নাগরিকত্ব না থাকলেও গাছের দেশ আছে। সে দেশ মানচিত্রের না। মাটি, রোদ, বৃষ্টি আর বাতাসের ভূগোলের। যেমন বাওবাগাছ কেবল আফ্রিকায়ই জন্মায়, আবার ইউরোপের হর্স-চেস্টনাট কেবল সেখানকার কয়েকটি দেশেই পাওয়া যায়। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে জন্মানো এমন উদ্ভিদ বা প্রাণীকে জীববিজ্ঞানের ভাষায় বলে এনডেমিক। এসব গাছগাছালি বা পাখপাখালি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সংস্কৃতির ওপরও প্রভাব রাখে। তবে নগরায়ণ ও ক্ষতিকর আখ্যা দিয়ে ধ্বংস করাসহ সঠিক উপায়ে তথ্য লিপিবদ্ধ না হওয়ায় এমন অনেক এনডেমিক উদ্ভিদই হারিয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো অঞ্চলের এনডেমিক উদ্ভিদের বিলুপ্তির ঝুঁকি চরমে পৌঁছেছে। ইউরোপের এনডেমিক বৃক্ষ বিলুপ্তির আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন) একধরনের সতর্কতা জারি করে বলেছে, অচিরেই হর্স-চেস্টনাট, কঙ্কার, মাউন্টেন অ্যাশের মতো বৃক্ষগুলো হারিয়ে যেতে পারে পৃথিবী থেকে।
সংস্থাটি ইউরোপীয় বৃক্ষগুলোর মধ্যে অর্ধেকই বিলুপ্তির অতিঝুঁকির তালিকায় স্থান দিয়েছে। যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে সেই প্রজাতির বৃক্ষগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আইইউসিএনের বরাতে বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপ অঞ্চলের ৪৫৪ জাতের বৃক্ষের মধ্যে ৪২ শতাংশই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে আছে। এর মধ্যে আবার ১৫ শতাংশ বৃক্ষ আছে চরম ঝুঁকিতে। বাকি ৫৮ শতাংশের মধ্যে অনেকগুলোই আছে বিপন্ন উদ্ভিদের তালিকায়।
আইইউসিএনের প্রতিবেদনটি এমন সময়ে এল যখন বিশ্বজুড়ে পরিবেশ বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে সংবেদনশীলতা বাড়ছে। তারপরও সংস্থাটি ইউরোপীয় বৃক্ষের এই চরম দশাকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে। বলছে, যে কারণগুলো ইউরোপের একান্ত নিজের উদ্ভিদগুলোকে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিচ্ছে, সেগুলো প্রতিরোধ করতে হবে। গাছেরও রোগ হয়, তারও যে চিকিৎসার দরকার হয়, সে বিষয়ে মানুষের যতœশীল হতে হবে।
আইইউসিএন রেড লিস্ট প্রধান ক্রেইগ হিলটন টেইলর বলেন, উদ্ভিদ বাসযোগ্য পৃথিবীর প্রধান শর্ত। ইউরোপীয় বৃক্ষগুলোও অগণিত প্রাণীর খাবার ও বসবাসের আশ্রয়। এগুলো অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাদের প্রতি যত্নশীল হওয়ার সময় এসেছে।
তার মতে, আফ্রিকার হাতি বা গন্ডার কিংবা বাঘ নিয়ে যে আলোচনার ডামাডোল তার বিন্দুমাত্র হচ্ছে না উদ্ভিদের ক্ষেত্রে। একটি মহাদেশের এত প্রজাতির বৃক্ষ যে চরম ঝুঁকিতে আছে, সে বিষয়ে যেন কারও কোনো বিকার নেই। চেস্টনাট, মাউন্টেন অ্যাশের মতো বৃক্ষগুলোর কান্না আমাদের কানে পৌঁছায় না।
সংস্থাটি ইউরোপের অর্ধেকের বেশি গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ বিপন্ন তালিকায় রেখেছে। ঝুঁকির তালিকায় আছে মস-ফার্নের কয়েকটি প্রজাতিও। এ অবস্থায় আইইউসিএন বাস্তুসংস্থানের ওপর মানুষের প্রভাব কমিয়ে আনতে বিপন্ন উদ্ভিদকুলের প্রতি যত্নবশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।