দেশের রেল কারখানা তিনটি। কারখানাগুলো পাহাড়তলী, সৈয়দপুর আর পার্বতীপুরে অবস্থিত। রেলওয়ের তথ্যানুসারে, ১৮৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রেলওয়ের সৈয়দপুর ওয়ার্কশপ। চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ক্যারেজ ও ওয়াগন কারখানার যাত্রা শুরু হয় ১৯৪৭ সালে। পার্বতীপুরে কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) কারখানা চালু হয় ১৯৯২ সালে। কারখানাগুলো প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল রেলওয়ের লোকোমোটিভ, ক্যারেজ ও ওয়াগনের সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ, আয়ুষ্কাল ঠিক রাখার পাশাপাশি গতিশীলতা বজায় রাখা। এছাড়া কারখানাগুলোতে খুচরা যন্ত্রাংশও তৈরি হয়ে থাকে। কিন্তু লোকবল সংকট, বাজেট স্বল্পতা, প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অভাব, পুরনো যন্ত্রপাতি এবং আধুনিক মেশিনারিজের অভাবে বাংলাদেশ রেলওয়ের পাহাড়তলী, সৈয়দপুর ও পার্বতীপুরের কারখানার কর্মক্ষমতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। যা যাত্রীসেবা প্রদান ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে অন্তরায়। এসব কারখানায় ট্রেন পরিচালনায় যাবতীয় যন্ত্রপাতি মেরামত করাসহ স্টিম রিলিফ ক্রেন ও দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত রেল কোচ, ওয়াগন ইঞ্জিন মেরামতের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা হয়। কিন্তু কাঁচামালের অভাব ও মেয়াদোত্তীর্ণ যন্ত্রাংশের কারণে সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে রয়েছে কারখানাগুলো। এগুলো চলছে ধুঁকতে ধুঁকতে।
প্রায় দেড়শ বছর আগে ইংরেজ বেনিয়ারা সৈয়দপুরে প্রতিষ্ঠা করে বিশাল রেলওয়ে কারখানা; যা আজও বাংলাদেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা হিসেবে পরিচিত। আসাম-বেঙ্গল রেলপথকে ঘিরে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ১১০ একর জায়গার ওপর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা প্রতিষ্ঠা করে। এরপর ১৯০৩ সালে কারখানাটি মিটারগেজ যাত্রীবাহী ও মালবাহী গাড়ি এবং স্টিম লোকোমোটিভ মেরামত কারখানায় রূপান্তরিত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৫৩ সালের দিকে কারখানায় বিভিন্ন মেশিনশপ স্থাপন করে ব্রডগেজ ও মিটারগেজ যাত্রীবাহী গাড়ি মেরামত ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ উৎপাদনের সুবিধাসহ পূর্ণাঙ্গ কারখানা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সৈয়দপুর কারখানায় আছে ২১টি শপ (উপকারখানা)। কারখানাটি পশ্চিম রেলের ব্রডগেজ ও মিটারগেজ রেলপথের যাত্রীবাহী বগি (ক্যারেজ), মালবাহী বগি (ওয়াগন) এবং পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের স্টিম রিলিফ ক্রেনের সুষ্ঠু পরিচর্যা এবং আয়ুষ্কাল ঠিক রাখার পাশাপাশি কোচের গতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এছাড়া এখানে ক্যারেজ, ওয়াগন ও লোকোমোটিভের ১ হাজার ২০০ রকমের খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরির সক্ষমতা থাকার কথা সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
১০০ বছরের পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ সনাতন পদ্ধতির প্ল্যান্টস ও মেশিনে চলছে কারখানার মেরামত কাজ। বাংলাদেশ রেলওয়ের নিয়ম অনুসারে, প্রতিটি রেল কোচ চার বছর পর পর পিরিওডিক্যাল ওভারহোলিং (পিওএইচ), ১২ বছর পর পর জেনারেল ওভারহোলিং (জিওএইচ) করার কথা। এ কারখানায় বরাদ্দ, জনবল সংকট ও কাঁচামালের অভাবে কোচ মেরামতে ওভারডিউ হয়ে পড়েছে। প্রাচীন কারখানায় নতুন কোচ উৎপাদনের শপটির নাম ছিল ক্যারেজ কনস্ট্রাকশন শপ বা সিসি শপ। ১৯৮০ থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে ২৩০টি নতুন মিটার গেজ কোচ নির্মাণ করা হয় এ কারখানায়। নতুন কোচ নির্মাণে ব্যবহার করা হতো সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তি। দেশীয় মালামাল ব্যবহার করায় খরচ কম হতো। আমদানি মূল্যের অর্ধেক মূল্যে সৈয়দপুর রেল কারখানায় নতুন যাত্রীবাহী কোচ নির্মাণ করা হতো। কিন্তু ১৯৯৩ সালে অজ্ঞাত কারণে সৈয়দপুর কারখানার ক্যারেজ কনস্ট্রাকশন শপ বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রকল্প নিলে ২০১২ সাল থেকে সৈয়দপুর কারখানায় আধুনিকায়নের কাজ হয়। ১৬৪ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের অধীন কারখানার ১৭টি শপ সংস্কার, ওয়াটার পা¤প স্থাপন, কারখানার ভেতরের রেলপথ সংস্কার, বিভিন্ন শপে পান্টস ও মেশিন এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম স্থাপনের কাজ শুরু হয়। গত ডিসেম্বরে আধুনিকায়নের কাজ শেষ হয়েছে বলে জানা যায়। তবে কারখানা শতভাগ উৎপাদনক্ষম হয়নি। তড়িঘড়ি করতে গিয়ে লালমণি এক্সপ্রেসের কোচের (ক্যারেজ) মান আশানুরূপ হয়নি। অথচ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে বলে জানা যায়।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, সৈয়দপুর ওয়ার্কশপে বছরে ৯০০ কোচ ও ২ হাজার ৫০০ ওয়াগন মেরামতের সক্ষমতা থাকলেও ২০১২-১৩ অর্থবছরে মাত্র ১৪৭টি কোচ ও ১৬৮টি ওয়াগন, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১৩২টি কোচ ও ১৪৮টি ওয়াগন, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১২৬টি কোচ ও ১৫১টি ওয়াগন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১২৬টি কোচ ও ১৪৭টি ওয়াগন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১২৩টি কোচ ও ১১৯টি ওয়াগন মেরামত করা হয়। অথচ ২০০৬-০৭ অর্থবছরে ওয়ার্কশপটিতে ৩২০টি কোচ ও ২৫৪টি ওয়াগন মেরামত করা হয়েছিল। এতেই বোঝা যায়- কারখানাগুলোর কার্যক্ষমতা কতটা কমছে।
সৈয়দপুরের এ কারখানাটিতে ২ হাজার ৮৩৪ জন জনবলের স্থলে বর্তমানে ১ হাজার ১৩ জন রয়েছে। ২০১৮ সালের মধ্যে অবসরে যাবে আরও প্রায় সাড়ে ৫০০ জনবল। এছাড়া ১৫৬ কর্মকর্তার পদের বিপরীতে কাজ করছেন ৬৬ জন। ৮৪২টি মেশিনের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে ৮৭ শতাংশ মেশিন। মাত্র ১৩ শতাংশ মেশিন মেয়াদের (২০ বছরের মধ্যে) মধ্যে রয়েছে। বাকিগুলোর অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ২০ বছর পেরিয়ে ২০০ বছরে গিয়ে ঠেকেছে! একই অবস্থা পাহাড়তলী ও পার্বতীপুর রেলওয়ে কারখানায়ও। ১৯৮৭ সালে যাত্রার সময় পাহাড়তলী রেলওয়ে ওয়ার্কশপ যে অবস্থায় ছিল, এখনো যেন তেমন! আধুনিকায়নের কোনো ছোঁয়া লাগেনি। এ কারখানায় ৪৪৯টি যন্ত্রপাতির মধ্যে ২৭১টির বয়স ৫০ থেকে ৮০ বছর পেরিয়ে গেছে। যন্ত্রপাতির আয়ুষ্কাল ২০ বছরের হিসাব অনুযায়ী মাত্র ১২ শতাংশের মেয়াদ রয়েছে। এ অঞ্চলে ৯৩০টি কোচ ও ৬ হাজার ওয়াগন রয়েছে।
রেলওয়ের সব ট্রেনের ইঞ্জিন মেরামত করা হয় পার্বতীপুর লোকোমোটিভ কারখানায়। সম্ভাবনাময় কারখানাটির অবস্থা আরও নাজুক। কারখানাটি রেলওয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইঞ্জিন মেরামত করছে। একের পর এক ইঞ্জিন আমদানি করলেও ইঞ্জিন মেরামতের একমাত্র এ কারখানাটি কারও মনোযোগ নেই। এখানে প্রতি অর্থবছরে ২৪ থেকে ৩০টি ইঞ্জিন মেরামত করার কথা থাকলেও গত অর্থবছরে মাত্র ১৪টি ইঞ্জিন মেরামত করা সম্ভব হয়েছে। পার্বতীপুর রেলওয়ে কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানা সূত্রে জানা যায়, ইঞ্জিন মেরামতের কাজে ব্যবহৃত ৯৯ শতাংশ যন্ত্রাংশই আমদানি করতে হয়। কোনো যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হলে জানাতে হয় চট্টগ্রামের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে। ফলে যন্ত্রাংশ পেতেও দীর্ঘ সময় লাগে। এছাড়া জনবল সংকট তো আছেই। ৫৪৫ জন জনবলের স্থলে ২৩৭ জন নিয়ে কাজ চলছে। ইঞ্জিন মেরামত খুবই টেকনিক্যাল কাজ। এক্ষেত্রে দক্ষ শ্রমিক দরকার। দক্ষ শ্রমিকরা অবসরে যাচ্ছেন। লোক নিয়োগ না করলে নতুনদের দক্ষ করতে অন্যের দ্বারস্থ হতে হবে। ফলে ব্যয় বাড়বে। কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না। আরও জানা যায়, দেশের সব ইঞ্জিন এখানে মেরামত করা হয়। কম বরাদ্দ, লোকবলের সংকট ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পেতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে উৎপাদন দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। যথাসময়ে কোনো কাজই করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি করতে গিয়ে মান কমে যাচ্ছে।
এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকায়নে এবং কোচ, ওয়াগন ও লোকোমোটিভের সচলতা এবং আয়ুষ্কাল ঠিক রাখতে সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় দক্ষ লোকবল নিয়োগ, যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল সরবরাহ এবং অর্থ বরাদ্দ দিয়ে কারখানাগুলোর আধুনিকায়ন করা একান্ত প্রয়োজন। দৃশ্যমান আধুনিকায়নের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি এ কারখানাগুলোতে। একদিকে যেমন কারখানাগুলো কার্যক্ষমতা হারাচ্ছে, অপরদিকে লোকবল কমছে লাফিয়ে লাফিয়ে। এরই মধ্যে রেলের যন্ত্রপাতি আর কোচ, ইঞ্জিন, ওয়াগনে আমূল পরিবর্তন আসায় ওয়ার্কশপ তিনটি নতুন ধাঁচে গড়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। কিন্তু এখনো পরিবর্তন আসেনি ওয়ার্কশপগুলোতে। রেল মন্ত্রণালয় ও একটি বেসরকারি সংস্থার সূত্র বলছে, দ্রুত সময়ের মধ্যে কারখানাগুলো আধুনিকায়ন ও যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়া হলে রেলে বড় বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। অথচ একটু তুলনামূলক হিসাব করে যদি রেল কারখানাগুলোকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা যায় তাহলে দেখা যাবে আমদানি মূল্যের অর্ধেক খরচে দেশেই বগি নির্মাণ ও অন্যান্য সেবা নিশ্চিত করা যাবে।
রেলওয়ের পুরনো কারখানাগুলোকে স্বয়ংস¤পূর্ণ করতে হবে এবং যুগোপযোগী আরও নতুন কারখানা স্থাপন করতে হবে। জনবল সংকট নিরসনে এখনই এগিয়ে আসতে হবে। রেল একটি আরামদায়ক ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থা। পর্যটনকে আকর্ষণীয় ও বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ করাতে রেলের বিকল্প নেই। বিদেশিরা রেলকেই নিরাপদ ও আরামদায়ক মনে করেন। দিন দিন রেলের চাহিদা বাড়ছে। রেলের গতি ফিরেছে। রেললাইন সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ জন্য দরকার হবে বগি। দরকার হবে মেরামতের। এ জন্য রেল কারখানাকে শক্তিশালী করতে হবে। আমদানি-নির্ভরতা বাড়াতে থাকলে খরচ বাড়বে, সময় নষ্ট হবে, রেলসেবা বিঘিœত হবে। রেলসেবার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব হবে না।
লেখক : প্রাবন্ধিক, উপপরিচালক, বিআরডিবি, কুষ্টিয়া
abuafzalsaleh@gmail.com