলার জন্য দায়ী সৌদি আরবের এ কথা সঠিক হলে বলতে হয়, ১৮টি ড্রোন আর ৭টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে তেহরান এমবিএসকে এমন একটি শিক্ষা দিয়েছে যা তার পক্ষে উপেক্ষা করা সম্ভব হবে না।
দুই তেল উৎপাদন কেন্দ্রে ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের উত্তোলন ক্ষমতার প্রায় অর্ধেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্ববাজারে উৎপাদন কমে যায় ৫ শতাংশ।
সৌদি আরব ওই ড্রোন হামলায় ব্যবহৃত কথিত ইরানি অস্ত্র প্রকাশ্যে প্রদর্শন করেছে। দেশটি বলেছে, এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপরই হামলা যাতে করে বৈশ্বিক অর্থনীতি, শান্তি ও স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। কিন্তু তারা যে বিষয়টি ছোট করে দেখছে তা হচ্ছে এ হামলার উৎসভূমি। তদন্তের সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের তদন্তকারী উভয়ের বিশ্বাস, ওই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলো ইরানের একটি ঘাঁটি থেকে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি।
ইরান সৌদি অভিযোগকে আখ্যায়িত করেছে ‘চরম অবমাননাকর’ বলে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা সৌদি আরব তার দেশে হামলা করলে ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ বেধে যাবে।
তবে সৌদি সরকারি কর্মকর্তারা এখনই এ নিয়ে বিতর্কে জড়াতে চান না। সৌদি জোটের সামরিক মুখপাত্র বলেছেন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণের কেন্দ্র সম্পর্কে তাদের তদন্ত এখনো চলমান। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রমাণ ছাড়া কোনো দেশকে অভিযুক্ত করা যায় না।’
তবে সর্বশেষ হামলার পর করা সৌদি আরবের এক গোয়েন্দা মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে হরমুজ প্রণালীতে ট্যাংকারে হামলা ও জাহাজ ছিনতাইয়ের মাধ্যমে স্বার্থসিদ্ধি হয়নি বলে ইরান এ কাজ করে থাকতে পারে।
সৌদি আরব দৃশ্যত একটি বড়সড় জবাবের জন্য ধীরে চলার নীতি নিয়েছে। এ বছরই আরও আগে আরব আমিরাত ঠিক এটাই করেছিল। আমিরাতের উপকূলের অদূরে তাদের চারটি ট্যাংকারে হামলা হয়। সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র তখন বলেছিল, এগুলো ইরানের কাজ। কিন্তু আমিরাত ঘোষণা করে, তদন্ত শেষ না হলে তারা কাউকে দায়ী করবে না। কয়েকমাস কেটে গেলেও তারা কোনো সিদ্ধান্তে আসেনি।
এদিকে সৌদিরা ইরানের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কার্যকলাপ নিয়ে সর্বশেষ এ হামলার আগে থেকেই উদ্বিগ্ন। এতটাই উদ্বিগ্ন যে সপ্তাহ কয়েক আগে যুবরাজের এক ভাই ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একটা আঞ্চলিক যুদ্ধ বাধিয়ে বসতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সৌদি আরব। বার্তাটা এবার হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে পৌঁছে দিতে পেরেছে তারা। ইরানকে শায়েস্তা করতে যুক্তরাষ্ট্র তৈরি (‘লক্ড অ্যান্ড লোডেড’) থেকে ট্রাম্পের বুলি পাল্টে এখন হয়েছে, ‘পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে হবে সৌদিকেই।’ একইসঙ্গে তিনি ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছেন।
তারপরও হয়তো ট্রাম্পের কার্যকলাপ ইরানকে নিয়ে সৌদি আরবের সমস্যাকে জটিলতরই করবে। গত ছয় মাস ধরে ট্রাম্পের ভাবসাবে মনে হয়েছে ইরানকে ধরার জন্য তার তর সইছে না। তারপর আবার শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে গেছেন। গত জুনে হরমুজ প্রণালীতে কয়েকটি তেলের ট্যাংকারে হামলার পর ইরান যুক্তরাষ্ট্রের একটা ড্রোনও ভূপাতিত করে। তার জন্য প্রতিশোধমূলক হামলার ঠিক দশ মিনিট আগে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, নিরীহ ইরানিদের বাঁচাতে তিনি সিদ্ধান্ত বাতিল করেছেন। তার যুক্তি, ইরানি হামলায় ড্রোন ধ্বংস হলেও তাতে কোনো আমেরিকান নিহত হননি।
এবার রিয়াদে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও-ও একই ভাষায় কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের ভাগ্য ভালো যে এ হামলায় কোনো আমেরিকান নিহত হননি। তবে এ ধরনের যুদ্ধের মতো কাজ যখনই করা হবে তখনই প্রাণহানির ঝুঁকি থাকবে।’
ইরানের প্রতি ট্রাম্পের ঘন ঘন হুমকি যেন পরিণত হয়েছে একসারি অদৃশ্য চরম সীমারেখা বা রেড লাইনে। স্বদেশে ট্রাম্পের শত্রুরা একে তার দুর্বলতা হিসেবেই দেখছেন।
বারাক ওবামা কড়া কথা বলে পরে পিছিয়ে গিয়ে তার মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। বিশেষ করে সিরিয়ার ব্যাপারে ‘রেড লাইন’ ঘোষণা করে ব্যর্থ হয়ে। ট্রাম্পের আরও কয়েক কাঠি বেশি গরম কথা শেষ পর্যন্ত আরও ফাঁকা বুলিতে পরিণত হতে পারে। কারণ তা একবার নয়, বারবার ব্যর্থ হয়েছে। আর এর মধ্য দিয়ে এমন এক বিভ্রান্তির ধূম্রজাল ঘনিয়ে উঠতে পারে যে শেষ পর্যন্ত হয়তো যুদ্ধ অনিবার্যই হয়ে উঠবে।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রের টিভি চ্যানেল সিএনএন-এর
ইন্টারন্যাশনাল কূটনৈতিক সম্পাদক
ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর : আবু ইউসুফ