দেশে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শত বছর হতে চলল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অর্ধশতাব্দী পর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। স্বাধীনতারও অর্ধশতাব্দী পার হতে চলল। ইতিহাসের এই কাকতালে দু’বছর পর যখন দেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষপূর্তি উদযাপিত হবে, সে বছরই বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করবে। নেহাত সময়ের কাকতাল না ভেবে, ইতিহাসের এ আবর্তনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে এই ‘শতবর্ষ’ ও ‘সুবর্ণজয়ন্তী’-কে ঘিরে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা-গবেষণা-সংস্কৃতি তথা প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির একটা বিশদ মূল্যায়ন এখন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি-সন্ত্রাস-দখলদারিত্ব-চাঁদাবাজির ঘটনা; আরেক দিকে শিক্ষার মান বিচারে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান এখন দেশের শিক্ষার্থী-শিক্ষক-অভিভাবকদের সামনে এক বিরাট জিজ্ঞাসা হয়ে হাজির হয়েছে।
ঐতিহাসিক বিচারে দেশে উচ্চশিক্ষার প্রসারের সমান্তরালে উচ্চারিত হয়ে আসছে স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা। ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে পাকিস্তান আমল হয়ে স্বাধীনতা-উত্তরকালেও ছাত্ররাজনীতি ও বিশ্ববিদ্যালয় সমাজের গৌরবোজ্জ্বল সেই ভূমিকার কথা সবাই স্বীকার করেন। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো আশির দশকে সামরিক স্বৈরাচার হটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের মধ্য দিয়েই এর যবনিকাপাত ঘটে। নব্বই দশক থেকেই ক্রমাগত সংকুচিত হতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাম্য মুক্ত পরিসর। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতিতে ক্ষমতাসীন দলের অনুগত ছাত্রসংগঠনের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার সমান্তরালে চলতে থাকে শিক্ষকরাজনীতিতে ব্যক্তিগত লাভ আর ভাগবাটোয়ারায় ক্ষমতাসীনদের তল্পিবাহক প্রশাসন প্রতিষ্ঠার অপসংস্কৃতি। রাষ্ট্রক্ষমতায় নানা পালাবদল ঘটলেও বিগত প্রায় তিন দশকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি; বরং ধারাবাহিক অবনতির মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি নাজুক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে শুরু করে আর্থিক লেনদেন; ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস, বাজেট ও উন্নয়ন বরাদ্দের অর্থ লোপাট থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজিতে প্রশাসনের জড়িয়ে পড়াÑ এ সবই এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘স্বাভাবিক’ ঘটনায় পরিণত হয়েছে যেন।
দীর্ঘ আটাশ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ-ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার যে আশা জেগে উঠেছিল, বিতর্কিত নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে ছাত্রসমাজের সেই আকাক্সক্ষাও হতাশায় পরিণত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু বিতর্ক শেষ হতে না হতেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘিরে চাঁদাবাজির ভাগবাটোয়ারা আর পরিবেশ-প্রকৃতির ক্ষতি করে উন্নয়নের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এসব সংকটের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় সমাজের বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় প্রশাসনের খড়গ। বলা বাহুল্য, মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার আর যৌক্তিক ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন-সংগ্রাম দমনেই এই খড়গ চালানো হয়ে থাকে। এই খড়গ যে কেবল শিক্ষার্থীদের ওপরই নেমে আসছে তা নয়, শিক্ষকরাও এর শিকার হচ্ছেন।
গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) চলমান ঘটনাপ্রবাহ এই পরিস্থিতির ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। ‘একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ কী হওয়া উচিত?’ ফেইসবুকে এই স্ট্যাটাসের দায়ে কোন যুক্তিতে একজন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা সম্ভব তা বোধগম্য নয়। এই প্রশ্ন উত্থাপনের কারণে উপাচার্য অধ্যাপক ড. খোন্দকার মো. নাসিরউদ্দিন যে ভাষায় ওই ছাত্রীকে শাসিয়েছেন তা সত্যিই বিশ্বাসযোগ্য নয়। উল্লেখ্য, এর আগে উপাচার্যের বাসভবনে বিউটি পার্লার খুলে এবং যৌন নিপীড়ন ও প্রতারণার অভিযোগে সংবাদ শিরোনাম হন এই উপাচার্য। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে বশেমুরবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আমরণ অনশনে গেলে শিক্ষকরাও তাতে যোগ দেন। আন্দোলন দমনে শনিবার উপাচার্যের অনুসারী কিছু শিক্ষার্থী এবং বহিরাগত সন্ত্রাসী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালালে শিক্ষার্থী-সাংবাদিকসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। শিক্ষার্থীদের ওপর এই হামলায় সারা দেশে নিন্দার ঝড় ওঠে এবং বিশ্ববিদ্যালয়টির একজন সহকারী প্রক্টরও ওই হামলার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন। উপাচার্যের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে শিক্ষার্থীরা আমরণ অনশন অব্যাহত রেখেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-অধ্যাপক ও উপাচার্যের কাছ থেকে নৈতিকতার যে মান আশা করা হয় এসব ঘটনা তার সঙ্গে কেবল সাংঘর্ষিকই নয়; বরং এমন সব অভিযোগের পর কারুর এরকম পদে থাকাটাই অগ্রহণযোগ্য। বশেমুরবিপ্রবির ঘটনাপ্রবাহ দেশের অপরাপর পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে এসব অনৈতিক ঘটনার প্রতিবাদে ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন-সংগ্রাম আর সেসব দমনে প্রশাসনের বলপ্রয়োগে শিক্ষার পরিবেশ সব সময়ই ব্যাহত হয়। অথচ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য জ্ঞানচর্চা করা এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিবিড় আদান-প্রদান এবং গবেষণার মধ্য দিয়ে সেই জ্ঞানচর্চার জন্য শ্রেণিকক্ষের মতোই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও মুক্ত পরিসর সমান জরুরি। এই মুক্ত পরিসর কেবল ভৌত অর্থে স্থান নয়; বরং সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক জ্ঞানতাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক পরিসর। কিন্তু এই মুক্ত পরিসর ক্রমাগত সংকুচিত হতে হতে তা বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত মৌলিক ধারণাকেই আজ প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। দেশের উচ্চশিক্ষা তথা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্ত করতে নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ এবং সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি।