প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ৭৩তম জন্মদিন আজ শনিবার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের পাঁচ সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ শেখ হাসিনা। ১৯৪৭ সালের আজকের দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা হাসু।
শেখ হাসিনাকে নিয়ে তার জন্মদিন উপলক্ষে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক একটি কবিতা লেখেন ‘আহা, আজ কী আনন্দ অপার!’ শিরোনামে।
সৈয়দ শামসুল হক প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনের কবিতায় লেখেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু স্বপ্নবাহু তাঁর/শুভ শুভ জন্মদিন/দেশরত্ন শেখ হাসিনার/পঁচাত্তরের কলঙ্কিত সেই রাত্রির পর/নৌকা ডোবে নদীর জলে/সবাই বলে নৌকা তুলে ধর/কেইবা তোলে কে আসে আর/স্বপ্নবাহু তাঁর/বঙ্গবন্ধু কন্যার/শুভ শুভ জন্মদিন দেশরত্ন শেখ হাসিনার।’
বাংলাদেশের প্রাচীনতম সংগঠন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার ৭০ বছর পার করছে। আর এই সংগঠনের ৩৮ বছর নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন শেখ হাসিনাই। শেখ হাসিনা তার বয়সের বেশিরভাগ সময় পার করেছেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়ে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় সবচেয়ে বেশি সময় আছেন শেখ হাসিনা। তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগকে সবচেয়ে সুসংগঠিত দাবি করেন দলটির নেতারা। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনাকে ঐক্যের প্রতীক মনে করে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। সেই সঙ্গে সাহসী নেতা হিসেবে দেশের মানুষের কাছে ইতিমধ্যে পরিচিতি পেয়েছেন তিনি।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হওয়ার পর ১৯৮১ সালে দ্বিধা-বিভক্ত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বভার নেন তারই কন্যা শেখ হাসিনা। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দলের জাতীয় সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই বছরের ১৭ মে তিনি দেশে ফিরে আনুষ্ঠানিকভাবে দল পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। চষে বেড়ান সারা দেশ। আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের এমন কোনো জায়গা নেই শেখ হাসিনার পা পড়েনি। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, টানা আটবার দলের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। এই মুহূর্তে শেখ হাসিনা ছাড়া আর কোনো নেতা আওয়ামী লীগের জন্য অপরিহার্য নয়।
শেখ হাসিনা টানা ৩৮ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সভাপতি। দলের আর কোনো নেতার এত দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগ পরিচালনার সুযোগ-সৌভাগ্য হয়নি। দলের প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ২৫ বছর আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দেন।
অবশ্য শেখ হাসিনার রাজনৈতিক হাতেখড়ি স্কুলজীবন থেকেই। স্কুলজীবনেই তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬২-তে স্কুলের ছাত্রী হয়েও আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। আজিমপুর গার্লস স্কুল থেকে তার নেতৃত্বে মিছিল গিয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজে অধ্যয়নকালে ১৯৬৬-৬৭ শিক্ষাবর্ষে কলেজ ইউনিয়নের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু তার রাজনৈতিক জীবনের পথচলা। ’৬৯-এর গণআন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। অতঃপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সদস্য ও রোকেয়া হল শাখার সাধারণ সম্পাদক হন।
দলের দায়িত্ব পাওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী, প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিয়ে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম এবং নানামুখী ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে আজকের অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়েছেন। শেখ হাসিনার সফল নেতৃত্বের ফলেই আওয়ামী লীগ তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছে। তার নেতৃত্বে দল চারবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে। একই সঙ্গে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তিনবার সংসদে বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করেছে। আওয়ামী লীগের বর্তমান শাসন আমলেই দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের নতুন মাত্রা সূচিত হয়েছে। ইতিমধ্যেই দেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। শেখ হাসিনার হাত দিয়েই দেশে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রাখার পাশাপাশি দল ও সরকারের নেতৃত্বে থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য বড় বড় অর্জন বয়ে এনেছেন তিনি। আজকের ডিজিটাল বাংলাদেশ তার নেতৃত্বেই এগিয়ে যাচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারণা তিনিই দিয়েছেন। সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক তার কবিতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাফল্যের প্রশংসা করে লেখেনÑ ‘শেখ হাসিনা সব নদীতে/দুর্জয় গতিতে/টেনে তোলেন নৌকা আনেন উন্নয়ন জোয়ার/শুভ শুভ জন্মদিন দেশরতœ শেখ হাসিনার।’
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা সে সময় পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করায় বেঁচে যান। পরবর্তীকালে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছয় বছর ভারতে অবস্থান করেন। ১৯৮০ সালে ইংল্যান্ডে থেকে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন।
১৯৮১ সালে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাকে সর্বসম্মতিক্রমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ছয় বছরের নির্বাসিত জীবন শেষ করে অবশেষে তিনি ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে আসেন।
১৯৮১ সালে দেশে ফিরে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে লিপ্ত হওয়ার পরপরই তিনি শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়েন। তাকে বারবার কারান্তরীণ করা হয়। তাকে হত্যার জন্য কমপক্ষে ১৯ বার সশস্ত্র হামলা করা হয়।
১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সামরিক সরকার তাকে আটক করে ১৫ দিন অন্তরীণ রাখে। ১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি এবং নভেম্বর মাসে তাকে দুবার গৃহবন্দি করা হয়। ১৯৮৫ সালের ২ মার্চ তাকে আটক করে প্রায় তিন মাস গৃহবন্দি করে রাখা হয়। ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে তিনি ১৫ দিন গৃহবন্দি ছিলেন। ১৯৮৭ সালে ১১ নভেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করে এক মাস অন্তরীণ রাখা হয়। ১৯৮৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার হয়ে গৃহবন্দি হন। ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর শেখ হাসিনাকে বঙ্গবন্ধু ভবনে অন্তরীণ করা হয়। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে সংসদ ভবন চত্বরে সাবজেলে পাঠায়। প্রায় এক বছর পর ২০০৮ সালের ১১ জুন তিনি মুক্তিলাভ করেন।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শেখ হাসিনা বাঙালি জাতির জন্য আশীর্বাদ। আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে তিনি জননেত্রী থেকে গণতন্ত্রের মানস কন্যায় পরিণত হয়েছেন।’