সেতু নির্মাণে অনিয়ম

কাজ শেষ হওয়ার আগেই টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে টোক নদীর ওপর নির্মাণাধীন বানিয়াপাড়া সেতুর একটি গার্ডার ভেঙে পড়েছে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ক্রেন দিয়ে সেতুটির সপ্তম গার্ডার বসানোর সময় তা ভেঙে যায়। ঘটনাটি এলাকাবাসীর মনে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে।

 

দেশ রূপান্তরের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮১ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৩ দশমিক ৭ মিটার প্রস্থের এই সেতুটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫ কোটি টাকা। নির্মাণকাজের মেয়াদ ধরা হয়েছে ৩ বছর। এর মধ্যে গত এক বছরে প্রায় ৬৫ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। নকশা অনুযায়ী ৯টি গার্ডার বসবে সেতুটিতে। এরই মধ্যে ৬টি গার্ডার বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ক্রেন দিয়ে সপ্তম গার্ডারটি বসানোর সময় তা ভেঙে যায়। উল্লেখ্য, এই সেতুটির দরপত্র আহ্বান করা হয় ২০১৮ সালের মাঝামাঝি এবং কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের শুরুতে।

 

একটা সেতু নির্মাণের সময় বেশ কয়েকটি বিষয় আমলে নিতে হয়। তদারকির ব্যবস্থা করতে হয়, মান যাচাই করতে হয় এবং সক্ষমতা বিচার করতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী, ১ হাজার ৫০০ মিটার বা ততোধিক দৈর্ঘ্যরে সেতুর দায়িত্ব বাংলাদেশ সেতু কর্র্তৃপক্ষের। এর চেয়ে কম দৈর্ঘ্যরে সেতু নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সড়ক ও জনপথ বিভাগ বা সওজের। আর গ্রাম এলাকার রাস্তা তৈরি এবং গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ ও মেরামতের দায়িত্ব স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি)। স্বাভাবিকভাবেই নির্মাণাধীন বানিয়াপাড়ার সেতুর সার্বিক কাজ তদারকির দায়িত্ব ছিল এলজিইডির। এক্ষেত্রে এলজিইডির সদর দপ্তর থেকে যে প্রকৌশলী তদারকি করতে এসেছিলেন তিনি এসে ঠিকাদারের ভুল সংশোধন করে দিয়ে দেন। শুরুতে নকশার চাইতে ব্রিজ দুই ফুট নিচু করেছিল ঠিকাদারির দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু ঘাটাইলের স্থানীয় যে প্রকৌশলী সেতুটির তদারকির দায়িত্বে ছিলেন, তার বিরুদ্ধে দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। কেননা মান যাচাইয়ের বিষয়টি অবহেলার শিকার হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ব্রিজটি নির্মাণে পাথর ও বালির অনুপাতে সিমেন্ট ঠিকমতো দেওয়া হয়নি। এছাড়া নিম্নমানের রড ব্যবহার করা হয়েছে। ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতার বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ। ইতিমধ্যে সেতুটির উত্তর পাশে যে গার্ডার বসানো হয়েছে সেটিতেও ফাটল দেখা দিয়েছে।

 

বানিয়াপাড়ায় যে স্থানে সেতুটি নির্মিত হচ্ছে সেটি মূলত তিনটি উপজেলার সংযোগস্থল। এই সেতুটি নির্মিত হলে ঘাটাইল সদরে ওই অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত সহজ হবে। ঘাটাইল সদরে সংযুক্ত টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ এবং টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক। সেতুটি নির্মিত হলে হাজার হাজার মানুষের যাতায়াতে দুর্ভোগ লাঘব হবে বলে আশা করেছিলেন স্থানীয়রা।

 

দেশে সেতু নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ বেশ পুরনো। অনেক জায়গায় ত্রুটিপূর্ণ, দুর্বল ও অপরিকল্পিত সেতু নির্মাণের খবর গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে। তারপরেও সেতু নির্মাণকে কেন্দ্র করে দুর্নীতির মচ্ছব বন্ধ হচ্ছে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দরপত্র আহ্বানের পর রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা প্রশাসনের সঙ্গে অশুভ আঁতাত ঘটিয়ে কাজ হাতিয়ে নেয়। অনেক ক্ষেত্রে ঠিকাদার বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা ও সক্ষমতা বিবেচনা করা হয় না। মূলত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলেরই নেতাকর্মীদের দিকেই অভিযোগের তীর। আর প্রশাসনও এক্ষেত্রে তাদের আজ্ঞাবহ ভূমিকা পালন করে।  সরকারি প্রশাসনের সঙ্গে দুর্বৃত্তদের অশুভ চক্র উন্নয়ন কাজগুলোকে জিম্মি করে ফেলেছে বলে অভিযোগ। এই  দুর্বৃত্তরা কীভাবে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে, তা সম্প্রতি বর্তমান সরকার পরিচালিত শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এক্ষেত্রে যুবলীগ নেতা জি কে শামীমের দরপত্র হাতিয়ে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার খবর এখন সর্বত্রই আলোচিত। দরপত্রের  দুর্নীতির প্রভাব নির্মাণকাজেও প্রতিফলিত হয়। নির্মাণকাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, প্রকল্পের কাজ দীর্ঘদিন ধরে অসমাপ্ত রাখা এবং এমনকি কাজ না করেই অর্থ আত্মসাতের মতো ঘটনার উদাহরণ আছে ভূরি ভূরি।  বর্তমান সরকার দেশকে উন্নয়নের শিখরে পৌঁছে দিতে চায়। সেটি সফল করতে দুর্বৃত্তদের সঙ্গে প্রশাসনের অশুভ চক্র চূর্ণ করার বিকল্প নেই। দরপত্রের সময় যোগ্য ও সক্ষম ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার না দিলে এ উন্নয়ন শুধু কাগজে-কলমেই থেকে যাবে।